বিশেষ প্রতিনিধিঃ ডলারের তুলনায় টাকার দাম কমে যাওয়াসহ বিভিন্ন ইস্যুতে টানা সাতমাস নেতিবাচক ধারায় রয়েছে দেশের তৈরি পোশাক খাত। এর সঙ্গে নতুন করে যোগ হয়েছে চীনের করোনাভাইরাস। এতে বড় ধরনের বিপদে পড়েছে তৈরি পোশাক খাত। শুধু তাই নয়, এর প্রভাবে পার্শ্ববর্তী দেশ থাইল্যান্ড এবং সিঙ্গাপুরের সঙ্গে আমদানি-রফতানি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

বছরের শুরুতেই চীনে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়া দেশটির সঙ্গে আমদানি-রফতানি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে আটকে রয়েছে হাজার হাজার সেল-বাই অর্ডার। স্থবির হয়ে আছে পোশাক কারখানার কার্যক্রম।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) নেতারা বলছেন, তৈরি পোশাকের অর্ডার চলে যাচ্ছে ভিয়েতনাম, ভারত এবং শ্রীলঙ্কায়। এতে বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য।

গার্মেন্টস মালিকরা বলছেন,মরণব্যাধি করোনাভাইরাসের কারণে দেশের কাঁচামাল আসছে না। ক্লায়েন্টের পণ্য দিতে পারছে না। বসে বসে শ্রমিকদের বেতন দিতে হচ্ছে। কবে এই অবস্থার উন্নতি হবে তারও কোনো আভাস পাওয়া যাচ্ছে না। এখন গার্মেন্টস কারখানাগুলো টিকে রাখাই দায়। এছাড়া আমদানির অভাবে স্থানীয় বাজারে পণ্যের মূল্যও বেড়ে যাবে। তাই এখনই আমদানি-রফতানির জন্য বিকল্প রাষ্ট্র খুঁজতে হবে। একই সঙ্গে এর প্রভাব মোকাবিলায় সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে।

সার্বিক বিষয়ে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন-এফবিসিসিআইয়ের সহসভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘এমনিতেই আমাদের ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না। নতুন করে করোনাভাইরাসের ফলে আমাদের কাঁচামাল আনা বন্ধ রয়েছে। ফলে মালের অভাবে প্রোডাক্ট তৈরি করতে পারছি না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, গত অর্থবছর (২০১৮-১৯) চীন থেকে ১৪দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার পরিমাণ কাঁচামাল আমদানি করেছে। এর মধ্যে তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামালই ১৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ। যা সারাবিশ্ব থেকে কাঁচামাল আমদানির ২৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ। শুধু তাই নয় একই সময় চীনে ৮৩২ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ পণ্য রফতানি করছে। যার বেশির ভাগই চামড়া পণ্য। ফলে এবছর দুটি সেক্টরে আমদানি-রফতানিতে বড় ধাক্কা খাবে। যা দেশের অর্থনীতির জন্য দুঃসংবাদ।

বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিসিসিআই) তথ্য মতে, এই দুই সেক্টর ছাড়াও সবমিলে চীনের সঙ্গে ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাণিজ্য রয়েছে। এই ঝুঁকিতে পড়েছে স্থানীয় মুদ্রায় যা প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৮৫ টাকা হিসাবে)।

২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশ-চীন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ইউএস ডলার। ২০২১ সাল নাগাদ এটি ১৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে। এই সম্ভাবনায় করোনাভাইরাস পরিস্থিতি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের হিসাবে বিদায়ী অর্থবছরে চীন থেকে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী, মূলধনী যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল, বিভিন্ন খেলনা এবং খাদ্যসামগ্রী। বর্তমানে সব ধরনের আমদানি-রফতানি বন্ধ রয়েছে।

অনেক দেশ চীনের আকাশপথে বিমান চলাচলও বন্ধ করে দিয়েছে। বাংলাদেশও চীনের নাগরিকদের আগমনী ভিসা বন্ধ করেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সমস্যা দীর্ঘায়িত হলে এর নেতিবাচক প্রভাব কাটিয়ে ওঠা কঠিন।

এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘করোনাভাইরাসের কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা এসেছে। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’

তিনি আরও বলেন, ‘চীন থেকে আমরা বিশাল অঙ্কের পণ্য আমদানি করি। এর উল্লেখযোগ্য অংশ শিল্পকারখানায় ব্যবহার হয়। পাশাপাশি দেশটিতে রফতানিও রয়েছে। ভাইরাসের কারণে সব খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’