ই-কণ্ঠ ডেস্ক রিপোর্ট:: ছোট অর্থনীতির বাংলাদেশের কাছে অর্থনৈতিক পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া-পাওয়ার হিসাব অনেক বেশি। আসন্ন টিকফা বৈঠকে বিনিয়োগ টানতে অর্থনৈতিক অঞ্চল ও পোশাকের ন্যায্যমূল্যের প্রস্তাব দেবে ঢাকা। ব্যাংকিং চ্যানেলে বীমা ও অ্যামাজন ডটকমের সেবা চালু করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। এসব বিষয় বৈঠকে প্রাধান্য পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ আলোচনার ফোরাম টিকফার দুই দিনব্যাপী চতুর্থ বৈঠক আগামী ১৩ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত হবে।

বাংলাদেশের পক্ষে বৈঠকে অংশ নেবে পররাষ্ট্র সচিব শহিদুল হক, বাণিজ্য সচিব শুভাশীষ বসু এবং শ্রম সচিব আফরোজা খানসহ উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল।

যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে নেতৃত্ব দেবেন মার্কিন বাণিজ্য দফতর ইউনাইটেড ট্রেড রিপ্রেজেনটেটিভের (ইউএসটিআর) বাণিজ্য প্রতিনিধি রবার্ট ই লাইটহাইজার। ইতিমধ্যেই দুই পক্ষের মধ্যে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রাক আলোচনা হয়েছে। এজেন্ডা হিসেবে দুই দেশ নিজ নিজ পক্ষে ‘অবস্থানপত্র’ ঠিক করেছে। দুই দেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত ‘অবস্থানপত্র’ নথিভুক্ত করেছে।

সেখানে বাংলাদেশ ৫টি ইস্যুতে আলোচনার প্রস্তাব রাখতে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ৫টি ইস্যুতে আলোচনার প্রস্তাব করলেও সেখানে তাদের দুটি স্বতন্ত্র প্রস্তাবে ৮টি সুনির্দিষ্ট বাড়তি দাবি রয়েছে। তবে দুই দেশের ‘অবস্থানপত্রে’র এক নম্বর দাবিটি অভিন্ন। সেখানে চুক্তি রক্ষায় গুরুত্বারোপ, বাণিজ্য-বিনিয়োগ উন্নয়ন এবং দ্বিপক্ষীয় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়েছে।

বাংলাদেশের অবস্থানপত্র : আসন্ন টিকফা বৈঠকে তৈরি পোশাকের রফতানিতে ন্যায্যমূল্য দেয়ার জোরালো আহ্বান ছাড়াও ক্রেতা যাতে দ্বিপক্ষীয় লেনদেনে ন্যায্যমূল্য দেয়ার চর্চা নিয়মিত করে সেজন্য মার্কিন বাণিজ্য দফতরের কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী নেতাদের প্রতি জোর দাবি জানাবে।

মার্কিন বিনিয়োগ টানতে অর্থনৈতিক অঞ্চল দেয়ার প্রস্তাব থাকছে। এ লক্ষ্যে বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশ সরকার আইন করে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য যেসব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করেছে তা জোরালোভাবে তুলে ধরবে প্রতিনিধি দল।

বিনিময়ে আইসিটি, টেলিকমিউনিকেশন, এনার্জি ও অবকাঠামো উন্নয়ন খাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল বিনিয়োগ চাইবে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ চায় যুক্তরাষ্ট্র আরও বেশি প্রযুক্তি ও তথ্য বিনিময় করুক এবং বাণিজ্য সম্পর্কিত দক্ষতা উন্নয়নে ভূমিকা রাখুক।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নিয়ম এবং ট্রেড ফ্যাসিলিটিজ অ্যাগ্রিমেন্ট (টিএফএ) চুক্তি অনুযায়ী মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতের ন্যায্যতা তুলে ধরবে। তবে এবার যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সরাসরি জিএসপি সুবিধা চাইবে না। তবে শ্রম ইস্যুতে কথা উঠলে বাংলাদেশ পাল্টা অবস্থান তুলে ধরবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের সঙ্গে ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট (এফটিএ) করারও প্রস্তাব দেয়া হবে যুক্তরাষ্ট্রকে।

যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানপত্র : যুক্তরাষ্ট্র তাদের পণ্য ও সেবা রফতানিতে বাংলাদেশকে আরও বেশি শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয়ার প্রস্তাব করবে। এ ইস্যুতে তারা বাংলাদেশের বাজারে মার্কিন পণ্য ও সেবার সম্প্রসারণ করতে চায়।

সুনির্দিষ্টভাবে তুলা, বীমা, ফার্মাসিউটিক্যাল ও মেডিক্যাল ডিভাইস এবং ডিজিটাল ইকোনমির নামে বাংলাদেশে ই-কমার্স খাতে বাজার সম্প্রসারণ এবং শুল্কমুক্ত সুবিধা বৃদ্ধিতে কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানাবে। ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র জীবনবীমা কোম্পানি-আলিকো খুলে এ দেশে বীমা ব্যবসায় ঘাঁটি গেড়ে বসেছে। তবে সেটি এখনও ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে রয়ে গেছে।

আসন্ন টিকফা বৈঠকে ব্যাংকিং চ্যানেলেও যাতে যুক্তরাষ্ট্র এই বীমা সেবা চালু করতে পারে সে বিষয়ে প্রস্তাব রাখবে। একই সঙ্গে সেদেশের ফার্মাসিউটিক্যালস পণ্যের আমদানি সনদ বাংলাদেশ যাতে আরও সহজীকরণের পদক্ষেপ নেয় সেটিও তারা গুরুত্বসহকারে তুলে ধরবে। ডিজিটাল ইকোনমির নামে তারা বাংলাদেশে ই-কমার্স ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য বিশ্বের বৃহত্তর ই-কমার্স সাইট অ্যামাজন ডটকমের সেবা বাংলাদেশে চালুর প্রস্তাব দেবে।

অন্যদিকে ব্যবসা ও জলবায়ু বিনিয়োগ শিরোনামে তারা চারটি পৃথক উপখাতে সহযোগিতা চেয়ে বাংলাদেশের কাছে প্রস্তাব করতে যাচ্ছে। এর প্রথমটি হচ্ছে ই-বর্জ্য নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের পরিবেশ মন্ত্রণালয় যে আইন করতে যাচ্ছে, সেটি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি পণ্যের ব্যবসাকে দায়মুক্তি দেয়া। একই সঙ্গে এ খাতের ব্যবসায় যুক্তরাষ্ট্রকে সুযোগ করে দেয়া।

দুই : ড্রাগ অ্যান্ড কসমেটিকস আইনে বাংলাদেশে মার্কিন ওষুধ ও প্রসাধনীতে সুযোগ সৃষ্টি করা।

তিন : ট্রেড ফ্যাসিলিটিজ অ্যাগ্রিমেন্ট (টিএফএ) চুক্তি বাস্তবায়নে বাংলাদেশের সহায়তা কামনা এবং এক্ষেত্রে মার্কিন প্রশিক্ষণ ও সহায়তা গ্রহণ করা।

চার : মেধাস্বত্ব আইন কার্যকর করা। এক্ষেত্রে তারা বাংলাদেশে কপিরাইট আইনও দ্রুত কার্যকর দেখতে চায়। যা বাংলাদেশে মার্কিন প্যাটেন্ট গ্রহণে সুযোগ তৈরি হবে।

পাঁচ : সরকারি ক্রয় কাজে অধিক স্বচ্ছতা নিয়ে বিশদ আলোচনা করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।

ছয় : এর বাইরে রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর বাংলাদেশের পোশাক খাতে কর্মপরিবেশ এবং শ্রম আইন সংশোধন ও শ্রম অধিকার পরিস্থিতির কতটা উন্নতি ঘটেছে তা পর্যালোচনা এবং ব্যাখ্যা চাইবে।

জানতে চাইলে বাণিজ্য সচিব শুভাশীষ বসু জানান, আসন্ন টিকফা ফোরামের আলোচনায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগে কতটা উন্নতি হয়েছে বা বাধা দূর হয়েছে তা দু’দেশ ভালোভাবেই জানে। স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে ঘাটতি থাকলে আস্থার সংকট হতেই পারে। সেখান থেকে বের হয়ে আসার পথও খোলা আছে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বৈঠকে দু’দেশেরই বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব থাকবে। চুক্তির বিভিন্ন ধারায় যদি তা সমর্থন করে তাহলে পরের কাজটি সহজ হবে। নতুবা চুক্তি বহাল থাকা পর্যন্ত বারবার পুনঃআলোচনা হবে।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা ভুলে গেলে চলবে না, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের দিক থেকে বাংলাদেশ এখন অনেক দেশের কাছেই অগ্রাধিকার পাচ্ছে। বাংলাদেশও মনে রাখতে চায় বিশ্বায়নের যুগে আঞ্চলিক ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তির ওপরই বেশিরভাগ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নির্ভর করছে। তাই এ বৈঠকে কার্যকর কিছু না হলেও আগামী বৈঠকে দু’দেশের জন্যই বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন দরজা খুলে যেতে পারে।

তিনি বলেন, এটি একটি আলোচনার প্ল্যাটফর্ম মাত্র। যা-ই আলোচনা করা হোক কিংবা প্রতিশ্র“তির পর্যায়ে থাকুক, দেশের স্বার্থরক্ষা করেই তা করা হবে।

জানা গেছে, ২০১৩ সালের ২৫ নভেম্বর বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা ফোরাম সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তৃতীয় বৈঠক হয় ২০১৭ সালের ১৭ মে ঢাকায়।

বাংলাদেশে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও সেলের পরিচালক হাফিজুর রহমান বলেন, এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বড় চাওয়া হচ্ছে সেদেশের বাজারে যাতে তৈরি পোশাকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হয় সে বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপে যাওয়া। এই বৈঠকে অবশ্যই এ বিষয়ে জোরালো অবস্থান থাকবে বাংলাদেশের। এর পাশাপাশি ডব্লিউটিওর বালি মিনিস্টিরিয়ালের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রফতানি পণ্যের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশাধিকারের সম্প্রসারণ ও শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা বৃদ্ধি এবং সার্ভিস ওয়েভার দাবিটিও প্রাধান্য পাবে। বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশের তথ্যাদি তুলে ধরা হবে। যাতে বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগের পথ সুগম হয়।

জানা গেছে, একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের পণ্য রফতানির সবচেয়ে বড় বাজার হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মোট রফতানির প্রায় ৩০ শতাংশ সেখানকার বাজারে যাচ্ছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে ৬.২৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করেছে বাংলাদেশ।

অপরদিকে আমদানি করেছে মাত্র ১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। যুগান্তর