অর্থনৈতিক ডেস্ক:: আমদানি ব্যয় বাড়লেও বাড়ছে না রফতানি আয়। চলতি অর্থবছরের (২০১৭-১৮) প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) দেশের পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ চেয়েও বেশি। যার প্রভাব পড়েছে বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের করা হালনাগাদ প্রতিবেদনে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের তৃতীয় মাস সেপ্টেম্বর শেষে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬৫ কোটি ডলার, যা গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৫৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার। সে হিসেবে এক বছরের ব্যবধানে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ২০৮ কোটি ৬০ লাখ ডলার বা ১৩৩ শতাংশ। প্রতি ডলার ৮০ টাকা হিসেবে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ১৬ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমদানি ব্যয় বেড়েছে তবে সে তুলনায় রফতানি আয় হয়নি বলে বড় ধরনের বাণিজ্য ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এ ছাড়াও পদ্মাসেতু, মেট্রোরেলসহ বড় প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ায় প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আমদানি বেড়েছে। এ কারণেই বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে। তবে শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনীয় যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি হলে ভালো। এতে দেশে বিনিয়োগ বাড়বে এবং অর্থনীতির গতি সঞ্চার হবে। কিন্তু এ অর্থ পাচার হলে ফল অত্যন্ত খারাপ হবে।

কারণ হিসেব তারা বলছেন, রেমিট্যান্স প্রবাহ অনেক কমে গেছে, ফলে বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যে (ব্যালান্স অফ পেমেন্ট বা বিওপি) ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। এ অবস্থা বিদ্যমান থাকা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ভালো নয়।

এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, আমদানি হচ্ছে কিন্তু সেই হারে রফতানির প্রবৃদ্ধি বাড়েনি। এ কারণেই বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে। দেশে আমদানির পরিমাণ বেড়েছে এটা মূলধনী যন্ত্রপাতির হলে ভালো। তবে সে হারে দেশে বিনিয়োগ বাড়েনি। তাই আমদানির নামে অর্থ পাচার হচ্ছে কি না তা সংশ্লিষ্টদের খতিয়ে দেখতে হবে।

এদিকে প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে ইপিজেডসহ রফতানি খাতে বাংলাদেশ আয় করেছে ৮৫৪ কোটি ৯০ লাখ ডলার। এর বিপরীতে আমদানি বাবদ ব্যয় হয়েছে এক হাজার ২১৯ কোটি ৯০ লাখ ডলার। এ হিসাবে বাণিজ্য ঘাটতির দাঁড়ায় ৩৬৫ কোটি ডলার।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকার অর্থ হলো নিয়মিত লেনদেনে দেশকে কোনো ঋণ করতে হচ্ছে না। আর ঘাটতি থাকলে সরকারকে ঋণ নিয়ে তা পূরণ করতে হয়। সেই হিসাবে উন্নয়নশীল দেশের চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকা ভালো। কিন্তু গত কয়েক বছর উদ্বৃত্তের ধারা অব্যাহত থাকলেও গেল অর্থবছরে ঋণাত্মক ধারায় চলে গেছে। সেপ্টেম্বরেও এ ধারা অব্যাহত রয়েছে।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৪-১৫ ও ২০১৫-১৬ অর্থবছর জুড়ে চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত ছিল। এতে বৈদেশিক দায় পরিশোধে সরকারকে বেগ পেতে হয়নি। কিন্তু ২০১৭-১৮ অর্থবছরের তৃতীয় মাসে ১৭৯ কোটি ১০ লাখ ডলার ঋণাত্মক হয়েছে। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী এর পরিমাণ প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা। যা এর আগের অর্থবছরে একই সময়ে উদ্বৃত্ত ছিল ৫৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার। আমদানির তুলনায় রফতানি আয় না হওয়া, রেমিট্যান্স প্রবাহে ধীরগতি ও দেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের বেতনভাতা পরিশোধে সেবামূল্য ব্যয় বেশি হওয়ায় চলতি হিসাবে ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে।

সেপ্টেম্বর শেষে সেবাখাতে বিদেশিদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হয়েছে ২০৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার। আর বাংলাদেশ এ খাতে আয় করেছে মাত্র ১০০ কোটি ৮০ লাখ ডলার। এ হিসাবে তিন মাসে সেবায় বাণিজ্যে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১০২ কোটি ৬০ লাখ ডলারে। যা গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরের তৃতীয় মাস সেপ্টেম্বর শেষে ছিল (ঘাটতি) ৭৬ কোটি ১০ লাখ ডলার।

এদিকে আলোচিত সময়ে দেশে বাণিজ্য ঘাটতি থাকলেও বেড়েছে বিদেশি বিনিয়োগ। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) দেশে এসেছে মোট ৭৭ কোটি ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৭০ কোটি ৬০ লাখ ডলার। আর শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে বেড়েছে ১৩ গুণ। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে নিট পোর্টফোলিও বিনিয়োগ হয়েছে ৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল মাত্র ৫০ লাখ ডলার।