অর্থ-বাণিজ্য ডেস্ক:: জলবায়ু পরিবর্তন এবং চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে বাংলাদেশসহ এশিয়ার দেশগুলোয় বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকি ও সংকটের আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ার বালির নুসাদুয়া কনভেনশন সেন্টারে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক বৈঠকের শেষদিন রোববার এ সংকটের আভাস দেয়া হয়। এজন্য ১৮৯ দেশের অর্থমন্ত্রী ও গভর্নরদের সর্তক করা হয়েছে।

বৈঠকে বিশ্ব অর্থনীতি পর্যালোচনা করে নেতারা একমত হয়েছেন, দুইটি কারণে এশিয়ার দেশগুলো ঝুঁকির মধ্যে পড়তে যাচ্ছে। মার্কিন ডলারের দাম স্থিতিশীল থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে।

সার্বিক পরিস্থিতিতে বিশ্ব অর্থনীতিতে একধরনের টালমাটাল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে ছোট দেশগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দেশগুলোয় অর্থনীতি স্থিতিশীল থাকলে জলবায়ু পরিবর্তন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। এ কারণে অনেক দেশের অর্থনীতি ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছে।

এছাড়া বিশ্বের বড় দুটি দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাণিজ্যযুদ্ধ নতুন করে সমস্যা সৃষ্টি করছে। সবমিলে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ পড়ছে। এই সংকট থেকে বাংলাদেশসহ এশিয়ার দেশগুলো বাদ পড়বে না বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

তিন দিনের বৈঠকে নিজ দেশের আর্থিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন অর্থমন্ত্রীরা। মুদ্রাবাজার পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠকে গভর্নররা ব্যস্ত সময় পার করেছেন। এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিমের সঙ্গে বৈঠক করেন। এছাড়া আইএমএফ, আইএফসিসহ বিভিন্ন দাতাসংস্থার উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধির সঙ্গেও অর্থমন্ত্রী মুহিত বৈঠক করেন।

দুই পরাশক্তির বাণিজ্যযুদ্ধে বাংলাদেশের অর্থনীতির ক্ষতির আশঙ্কার কথা স্বীকার করে অর্থমন্ত্রী মুহিত বলেছেন, বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে শনিবার বালি কনভেনশন সেন্টারে তিনি বলেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যযুদ্ধে বাংলাদেশেরও কিছুটা ক্ষতি হতে পারে। আমার ধারণা, এ যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব হিসেবে দেশের পণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে।

জানা গেছে, বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক বৈঠকে বাংলাদেশ এবার বেশ লাভবান হয়েছে। মূলত রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিশ্ববাসীকে সহায়তার জন্য বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম সরাসরি বাংলাদেশের পক্ষে কাজ করেছেন।

বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের সহায়তার অর্থ অনুদান হিসেবে দেয়ার জন্য কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জার্মানি ও সুইডেনকে তিনি সরাসরি অনুরোধ করেন। এ অনুরোধে চারটি দেশই সাড়া দিয়েছে। ফলে রোহিঙ্গাদের আগামী দু’বছরের ভরণপোষণের অনুদানসহ প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা (৩০০ কোটি মার্কিন ডলার) সহায়তার প্রতিশ্রুতি পেয়েছে বাংলাদেশ।

চারটি দেশ ৮ হাজার ৬০০ কোটি টাকা (১০০ কোটি ডলার) অনুদান হিসেবে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের খেলাপি ঋণ, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি ও প্রভিশন ঘাটতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল জানতে চেয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বাংলাদেশকে বলা হয়েছে। বিশেষ করে সম্প্রতি বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।

অর্থনৈতিক পূর্বাভাস দিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বলেছে, চলতি অর্থবছরে এশিয়ার দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৬ শতাংশ হবে। ২০১৯ সালে প্রবৃদ্ধি দশমিক ২ শতাংশ কমে ৫ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে আসবে।

মূল্যস্ফীতিও ঊর্ধমুখী থাকবে। এছাড়া চলতি বছরে এশিয়ার দেশগুলোয় দ্রব্যের দাম বাড়বে। ২০১৮ সালে মূল্যস্ফীতি ২ দশমিক ৮ শতাংশ হলেও দ্রব্যের দাম বাড়ার কারণে আগামী বছর মূল্যস্ফীতি বেড়ে ২ দশমিক ৯ শতাংশ হবে।

এ ধরনের আর্থিক সূচকের মূল্যায়ন করে আরও বলা হয়, সংকট ও ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ও বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে আইএমএফ বৈঠক করেছে। সেখানে অর্থনৈতিক সংকটের কথা তুলে ধরে বলা হয়- ১৯৯০ সালে ইন্দোনেশিয়া আর্থিক সংকটে পড়েছিল।

এ ধরনের সংকট আবার হতে পারে। কারণ নানা কারণে বৈষম্য বাড়ছে। আর এ বৈষম্য ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। অনেক দেশ আর্থিক বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা পরিপালন করলেও আর্থিক পদ্ধতিতে অনেক ঘাটতি রয়েছে।

উদাহরণ দিয়ে বলা হয়- ইন্দোনেশিয়া বাজেট প্রণয়ন করলেও সুনামির জন্য কোনো ধরনের বরাদ্দ রাখেনি। এ ধরনের বাজেট প্রণয়নে অস্বচ্ছতা আগামী দিনে অনেক দেশকে বড় ধরনের আর্থিক সংকটের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টিনা লেগার্ত বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাণিজ্যযুদ্ধ নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ইন্দোনেশিয়ার সুনামি এবং যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাণিজ্যযুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

তিন দিনের মূল বৈঠকের বাইরে আলাদাভাবে দেশগুলো কয়েক শ’ বৈঠক করেছে। প্রায় প্রতিটি বৈঠকে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যযুদ্ধের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনকে প্রতিটি দেশের জন্য হুমকি হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়ায় ঘটে যাওয়া সুনামির বিষয়টিও আলোচনায় আসে।