অর্থ-বাণিজ্য ডেস্ক রিপোর্ট:: আমদানি-রফতানির আড়ালে অর্থ পাচার ও ব্যাংকিং চ্যানেলে সন্ত্রাসে অর্থায়নের অভিযোগ পুরনো। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের ১১ মাসে (জুলাই-মে) দেশের আমদানি ব্যয় বেড়েছে ২৫ শতাংশের বেশি। আমদানি ব্যয়ের এ প্রবৃদ্ধি অর্থ পাচারের সন্দেহ উসকে দিয়েছে। আর্থিক খাতে বেড়েছে সন্দেহজনক লেনদেনও। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকের কার্যক্রমে মানুষের মধ্যে কিছুটা সন্দেহ বা অবিশ্বাস দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে ব্যাংক নির্বাহীদের সতর্কও করেছেন তিনি।

দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহীদের (সিইও) জন্য মানি লন্ডারিং এবং সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ বিষয়ে গতকাল দিনব্যাপী সম্মেলনের আয়োজন করে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।

সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ফজলে কবির বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকের কার্যক্রমে মানুষের মধ্যে যে অবিশ্বাস দেখা দিয়েছে, ব্যাংকগুলোর জন্য তা অশনিসংকেত। পরিস্থিতি উত্তরণে সুশাসন নিশ্চিতে ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। সঠিক জায়গায় সঠিক ব্যক্তিকে নিয়োগ দিতে হবে। সেই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা।

ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন গভর্নর। তিনি বলেন, সরকারি-বেসরকারি যেকোনো প্রতিষ্ঠানের সফলতা নির্ভর করে তার ব্যবস্থাপনা ও অভ্যন্তরীণ সুশাসনের ওপর। একটি সুশাসিত প্রতিষ্ঠান অন্য প্রতিষ্ঠানের তুলনায় বেশি দক্ষতার সঙ্গে সম্পদের ব্যবহার করতে পারে। ব্যাংকের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য এটি আরো বেশি সত্য। নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের করপোরেট গভর্ন্যান্স-সংক্রান্ত নিয়ম-নীতি সঠিকভাবে পরিপালনের জন্য এমডিদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

২০১৭-১৮ অর্থবছরের ১১ মাসে (জুলাই-মে) রেকর্ড ৫ হাজার ৫২ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে। আগের অর্থবছরের ওই সময়ের তুলনায় এ আমদানি ব্যয় ২৫ দশমিক ৫২ শতাংশ বেশি। যদিও ২০১৬-১৭ অর্থবছর আমদানি ব্যয়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ শতাংশ।

গভর্নর ফজলে কবির এ প্রসঙ্গে বলেন, বিদায়ী অর্থবছরে দেশের আমদানি ব্যয় প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। বিপুল মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি খোলা হয়েছে। এটি অর্থনীতির জন্য শুভ সংবাদ। তবে আমদানির আড়ালে যাতে অর্থ পাচার না হয়, সে বিষয়ে ব্যাংকারদের সতর্ক থাকতে হবে।

রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে আরো বক্তব্য রাখেন বিএফআইইউ প্রধান ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান, অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, তফসিলি ব্যাংকগুলোর মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ-বিষয়ক কর্মকর্তাদের সংগঠন এএসিওবিবির সভাপতি ও ব্যাংক এশিয়ার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ বোরহানউদ্দিন এবং বিএফআইইউর পরামর্শক দেবপ্রসাদ দেবনাথ। ব্যাংক এমডিদের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান ও উপপ্রধান মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ পরিপালন কর্মকর্তারাও (ক্যামেলকো ও ডিক্যামেলকো) অংশ নেন।

আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান বলেন, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল একটি দেশে অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে ব্যাংক। আর্থিক খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ব্যাংক মুদ্রাবাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফলে একটি অপরাধমুক্ত, স্থিতিশীল ও দক্ষ ব্যাংকিং ব্যবস্থা বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিএফআইইউ বিভিন্ন সময়ে ব্যাংকগুলোর জন্য পরিপালনীয় নির্দেশনা জারি করে। এ নির্দেশনা ব্যাংকের কাজকে আরো নিরাপদ ও সহজ করে।

মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ সূচকে বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে উল্লেখ করে আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান বলেন, আমরা এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিংয়ের (এপিজি) কো-চেয়ার নির্বাচিত হয়েছি। এটি আমাদের জন্য গর্বের। এপিজি নির্ধারিত মানদণ্ডের প্রত্যেকটি সূচকে আমরা ভালো করেছি। সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে আমাদের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্সে’। ব্যাংকগুলো সহযোগিতা না করলে বিএফআইইউ কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে না।

অনেক চ্যালেঞ্জ নিয়ে নতুন অর্থবছর শুরু হয়েছে জানিয়ে আগামীতে বিএফআইইউর পরামর্শক দেবপ্রসাদ দেবনাথ বলেন, সাইবার ক্রাইমের ক্ষেত্রে এশিয়ার দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে। এসব দেশে সুশাসন ব্যবস্থার দুর্বলতাই ঝুঁকির প্রধান কারণ। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা মানি লন্ডারিংয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকা থেকে বেরোতে পেরেছি। আগামীতেও আমাদের সতর্ক পথ চলতে হবে।

মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে কেওয়াইসির ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়ার আহ্বান জানান এবিবি চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। সূত্র: বণিক বার্তা