অর্থনৈতিক ডেস্ক:: চুরি যাওয়া রিজার্ভের অর্থ ফেরত আনতে নতুন বছরে ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের (আরসিবিসি) বিরুদ্ধে মামলা করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এমনটিই জানিয়েছেন বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) উপদেষ্টা দেবপ্রসাদ দেবনাথ। তিনি বলেন, ‘চুরি যাওয়া অর্থ ফেরত আনতে ২০১৭ সালজুড়ে দুই দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। ফিলিপাইনের আদালতও আরসিবিসিকে দায়ী করেছেন। কিছু টাকা প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশকে ফেরত দিলেও বাকি টাকা দিতে গড়িমসি করছে। ফলে আরসিবিসির বিরুদ্ধে মামলা করা জরুরি হয়ে পড়েছে।’

এদিকে, অর্থ উদ্ধারের জন্য অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে একটি দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরের কাছে লেখা এক চিঠিতে তিনি বলেন, ‘ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভিত্তি হলো বিশ্বাস। ফিলিপাইনের আরসিবিসি সেই বিশ্বাসের অনুপযুক্ত। তাদের ব্যাংকে চুরি করা অর্থ জমা হয়েছে। অথচ সেই অর্থ ফেরত দিতে তারা গড়িমসি করছে। ওই চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, এটি প্রমাণিত যে, অর্থের উৎস হচ্ছে বাংলাদেশ। কতিপয় দুষ্কৃতকারী এ অর্থ পাচার করেছে। চুরির অর্থ নিয়ে যে ব্যাংক ব্যবসা করে, সে ব্যাংক ব্যাংকিং জগতে থাকতে পারে না।’ ওই চিঠির অনুলিপি আইন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও পাঠানো হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে দেবপ্রসাদ দেবনাথ বলেন, ‘নতুন বছরের শুরুর দিকেই হয়তো মামলায় যেতে হবে। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় আরসিবিসি টাকা ফেরত না দিলে মামলা করতেই হবে। এ জন্য সব স্টেক হোল্ডারের সঙ্গে আলোচনা চলছে।’ তিনি উল্লেখ করেন, ‘পুরো অর্থ ফেরত পাওয়ার জন্য যা যা করা দরকার, তার সবই করা হবে। সরকার থেকে এরকমই দিক-নির্দেশনা রয়েছে।’

দেবপ্রসাদ দেবনাথ আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা ফেরত দিতে বাধ্য তারা। কারণ, ফিলিপাইনের আদালতই রিজাল ব্যাংককে দায়ী করেছেন। এই ঘটনায় রিজাল ব্যাংককে ২০ কোটি ডলার জরিমানাও করেছে ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। দেশটির সাধারণ মানুষও বিশ্বাস করে, চুরির সঙ্গে রিজাল ব্যাংকের কর্মকর্তারা জড়িত।’ তিনি উল্লেখ করেন, ‘এমন অবস্থায় আরসিবিসি তার গ্রাহদের আস্থা ফেরাতে দেশটির সাধারণ মানুষের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এরই মধ্যে ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির সঙ্গে জড়িত হিসাবগুলোর লেনদেনে বিভিন্ন গুরুতর অনিয়ম পাওয়ায় আরসিবিসি ব্যাংকের বিরুদ্ধে ফিলিপাইনের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পরিমাণ জরিমানা (১ বিলিয়ন পেসো বা আনুমানিক ২১ মিলিয়ন ইউএস ডলার) করেছে। এ থেকে আরসিবিসি ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় জড়িত থাকা ও গুরুতর অনিয়ম বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের দাবি আরও সুস্পষ্ট হয়েছে।

জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের চুরি যাওয়া অর্থ উদ্ধারে বিশ্বব্যাংক, এপিজি, এগমন্ট গ্রুপ ও ইন্টারপোল বাংলাদেশকে সহায়তা করছে। ফিলিপাইনের আদালতে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে সাত জনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করেছে ফিলিপাইনের বিচার বিভাগ। বিভিন্ন পক্ষের তদন্ত শেষে ১ কোটি ৪৫ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলার ফেরত দেওয়ার জন্য আদেশও দিয়েছেন ফিলিপাইনের আদালত। এর ফলে সাইবার হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাচারের বিষয়টিও নিশ্চিত হওয়া গেছে। অবশ্য এখন পর্যন্ত দেড় কোটি ডলার ফেরত পেয়েছে বাংলাদেশ। তবে মামলা ছাড়া বাকি অর্থ দিতে নারাজ ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংক।

জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে সাইবার হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে পাচার হওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ মিলিয়ন ইউএস ডলারের মধ্যে ৪৬ লাখ ৩ হাজার মার্কিন ডলার এবং ৪৮ কোটি ৮২ লাখ ৮০ হাজার ফিলিপিনো পেসো (মোট ১ কোটি ৪৫ লাখ ৪০ হাজার ডলার) ফিলিপাইন আদালতের আদেশের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংককে গত বছরের ১০ নভেম্বর ফেরত দিয়েছে। এর আগে, ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসেই আরসিবিসি বাংলাদেশ ব্যাংককে ৭০ হাজার মার্কিন ডলার ফেরত দেয়। এছাড়া ২ কোটি ৯০ লাখ ডলারের সন্ধান পাওয়া গেছে। সন্ধান পাওয়া বাকি অর্থ ফেরতের বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন। তবে অবশিষ্ট ৩ কোটি ৭০ লাখ ডলারের কোনও হদিস নেই।

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে সুইফট কোডের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রায় ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি করে নেয় হ্যাকাররা। এর মধ্যে ২ কোটি ডলার চলে যায় শ্রীলঙ্কা ও ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার চলে যায় ফিলিপাইনের জুয়ার আসরে। ঘটনার একমাস পর বিষয়টি বাংলাদেশ জানতে পারে ফিলিপাইনের একটি পত্রিকার খবরের মাধ্যমে। ওই সময় বিষয়টি চেপে রাখতে গিয়ে সমালোচনার মুখে পড়ে গভর্নরের পদ ছাড়তে বাধ্য হন ড. আতিউর রহমান। বড় ধরনের রদবদল করা হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়েও।