অর্থনৈতিক প্রতিবেদক::

রিজার্ভ চুরির ৩৬ মাস পর অবশেষে মামলা করল বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সময় ভোর ৭টায় যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে এ মামলা দায়ের করা হয়। কিন্তু রিজার্ভ থেকে ৮০০ কোটি টাকা চুরির ৩৬ মাস পার হলেও আজও কিছু প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। অথচ অর্থ উদ্ধার ও তদন্তের নামে ব্যয় হয়েছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। ঘণ্টায় প্রায় ৪০০ ডলার ব্যয়ে ১ হাজার ৪০০ ঘণ্টা তদন্ত করেছে ফায়ার আই নামক একটি সফটওয়্যার কোম্পানি। রাকেশ আস্তান নামের একজন ভারতীয় নাগরিক এ তদন্তে নেতৃত্ব দেন। কিন্তু এ ব্যয়বহুল তদন্তের ফলাফল কি তা জানে না দেশের জনগণ।

জানা গেছে, সুরক্ষিত সুইফট সিস্টেমের সাথে আরটিজিএস নামের একটি সফটওয়্যার সংযোগে বাংলাদেশ ব্যাংকের কেউ কেউ অতিউৎসাহী ছিলেন। আরটিজিএস সংযোগের পরেই রিজার্ভ চুরি হয়। কারা অতিউৎসাহী ছিলেন তা আজ পর্যন্ত জানা যায়নি। আবার ফিলিপাইনের দৈনিক পত্রিকা ইনকোয়েরার’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরি হয়। চুরি হওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংকিং করপোরেশনের জুপিটার শাখায় ছিল ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। সেখান থেকে অর্থের বড় অংশ চলে যায় দেশটির ক্যাসিনোতে (জুয়ার আসরে)।

আবার ক্যাসিনোতেও সেই অর্থ ছিল ২৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অর্থাৎ আরো ২০ দিন। প্রশ্ন উঠেছে, সরকারকে সময়মতো অবহিত করলে চুরি হওয়া অর্থ ফেরত আনা সম্ভব ছিল কি না। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তাদের মতে এ অর্থের বেশির ভাগই ফেরত আনা সম্ভব ছিল। কিন্তু কেন সরকারকে জানানো হলো না, কারা বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নরকে ঘটনাটি না জানাতে পরামর্শ দিয়েছিল তা জানা যায়নি। এদিকে ঘটনা জানার পর পরই তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমান চুরি যাওয়া অর্থ ফেরত আনতে বাংলাদেশ ব্যাংকের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলকে ফিলিপাইনে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু ওই প্রতিনিধিদল কোনো সরকারি আদেশ (জিও) ছাড়া কিভাবে বিদেশ ভ্রমণ করেন এবং সেখান থেকে আসার পর এ সংক্রান্ত কোনো অগ্রগতি প্রতিবেদন কেন দেয়নি এ প্রশ্নের উত্তর আজও পায়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এমনকি এ প্রশ্নের সন্তোষজনক কোনো উত্তর পায়নি রিজার্ভ চুরির ওপর তদন্তে নিয়োজিত সিআইডি কর্মকর্তারাও। সংশ্লিষ্ট এক সূত্র জানিয়েছে, সিআইডি কর্মকর্তারা এ বিষয়ে ড. আতিউর রহমানকে প্রশ্ন করেছিলেন। তবে তিনি সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি বলে এক সূত্র জানিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সূত্র জানিয়েছে, চুরি সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংক অবহিত হয়েছে ৮ ফেব্রুয়ারি। অর্থাৎ ঘটনা অবহিত হওয়ার পরও অর্থ ফিলিপাইনের ব্যাংকিং সিস্টেমে ছিল দুই দিন (৮ ও ৯ ফেব্রুয়ারি)। এর পর এক টানা বিশ দিন ফিলিপাইনের জুয়ার আসরে এই অর্থ ঘোরাফেরা করে। সরকারকে যথাসময় জানানো হলে অর্থ উদ্ধার কিভাবে সম্ভব হতো, এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, যখন চুরি যাওয়া অর্থ ব্যাংকে ছিল তখন সরকারকে জানালে এবং সাথে সাথে পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সরকার চাপ প্রয়োগ করলে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ বা টাকা উত্তোলন বন্ধ করা যেতো। এরপর জুয়ার আসরে যাওয়ার পরেও সরকারকে অবহিত করা হলেও টাকা উদ্ধার করা সম্ভব ছিল। যেমন, সরকার টু সরকার পর্যায়ে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা গ্রহণ করা যেতো। প্রয়োজনে তাৎক্ষণিকভাবে টাকা উদ্ধারের জন্য ইন্টারপোলের সহযোগিতা নেয়া যেত।

কিন্তু এতগুলো সম্ভাবনা থাকার পরও কেন বাংলাদেশ ব্যাংক সময়মতো সরকারকে অর্থ উদ্ধারে অবহিত করল না- এ দায় নিয়ে চাপের মুখে তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমানকে পদত্যাগ করতে হয়। আরো দুই ডেপুটি গভর্নর আবুল কাসেম ও নাজনীন সুলতানাকে অপসারণ করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেয়া পদত্যাগপত্রে ড. আতিউর রহমান লিখেছেন, ‘চুরি হওয়ার ঘটনা পরবর্তী কার্য দিবসেই বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) কাছে অবহিত করি এবং অর্থ পুনরুদ্ধার, জড়িত পক্ষগুলো শনাক্ত করার এবং অভ্যন্তরীণ সুরক্ষা ব্যবস্থাগুলোর দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করার বিষয়গুলোর দিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিই।’

তার পদত্যাগপত্রের ভাষা দেখে বোঝা যায়, তিনি বিষয়টি অবহিত হওয়ার পর পরই বিএফআইইউকে অবহিত করেছিলেন। কিন্তু বিএফআইইউ কেন সরকারকে অবহিত করল না এটাই এখন বড় রহস্য।

প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে রিজার্ভ চুরির ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে মার্চের শুরুতে। ১৫ মার্চ এ ঘটনায় রাজধানীর মতিঝিল থানায় মুদ্রা পাচার প্রতিরোধ ও তথ্যপ্রযুক্তি আইনে মামলা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। আদালতের নির্দেশে ওই মামলার তদন্ত ভার পেয়ে দুটি অংশে বিভক্ত হয়ে কাজ শুরু করে সিআইডি। একটি অংশ রিজার্ভ চুরির সঙ্গে জড়িত দেশীয় সূত্রগুলো নিয়ে তদন্ত করতে থাকে। আরেকটি অংশ রিজার্ভ চুরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিদেশী সূত্রগুলো নিয়ে কাজ করে। চুরি যাওয়া অর্থের মধ্যে শ্রীলঙ্কায় প্রবেশ করা ২ কোটি ডলার আগেই ফেরত পায় বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে ফিলিপাইনে যাওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ ডলারের বড় অংশই এখনো ফেরত পাওয়া যায়নি। এ অর্থ থেকে এখন পর্যন্ত ফেরত পাওয়া গেছে মাত্র দেড় কোটি ডলার। এ অর্থ ফেরত পেতেই তিন বছর পর মামলা করা হয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে।