অর্থনৈতিক ডেস্ক:: ব্যাংকিং খাতসহ সমগ্রিক অর্থিক খাতের ঝুঁকি মোকাবেলায় ‘ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি কাউন্সিল’ গঠন হচ্ছে। এ কাউন্সিলে রাষ্ট্রীয় সব আর্থিক সংস্থা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। অর্থনীতির পূর্বাভাস দেবে এ কাউন্সিল। এর চেয়ারপারসন হবেন অর্থমন্ত্রী।

কাউন্সিলের সাচিবিক দায়িত্ব পালন করবেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এ সংক্রান্ত এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ওই বৈঠকেই অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত প্রস্তাবিত কাউন্সিল গঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে রাষ্ট্রীয় আর্থিক রেগুলেটরকে নির্দেশ দেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকে জানা যায়, ওই বৈঠকে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ। দেশের ইতিহাসে ব্যাংক ব্যর্থতার কোনো নজির নেই। এরপরও আগাম প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে এ ধরনের কাউন্সিল গঠনের সময় এসেছে। সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা ও মতামত নিয়ে এর রূপরেখা প্রণয়ন করতে হবে।’

বৈঠকে ৮টি সিদ্ধান্ত হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাউন্সিলের রূপরেখা তৈরির বিষয়ে আরও পর্যালোচনা করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। কাউন্সিলের সাচিবিক দায়িত্ব নিরূপণের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর ও ভারতের মডেল পর্যালোচনা করা হবে। সংকটাপন্ন ব্যাংক নিয়ে পর্যালোচনা করবে এ কাউন্সিল। বেসরকারি ব্যাংকে সরকারি সহায়তার বিষয়ে আইনি কাঠামো খতিয়ে দেখা হবে।

কাউন্সিলের কার্যপরিধির মধ্যে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বীমা কোম্পানি, মাইক্রো ফাইন্যান্সিয়াল ইন্সটিটিউট এবং মার্চেন্ট ব্যাংকের নামও অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এছাড়া কার্যকর আগাম সর্তকতামূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আর্লি ওয়ার্কিং গ্রুপ তৈরি করা হবে। এ গ্রুপ নিয়মিত সিস্টেমিক ঝুঁকি পর্যালোচনা করবে। গ্রুপগুলো আরও ইনক্লুসিভ করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয় বৈঠকে। এছাড়া বিআইডিএস এবং ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলকে এর অন্তর্ভুক্ত করা যায় কিনা, তা-ও পর্যালোচনা করা হবে।

সূত্র জানায়, ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি কাউন্সিলে সদস্য হিসেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ (এনবিআর) আর্থিক খাতের সব রেগুলেটরি প্রধান রাখা হবে। এ কাউন্সিলকে সব ধরনের সহায়তা করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃতে পৃথক দুটি ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হবে।

সেখানে একটি ওয়ার্কিং গ্রুপের কার্যক্রম হবে দেশের সব ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকিসহ সার্বিক বিষয়ে আগাম পূবার্ভাস দিয়ে সহায়তা করা। এ গ্রুপের সচিবালয় হিসেবে কাজ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। পাশাপাশি অপর ওয়ার্কিং গ্রুপের পর্যবেক্ষণে থাকবে দেশের পুরো সামষ্টিক অর্থনীতি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সামষ্টিক মনিটরিং বিভাগ এদের সচিবালয় হিসেবে কাজ করবে।

বৈঠকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘সংকট ব্যবস্থাপনায় এটি একটি যুগোপযোগী পদক্ষেপ। আর্থিক সংকট মোকাবেলায় এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশ প্রস্তুতি নিয়েছে। বাংলাদেশকেও এ ধরনের সংকট মোকাবেলার লক্ষ্যে আর্লি ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের মাধ্যমে নিয়মিত সিস্টেমিক ঝুঁকি পর্যালোচনা করা যেতে পারে।’

সরকারের নীতিনির্ধারণীরা মনে করছেন, দেশ-বিদেশের পরিস্থিতি বিবেচনায় আর্থিক খাতের সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশের কোনো প্রস্তুতি নেই। কিন্তু ‘ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি কাউন্সিল’ গঠন করা হলে সংকট মোকাবেলায় আগাম প্রস্তুতি নেয়া সম্ভব হবে। ব্যাংকিং খাতের সমস্যা শনাক্ত করে সমাধানের পদক্ষেপ নেয়া যাবে। বর্তমানে এ ধরনের কাউন্সিল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর ও ভারতে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি কাউন্সিল (আর্থিক টেকসই কাউন্সিল) পর্যালোচনা করেই দেশে তা গঠনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

বৈঠকের কার্যবিবরণীর বক্তব্যে এনবিআরের চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্ডার ১৯৭২-এর ৯ ধারার সঙ্গে নতুন একটি ধারা সংযোগ করে প্রস্তাবিত গ্রুপের আইনগত ভিত্তি দৃঢ় করতে বলেন।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. ইউনুসুর রহমান বলেন, যেসব দেশে এ ধরনের কাউন্সিল আছে, সেসব দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করে সুষ্পষ্ট ধারণা নিয়ে প্রস্তাবিত কাউন্সিলের সাচিবিক দায়িত্ব প্রদানের বিষয়টি চূড়ান্ত করা যেতে পারে।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান ড. এম খায়রুল হোসেন বলেন, ‘২০০৭-০৮ সালে বিশ্ব আর্থিক সংকটকালে বৈদেশিক বিনিয়োগ ও পোর্টফোলিও কম থাকায় ঝুঁকির মধ্যে পড়েনি বাংলাদেশ। বর্তমানে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর প্রক্রিয়ায় অনগ্রসর বাজার থেকে উদীয়মান বাজারের দিকে যাচ্ছে দেশ, যা নতুন নতুন ঝুঁকি অন্তর্ভুক্ত করবে। এ প্রেক্ষাপটে এ ধরনের কাউন্সিল গঠনের গুরুত্ব রয়েছে।