নিজস্ব প্রতিবেদক::

বিএনপির একলা চলো নীতিতে হতাশ ২০ দলীয় জোটের শরিক দলগুলো। কোনো কর্মসূচিতেই জোটকে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ তাদের। ঐক্যের পরিবর্তে জোটটির শরিকদের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি হয়েছে, যা দিন দিন প্রকাশ্য রূপ নিচ্ছে। জোটের বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন না শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতারা। এমনকি ঘোষিত কর্মসূচিতেও তাদের দেখা যাচ্ছে না।

অন্যদিকে জোটের শরিক দলগুলোর কর্মকাণ্ডেও সন্তুষ্ট হতে পারছে না বিএনপি। প্রকাশ্যে কিছু না বলতে পারলেও আকারে-ইঙ্গিতে এ মনোভাব তাদের জানিয়ে দিচ্ছেন বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। পাল্টাপাল্টি এসব ক্ষোভ, হতাশা আর অভিযোগে পুরো জোটের কার্যক্রমে স্থবিরতা চলছে।

একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর ২০ দলীয় জোটের কার্যক্রম আরও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এখন কদাচিৎ জোটের বৈঠক আহ্বান করা হয়। সেখানে রাজনৈতিক কিংবা জোটের সাংগঠনিক আলোচনার পরিবর্তে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া হয়। কোনো কর্মসূচি নেই শরিক দলগুলোরও। মাঝেমধ্যে জোটনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে ছোট দলগুলো সভা-সমাবেশের আয়োজন করে। সেখানেও অনুপস্থিত থাকছেন জোটের শীর্ষ নেতারা। এভাবে চলতে থাকলে যেকোনো সময়ে জোট থেকে বেরিয়ে যেতে পারে দলগুলো। এর আগে একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর টানাপোড়েনকে কেন্দ্র করে জোট ছাড়েন বিজেপির ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ। তাকে জোটে ফিরিয়ে আনতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ এখনও দেখা যাচ্ছে না।

অন্যদিকে জোটের অভ্যন্তরীণ নিষ্ফ্ক্রিয়তার পাশাপাশি অস্থিরতা শুরু হয়েছে শরিক দলগুলোর মধ্যে। বেশ কয়েকটি দলে ভাঙন দেখা দিয়েছে। লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় মুক্তিমঞ্চকে কেন্দ্র করে চরম বিশৃঙ্খলা চলছে জোটে। জোটের মধ্যে আলাদা প্ল্যাটফর্মকে ভালোভাবে নেয়নি বিএনপি। প্রকাশ্যে কিছু না বললেও জোট শরিকদের এ প্ল্যাটফর্ম থেকে কৌশলে দূরে রাখার চেষ্টা করা হয়। তবে জামায়াতে ইসলামীসহ বিএনপির শীর্ষ নেতাদের ওপর ক্ষুব্ধ জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপা, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টিসহ বেশ কয়েকটি ক্ষুদ্র রাজনৈতিক দল মুক্তিমঞ্চের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ শুরু করে। এসব দলের বিএনপিপন্থি কট্টর নেতাদের বিরোধিতায় শুরু হয় শরিক দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল। ফলে ভেঙে যায় জাগপা। দলটির সাধারণ সম্পাদককে বহিস্কার করা হয়। কল্যাণ পার্টির মহাসচিব পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। এলডিপির মধ্যেও শুরু হয়েছে ভাঙনের খেলা। একাদশ সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন না পাওয়ার ক্ষোভে তিনজন সাবেক এমপি পদত্যাগ করেছেন। মুক্তিমঞ্চকে মানতে না পারায় কমিটি পুনর্গঠনে বাদ দেওয়া হয় এলডিপি গঠনের পুরোধা ও দলের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিমকে। দলছুট এসব নেতা গতকাল সোমবার সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে পৃথক এলডিপি গঠন করেছেন। একইসঙ্গে বিএনপির পক্ষ থেকে তাদের দলে ফেরানোর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হলে তারা স্বাগত জানাবেন বলে জানিয়েছেন সেলিম।

জোটে টানপোড়েনের মধ্যেই গত মাসে বৈঠক আহ্বান করে বিএনপি। ওই বৈঠকে এলডিপিসহ মুক্তিমঞ্চের সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্যান্য দলের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত হননি। এ নিয়ে বিএনপির শীর্ষ নেতারা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। বৈঠকে বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদে এবং জোটনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মধ্যে আলোচনা সভা এবং জেলা ও মহানগর পর্যায়ে বিএনপির সমাবেশে জোটের অংশগ্রহণের কথা থাকলেও সেখানে জোটের শরিক দলগুলোর অনীহা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বেশিরভাগ শরিক দলই এসব কর্মসূচিকে কৌশলে এড়িয়ে গেছে। জোটের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, ভারতের সঙ্গে করা চুক্তির প্রতিবাদে বিএনপি ঘোষিত কর্মসূচিতে অংশ নেবে শরিকরা। কিন্তু নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সমাবেশে জোটের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের দেখা যায়নি। এ নিয়ে অনেকে আরও হতাশ হন।

বিষয়টি মানতে নারাজ জোটের সমন্বয়ক ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, ২০ দলীয় জোট সক্রিয় রয়েছে। তারা প্রতিনিয়ত কর্মসূচি পালন করছে। জরুরি ইস্যুতে তাদের মধ্যে বৈঠক হয়। শরিক দলগুলোর মধ্যে ভাঙাগড়ার খেলার বিষয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।

ন্যাশনাল পিপলস পার্টি-এনপিপি চেয়ারম্যান ড. ফরহাদুজ্জামান ফরহাদ বলেন, জোটের রাজনীতিতে চাওয়া-পাওয়া নিয়ে সমস্যা হতেই পারে। এটাই রাজনীতির সৌন্দর্য। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মহাজোটেও নানা দ্বন্দ্ব চলছে। তবে ২০ দলীয় জোট থেকে কেউ বের হয়ে যাবে না। তারা সবাই ঐক্যবদ্ধ আছেন। জোটনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য তারা আন্দোলনে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

অবশ্য জোটের অন্য শরিক নেতারা বলছেন, ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের আগে বিএনপি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে সেটাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে আসছে। যেটা এখনও চলমান রয়েছে। ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের নিয়মিত বৈঠক বা কর্মসূচি দেওয়া হলেও ২০ দলীয় জোটের বৈঠক আহ্বান করা হয় না। ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে বৈঠকে নেওয়া কর্মসূচির সঙ্গে জোটের সম্মতি আদায় করার জন্যই মাঝেমধ্যে বৈঠক ডাকে বিএনপি। সে বৈঠকে রাজনীতি নিয়ে, কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হয় না। বৈঠকে বিভিন্ন কর্মসূচি সামনে এনে তার প্রতি সমর্থন আদায়ের জন্যই যেন তাদের ডাকা হয়। এতে জোটের শীর্ষ নেতারা মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে বৈঠক সংস্কৃতি এড়িয়ে চলছেন।

তাদের অভিযোগ- জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী যেসব রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, সেসব থেকে বিএনপি সরে আসে। কিন্তু জোটের সঙ্গে কোনো আলোচনাই তারা করেননি। শরিক দলগুলোকে মূল্যায়ন না করায় ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে। আর বিএনপির প্রতি অন্ধ বিশ্বাসের কারণে নিজ দলগুলোর মধ্যে আশান্তি শুরু হয়েছে; ভেঙে যাচ্ছে দলগুলো।

অন্যদিকে বিএনপি নেতারা বলছেন, সভা-সেমিনারের মতো জায়গায় শরিকরা বিএনপির নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানালেও রাজপথে তাদের দেখা যায় না। বিএনপির তৃণমূলে ভুল বার্তা দেওয়ার জন্য তারা বিভিন্ন সময়ে নেতিবাচক বক্তব্য দিয়ে আসছেন। জোটের শরিকদের সম্মান রক্ষায় বিএনপি সবসময় সচেষ্ট থাকলেও তারা সেটা বিবেচনায় নেন না। শরিক বেশ কয়েকটি দলের রাজনীতিই যেন বিএনপিকে সমালোচনা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এরপরও বিএনপি সবকিছু ভুলে একসঙ্গে পথ চলতে চায়। দেশের গণতন্ত্র আর জোটনেত্রীকে মুক্ত করতে একসঙ্গে রাজপথে থাকতে চান তারা।