ই-কণ্ঠ অনলাইন ডেস্ক::

ঘুষ গ্রহণের মামলায় বিএনপি দলীয় সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদাকে চার বছর কারাদণ্ডাদেশ দিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়েছে।

রোববার সুপ্রিমকোর্টের ওয়েবসাইটে ৬৭ পৃষ্ঠার রায়টি প্রকাশ পায়। রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছেন, সরকারের উচ্চ পর্যায়ে থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুর্নীতি করা হলে তা জাতীয় স্বার্থ, অর্থনীতি ও দেশের ভাবমূর্তির জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে।

ঘুষ গ্রহণের মামলায় দণ্ডিত ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা আওয়ামী লীগের মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করলেও আসন্ন সংসদ নির্বাচনে তার অংশগ্রহণের কোনো সুযোগ নেই। আইন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী একজন সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেন না। দুর্নীতির মামলায় হাইকোর্ট থেকে চার বছরের সাজাপ্রাপ্ত নাজমুল হুদা।

সংবিধানের ৬৬ (২) (ঘ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তিনি (নাজমুল হুদা) জাতীয় নির্বাচনে অযোগ্য। সেখানে বলা আছে, ‘নৈতিক স্থলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হইয়া অনুণ্য দুই বৎসরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হইলে এবং মুক্তিলাভের পর পাঁচ বৎসরকাল অতিবাহিত না হইয়া থাকলে তিনি নির্বাচনে অযোগ্য বিবেচিত হবেন।’

জানা যায়, ঢাকা-১৭ আসন থেকে নির্বাচন করার জন্য গত ৯ নভেম্বর আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা। ওইদিন বিকালে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ধানমণ্ডির রাজনৈতিক কার্যালয় থেকে নাজমুল হুদার একজন প্রতিনিধি মনোনয়ন ফরমটি সংগ্রহ করেন।

২ কোটি ৪০ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহনের মামলায় ২০০৭ সালের ২৭ আগষ্ট ব্যারিস্টার নাজমুল হুদাকে সাত বছর ও তার স্ত্রী অ্যাডভোকেট সিগমা হুদাকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেন বিচারিক আদালত। এ রায়ের বিরুদ্ধে তারা হাইকোর্টে আপিল করেন। শুনানি শেষে ২০১১ সালের ২০ মার্চ হাইকোর্ট তাদের খালাস দেন।

ওই রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও রাষ্ট্রপক্ষ। সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ ২০১৪ সালের ১ ডিসেম্বর হাইকোর্টের রায় বাতিল করে পুনরায় বিচার করার নির্দেশ দেন। পুন:শুনানি শেষে গত বছরের ৮ নভেম্বর বিচারপতি ভবানী প্রসাদ সিংহ ও বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ নাজমুল হুদার সাত বছর সাজা থেকে কমিয়ে চার বছর এবং তিন বছর কারাদণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে সিগমা হুদা যতটুকু সময় সিগমা হুদা কারাগারে ছিলেন, তা সাজাভোগ হিসেবে গণ্য হবে বলে রায়ে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে নাজমুল হুদাকে ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও এক বছরের কারাদণ্ডের আদেশ বহাল রাখেন হাইকোর্ট।

রায়ের কপি পাওয়ার ৪৫ দিনের মধ্যে নাজমুল হুদাকে বিচারিক আদালত আত্মসমর্পণ করতে নির্দেশ দেন। কিন্তু নাজমুল হুদা আপিল বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে রিট করেন। রিটটি গত বছরের ১০ ডিসেম্বর খারিজ করে দেন হাইকোর্ট। এরপর তিনি আত্মসমর্পণ ছাড়াই আপিল করার অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন। এ বছরের ৭ জানুয়ারি সেই আবেদনও খারিজ করে দেন আপিল বিভাগ। ফলে এ মামলায় নিম্ন আদালতে নাজমুল হুদাকে আত্মসমর্পণ করতেই হচ্ছে।

হাইকোর্টের দেয়া রায়ে বলা হয়, দুর্নীতি একটি অভিশাপ। সমাজের সবক্ষেত্রে দুর্নীতি দেখা যায়। দুর্নীতির সমাজের নৈতিক অবস্থান নষ্ট করে এবং সরকারি কর্মচারীর দুর্নীতি কেবল নৈতিক অবস্থানই নষ্ট করে না বরং এটি জাতীয় অর্থনীতি ও জাতীয় স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর। সরকারের উচ্চপর্যায়ে থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুর্নীতি করা হলে তা জাতীয় স্বার্থ, অর্থনীতি ও দেশের ভাবমূর্তির জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে।

রায়ে আদালত বলেন, আপিলের কোনো সারবত্তা পাওয়া যায়নি। আপিল খারিজ করা হলো। বাকি সাজা ভোগ করতে বিচারিক আদালতের রায়ের কপি গ্রহণের ৪৫ দিনের মধ্যে আপিলকারী (নাজমুল হুদা) বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন। এতে ব্যর্থ হলে বিচারিক আদালত তাঁর গ্রেফতার নিশ্চিত করতে যথাযথ পদক্ষেপ নেবে।

ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার বিরুদ্ধে ২০০৭-০৮ সালে (তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়) তিনটি মামলা হয়। একটি জ্ঞাত-আয়বহির্ভূত অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে। দ্বিতীয়টি এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রতি মাসে ২৫ হাজার টাকা হিসাবে ৬ লাখ টাকা অবৈধভাবে নেয়ার অভিযোগে। তৃতীয়টি আকতার হোসেন লিমিটেড নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর জাহির হোসেনের কাছ থেকে ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা ঘুষ নেয়ার অভিযোগে ২০০৭ সালের ২১ মার্চ ধানমন্ডি থানায় মামলায়। প্রথম মামলাটিতে নাজমুল হুদাকে ১২ বছর সাজা দেন নিম্ন আদালত। আপিলে হাইকোর্ট প্রথম মামলাটি খারিজ করে তাকে শাস্তি থেকে অব্যাহতি দেন। দ্বিতীয় মামলাটির বিচার কার্যক্রম আদালতের আদেশে স্থগিত আছে।

ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা বিভিন্ন মেয়াদে খাদ্য, তথ্য এবং যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিএনপির সঙ্গে টানাপোড়েন শুরু হলে তাকে বহিষ্কার করা হয়। বহিষ্কার আদেশের পরও বিএনপির পরিচয়েই রাজনীতিতে থাকার চেষ্টা করেন। অবশেষে ২০১২ সালে তিনি বিএনপি থেকে পদত্যাগ করেন।

এরপর বাংলাদেশ ন্যাশনালিষ্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ), বাংলাদেশ ন্যাশনালিষ্ট অ্যালায়েন্স (বিএনএ), বাংলাদেশ মানবাধিকার পার্টি (বিএমপি) এবং সর্বশেষ ‘তৃণমূল বিএনপি’ গঠন করেন। সম্প্রতি এ দলটিকে নিবন্ধন দিতে নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।