অর্থনৈতিক ডেস্ক:: সংসদে ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

বৃহস্পতিবার দুপুরে তিনি জাতীয় সংসদে এই বাজেট পেশ করেন।

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী জানান, প্রস্তাবনায় বেশকিছু পণ্যে নতুন করে সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এর ফলে নিশ্চিতভাবেই এসব পণ্যের দাম বাড়ছে। শুল্ক আরোপের পক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, সম্পূরক শুল্ক আরোপ করে দেশীয় শিল্পকে আন্তর্জাতিক শিল্পের প্রতিযোগিতা ঝুঁকি থেকে রক্ষা করা হয়। তাছাড়া পণ্যের অনভিপ্রেত ব্যবহার রোধ করাও এই শুল্ক আরোপের অন্যতম উদ্দেশ্য।

বাজেট প্রস্তাবণায় স্বাস্থ্যঝুঁকি ও ব্যবহার হ্রাস করার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এনার্জি ড্রিংকের ওপর ২৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্কের স্থলে ৩৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়।

প্রসাধন সামগ্রী এবং ত্বক পরিচর্যার প্রসাধন সামগ্রী (ঔষধে ব্যবহৃত পদার্থ ব্যতীত), সানস্ক্রিন বা সান ট্যান সামগ্রী; হাত, নখ বা পায়ের প্রসাধন সামগ্রীর ওপর ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপিত আছে। বাণিজ্যে সমতা বিধানের লক্ষ্যে সমজাতীয় অন্যান্য সামগ্রীর ওপরও ১০ শতাংশ হারে সম্পূরক শুল্ক আরোপ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

শেভের সময় বা শেভের আগে বা পরে ব্যবহার্য সামগ্রী, শরীরের দুর্গন্ধ এবং ঘাম দূরীকরণে ব্যবহৃত সামগ্রী (আতর ব্যতীত), সুগন্ধযুক্ত বাথ সল্ট এবং অন্যান্য গোসল সামগ্রী, কক্ষের দুর্গন্ধ দূরীকরণে ব্যবহৃত অন্যান্য সুগন্ধি সামগ্রী (আগরবাতি এবং সমজাতীয় পণ্য ব্যতীত) ও সমজাতীয় অন্যান্য পণ্যের ব্যবহার সীমিত করার লক্ষ্যে সম্পূরক শুল্কহার ১০ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

সিগারেট পেপার ও বিড়ি পেপারের ওপর সম্পূরক শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ২৫ শতাংশ, সিরামিকের বাথটাব ও জিকুজি, শাওয়ার, শাওয়ার ট্রে’র ওপর সম্পূরক শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ৩০ শতাংশ, বিদ্যুতের ব্যবহার হ্রাস করার লক্ষ্যে আলট্রা ভায়োলেট/ইনফ্রা-রেড ল্যাম্প ব্যতীত অন্যান্য ফিলামেন্ট ল্যাম্পের ব্যবহার কমানোর জন্য ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ, পাটের ব্যবহার বৃদ্ধি ও পরিবেশ সুরক্ষার স্বার্থে পলিথিলিনের ব্যবহার কমানোর জন্য সকল ধরনের পলিথিন ব্যাগ, প্লাস্টিক ব্যাগ (ওভেন প্লাস্টিক ব্যাগসহ) ও মোড়ক সামগ্রীর উপর ৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

বাজেট প্রস্তাবণায় অর্থমন্ত্রী জানান, ইতোপূর্বে ২২টি সেবার ক্ষেত্রে সংকুচিত ভিত্তিমূল্য প্রচলিত ছিল। একটি প্রমিত মূল্য সংযোজন কর ব্যবস্থা প্রবর্তনের অংশ হিসেবে সংকুচিত ভিত্তিমূল্য হতে ক্রমান্বয়ে বেরিয়ে আসতে হবে। বর্তমানে প্রযোজ্য ৯টি সংকুচিত ভিত্তিমূল্য কমিয়ে ৫টিতে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে নিম্নবর্ণিত প্রস্তাব করছি- ভবন নির্মাণ সংস্থা খাতে ১-১১০০ বর্গফুট পর্যন্ত ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে ১.৫ শতাংশ হারে, ১১০১-১৬০০ বর্গফুট পর্যন্ত ২.৫ শতাংশ হারে, ১৬০১ বর্গফুট হতে তদুর্ধ্ব ৪.৫ শতাংশ মূসক আরোপিত আছে। আবাসন খাতের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে ১-১৬০০ বর্গফুট পর্যন্ত ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে ২ শতাংশ হারে, ১৬০১ বর্গফুট হতে তদূর্ধ্ব পরিমাপের ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে ৪.৫ শতাংশ হারে মূসক আরোপের প্রস্তাব করছি। পুরাতন ফ্ল্যাট পুনঃরেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে ২ শতাংশ হারে মূসক আরোপের প্রস্তাব করছি।

আসবাবপত্র সেবার ক্ষেত্রে আসবাবপত্র উৎপাদন পর্যায়ে ৬ শতাংশের স্থলে ৭ শতাংশ এবং বিপণন পর্যায়ে ৪ শতাংশের স্থলে ৫ শতাংশ মূসক আরোপ, পরিবহন ঠিকাদার (পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে), নিলামকৃত পণ্যের ক্রেতা (ইলেক্ট্রনিক পদ্ধতিতে নিলামসহ), নিজস্ব ব্রান্ড সম্বলিত তৈরি পোশাক বিপণনের ক্ষেত্রে বর্তমানে আরোপিত ৪ শতাংশের স্থলে ৫ শতাংশ মূসক আরোপের প্রস্তাব করছি।

এছাড়া স্থানীয় বাজারে বিক্রয়ের জন্য ব্রান্ডবিহীন পোশাক পণ্যের বিপণনের ক্ষেত্রেও সমহারে ভ্যাট প্রযোজ্য হবে, তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর সেবার ওপর ৪ দশমিক ৫ শতাংশের স্থলে ৫ শতাংশ হারে মূসক আরোপ, আমদানি পর্যায়ে অগ্রিম মূসক ও ব্যবসায়ী পর্যায়ের মূসক ৪ শতাংশ এর স্থলে ৫ শতাংশ, বর্তমানে ইন্টারনেট বা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে পণ্য বা সেবার ক্রয়-বিক্রয় যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছে।

এ পণ্য বা সেবার পরিসরকে আরও বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে ভার্চুয়াল বিজনেস নামে একটি সেবার সংজ্ঞা সৃষ্টি করা হয়েছে। এর ফলে অনলাইনভিত্তিক যেকোনো পণ্য বা সেবার ক্রয়-বিক্রয় বা হস্তান্তরকে এ সেবার আওতাভুক্ত করা সম্ভব হবে। তাই ভার্চুয়াল বিজনেস সেবার ওপর ৫ শতাংশ হারে মূসক আরোপ করার প্রস্তাব করছি।

প্রকৃত বাজার মূল্য, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কয়েকটি পণ্য যেমন- টমেটো পেস্ট, কেচাপ, সস, বিভিন্ন ফলের পাল্প, ফলের জুস, ব্যবহার অযোগ্য ট্রান্সফর্মার অয়েল, লুবব্লেন্ডিং অয়েল, বিভিন্ন ধরনের পেপার ও পেপার প্রডাক্ট, কটন ইয়ার্ন বর্জ্য, ওয়েস্ট ডেনিম, স্ক্র্যাপ/শিপ স্ক্র্যাপ, সিআর কয়েল, জিপি শীট, সিআই শিট, রঙিন সিআই শিট, ব্লেড, চশমার ফ্রেম ও সানগ্লাস ইত্যাদির ট্যারিফ মূল্য যৌক্তিকীকরণ করার প্রস্তাব করার কথাও বাজেট প্রস্তাবনায় জানান মুহিত।

এছাড়া, হেলিকপ্টার সেবা, বাইসাইকেল, মধু, নারকেল, ব্রাজিল বাদাম এবং কাঁচা বাদাম, কাজুবাদাম, আখরোট, শস্যের শিকড়, গোটা, গমছাড়া অন্য কোনও খাদ্যশস্য ময়দা, কফি, কফি কুচি, গ্রীণ চা, চিনির মিষ্টান্ন (সাদা চকোলেট), ফিনিস্ড চকলেট (ব্লক, স্লাব বা বার আকারে), রি-মেল্টেড লেড,কাশ্মিরী ছাগল বা অন্য প্রাণীর সরু লোম দ্বারা তৈরী সামগ্রী, হাইড্রোলিক ব্রেক, বিটুমিন খনিজ থেকে প্রাপ্ত পেট্রোলিয়াম তেল, প্রক্সিমিটি কার্ড এবং ট্যাগ, চুল বাঁধার কাঁটা, চুল অপসারণ যন্ত্রপাতি, অ্যালুমিনিয়াম তারের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবও করা হয়েছে বাজেটে।