অর্থ-বাণিজ্য ডেস্ক:: বিশ্বের মাত্র ১৬টি দেশে এখন কার্বন কর প্রচলন আছে, সেখানে এখনই বাংলাদেশে কার্বন কর চালুর প্রস্তাব করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই)। কার্বন ডাই-অক্সাইড উৎপাদনের জন্য তথা পরিবেশ দূষণকারী ডিজেল ও পেট্রলের ওপর বাড়তি ১০ শতাংশ ‘কার্বন কর’ বসাতে সরকারের কাছে প্রস্তাব তুলে ধরে সংস্থাটি বলছে, জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের ফলে নির্গত কার্বনের ওপর ১০ শতাংশ কর বসালে চলতি অর্থবছর বাড়তি চার হাজার ৩০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ১০ লাখ টন কার্বন নিঃসরণ কমে যাবে। কার্বন নিঃসরণ কমাতে কার্বন কর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলেও জানায় পিআরআই।

গতকাল রবিবার রাজধানীর বনানীতে নিজস্ব কার্যালয়ে বাংলাদেশে কার্বন কর প্রচলনের প্রস্তাব দেয় পিআরআই। আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা মসিউর রহমান। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাঈদুজ্জামান, সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান ও পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান ড. জায়েদী সাত্তার। আর অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থাটির ভাইস চেয়ারম্যান ড. সাদিক আহমেদ। উল্লেখ্য, কার্বন কর হলো জ্বালানি ব্যবহারের ফলে নির্গত কার্বনের ওপর ধার্য করা কর।

মূল প্রবন্ধে সাদিক আহমেদ দেখিয়েছেন, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, সুইজারল্যান্ড, জাপানসহ সারা বিশ্বে এখন ১৬টি দেশে কার্বন কর চালু আছে। বাংলাদেশে এখনো কার্বন কর চালু হয়নি। কয়েক বছর ধরে কার্বন কর বসাতে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা চলছে। উন্নয়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত কার্বন নিঃসরণের মাত্রা বাড়ছে। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সত্তরের দশক থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর গড়ে ৭ শতাংশ হারে কার্বন নিঃসরণ বেড়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এটি ৯ শতাংশ হারে বাড়ছে। দ্রুত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের কারণে এমনটা হচ্ছে। বিদ্যুৎ ও পরিবহন ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় কার্বন নিঃসরণের মাত্রা বাড়ছে বলেও দাবি করেন সাদিক আহমেদ। অবশ্য তিনি এও বলেন, উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের কার্বন নিঃসরণের মাত্রা অনেক কম। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণের মাত্র ০.২ শতাংশ কার্বন নিঃসরণ করে বাংলাদেশ। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ও পরিবহন খাতে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা বেশি উল্লেখ করে তিনি বলেন, আপাতত, পেট্রল ও ডিজেলের ওপর কার্বন কর বসানো যেতে পারে। তিনি বলেন, পেট্রল ও ডিজেলের ওপর কার্বন কর বসাতে পারলে ২০৪১ সালে পাঁচ কোটি ৮০ লাখ টন কার্বন নিঃসরণ কম হবে। এ ছাড়া একই বছর এই খাত থেকে বাড়তি ২২ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে। তাঁর মতে, বাংলাদেশে কার্বন নিঃসরণ কমাতে হলে কর বসানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকেও বাড়তি নজর দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে মসিউর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশ ধীরে ধীরে বাহির থেকে বিদ্যুৎ আমদানি বাড়াচ্ছে। আমরা ভারত থেকে প্রায় এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করছি। ভুটানের কাছ থেকেও জলবিদ্যুৎ আমদানির বিষয়ে কথা হচ্ছে। এতে করে আমাদের জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভরতা কমছে। মসিউর রহমান বলেন, সোলার প্যানেল বসাতে যে পরিমাণ জমি থাকা প্রয়োজন, আমাদের দেশে সে জমি পাওয়া অত্যন্ত দুষ্কর। তাই সোলার প্যানেল ততটা বিকশিত হচ্ছে না।

আহসান এইচ মনসুর বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বাড়তি যে কর পাওয়া যাবে সে টাকা সড়ক সংস্কার ও উন্নয়নে খরচ করা যেতে পারে। তাঁর মতে, বাংলাদেশে কার্বন নিঃসরণের জন্য কারখানা ও পরিবহন কোনো সমস্যা হতে পারে না। ক্রেতাদের জোট অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্সসহ উন্নত বিশ্বের চাপে বাংলাদেশের কারখানাগুলো পরিবেশসম্মত হয়ে যাবে শিগগিরই। পরিবহনেও নতুন নতুন প্রযুক্তি যুক্ত হবে ২০৩০ সালের মধ্যে। সমস্যা বেশি হচ্ছে বিদ্যুেকন্দ্রে। বিদ্যুেকন্দ্র পরিচালনার জন্য যে ডিজেল ব্যবহার হয়, তা কার্বন নিঃসরণ করে বেশি।

সেলিম রায়হান বলেন, ‘বাংলাদেশে উন্নয়ন হচ্ছে। কিন্তু এই উন্নয়ন হতে গিয়ে পরিবেশের অনেক ক্ষতি হচ্ছে। এই ক্ষতি কমাতে আমাদের কার্বন কর বসানো যেতে পারে। যদিও আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা এ বিষয়ে নানা অজুহাত দাঁড় করাবেন।’ তবে এখনই বাংলাদেশে কার্বন কর বসানোর সময় আসেনি বলে মত দিয়েছেন বৈঠকে উপস্থিত একাধিক বক্তা।

পিআরআই জানিয়েছে, কার্বন কর সবচেয়ে বেশি যুক্তরাজ্যে ৭১ শতাংশ। দেশটি পেট্রলের ওপর বাড়তি ৭১ শতাংশ কার্বন কর বসিয়েছে। এর পরে আছে নেদারল্যান্ডসে ৬৯ শতাংশ, ইতালিতে ৬৮ শতাংশ ও ফ্রান্সে ৬৬ শতাংশ। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে এখন উন্নয়ন হচ্ছে। উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা খুবই কম। মাথাপিছু কার্বন নিঃসরণের মাত্রা এক টনের কম বাংলাদেশে; যেখানে উন্নত বিশ্বে মাথাপিছু কার্বন নিঃসরণের মাত্রা ১৪ থেকে ১৬ টন। এখনই বাংলাদেশে কার্বন কর বসানোর সময় আসেনি বলে মত বিশেষজ্ঞদের।