অর্থনৈতিক ডেস্ক:: ব্যাংকের বাইরেও চলছে বৈধ ব্যাংকিং কার্যক্রম। লেনদেনও হচ্ছে ব্যাংকের আদলেই। ব্যাংকের শাখার মতোই গ্রাহক বিভিন্ন ধরনের সেবা নিচ্ছেন। এখান থেকে গ্রাহক তার চাহিদা মতো ঋণ নিচ্ছেন, আবার তা পরিশোধও করছেন। সারাদেশে তিন হাজার ৫৬৫টি আউটলেটে ১০ লাখেরও বেশি গ্রাহক বিভিন্ন ধরনের ব্যাংকিং সেবা পাচ্ছেন। অনেক ইউনিয়নেও পাওয়া যাচ্ছে এ সেবা। এজেন্ট ব্যাংকিং নামের এইসব আউটলেট থেকে ব্যাংকের শাখার মতোই গ্রাহকরা নতুন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলছেন, তাতে ইচ্ছেমতো টাকা জমা ও উত্তোলন করছেন।

ব্যাংকের শাখা না হলেও যখন-তখন এসব আউটলেট থেকে অন্য অ্যাকাউন্টে টাকা স্থানান্তরও (দেশের ভেতর) করা যাচ্ছে। এমনকি এখান থেকে বিভিন্ন মেয়াদি আমানত প্রকল্পও চালু হচ্ছে, একইভাবে আমানতের টাকা প্রতি মাসে জমাও নেওয়া হচ্ছে, ইউটিলিটি সার্ভিসের বিলও পরিশোধ করা হচ্ছে এখান থেকেই। সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় সরকারি সব ধরনের ভর্তুকিও গ্রহণ করা হচ্ছে ব্যাংক শাখার বাইরের এইসব আউটলেট থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ১০ লাখ ৩৮ হাজার ২৪২ জন গ্রাহক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলেছেন। গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত এই সংখ্যা ছিল পাঁচ লাখ ৪৪ হাজার ৫৩৬। এই হিসেবে ৯ মাসে গ্রাহক বেড়েছে চার লাখ ৯৩ হাজার ৭০৬ জন।

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের গ্রাহকদের মধ্যে তিন লাখ ১৬ হাজার ৯১৬ জন নারী। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আউটলেটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে তিন হাজার ৫৬৫টি। আর এজেন্ট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ১৫টি। এজেন্ট ব্যাংকিং হিসাবে জমা হয়েছে ৯২২ কোটি আট লাখ টাকার আমানত।

এ প্রসঙ্গে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান আনিস এ খান বলেন, ‘এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের প্রতিনিয়ত প্রসার ঘটছে। এর সম্ভাবনাও অনেক বেশি। এটা আমাদের দেশে আলোড়ন ফেলে দিতে পারে।’

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোট গ্রাহকের ৩ শতাংশ দিনমজুর এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ব্যাংকে হিসাব খুলেছেন। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ২৯ শতাংশ গ্রাহক ছোট ব্যবসায়ী। এছাড়া, মোট গ্রাহকের ৭ শতাংশ কৃষক ও ১৮ শতাংশ গৃহিণী।

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এ পর্যন্ত ১৮টি বাণিজ্যিক ব্যাংককে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৩টি ব্যাংক মাঠপর্যায়ে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

ব্যাংকগুলো হলো, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক, মধুমতি ব্যাংক, মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, দ্য সিটি ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড।

জানা গেছে, এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটগুলো কোনও চেক বই বা ব্যাংক কার্ড ইস্যু করতে পারে না। এছাড়া, এজেন্টরা বৈদেশিক কোনও লেনদেনও করতে পারে না। এজেন্টদের কাছ থেকে ব্যাংকের কোনও চেকও ভাঙানো যায় না।

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে গ্রাহক তার চলতি হিসাবে সর্বোচ্চ চার বার ২৪ লাখ টাকা নগদ জমা এবং সর্বোচ্চ দুটি লেনদেনে ১০ লাখ টাকা উত্তোলন করতে পারেন। সঞ্চয়ী হিসাবে সর্বোচ্চ দুবার আট লাখ টাকা নগদ জমা এবং সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকা করে দুটি লেনদেনে ছয় লাখ টাকা উত্তোলন করতে পারেন। তবে রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে উত্তোলনসীমা প্রযোজ্য হয় না। দিনে দুবার জমা ও উত্তোলন করা যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই তিন মাসে এক লাখ ৬৫ হাজার ১৯৫টি নতুন হিসাব খোলা হয়েছে। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকে এখন ছয় লাখ ৮২ হাজার ৯৭৯ জন গ্রাহকের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। ব্যাংক এশিয়ায় রয়েছে দুই লাখ ৩৭ হাজার ২৭৮ জন গ্রাহক। আর আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকে রয়েছে ৬০ হাজার ৫৪২ জন গ্রাহকের ব্যাংক হিসাব।

গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আমানত সবচেয়ে বেশি এসেছে গ্রাম থেকে– ৭৮৩ কোটি ১০ লাখ টাকা। শহরের এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আওতায় খোলা হিসাবগুলোতে আমানত আছে ৯৮ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রমে এগিয়ে থাকা তিনটি ব্যাংকের মাধ্যমে ৭৮ কোটি ৭২ লাখ টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংক এশিয়া তাদের এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ৭৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা ঋণ বিতরণ করেছে। আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক করেছে তিন কোটি ৪৬ লাখ টাকা এবং সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক ঋণ বিতরণ করেছে এক লাখ টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে এজেন্ট ব্যাংকিং চালু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০১৩ সালের ৯ ডিসেম্বর এজেন্ট ব্যাংকিং নীতিমালা জারির পর ২০১৪ সালে প্রথম এ সেবাচালু করে বেসরকারি খাতের ব্যাংক এশিয়া।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর চৌধুরী বলেন, জনগণের দোরগোড়ায় ব্যাংকিং সেবা পৌঁছানোর অন্যতম পরিপূরক হিসেবে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যকরী ভূমিকা পালন করছে। তিনি আরও বলেন, যেসব ব্যাংকের প্রত্যন্ত অঞ্চলে শাখা খুলতে গেলে সমস্যা হয়, তারা এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রাহকদের সেবা দিতে পারছে।