জিন্নাতুল ইসলাম জিন্না, লালমনিরহাট প্রতিনিধিঃঃ
এক সময়ের তামাকের রাজধানী বলে খ্যাত লালমনিরহাটে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে ভুট্টার চাষাবাদ। বিশেষ করে পাটগ্রাম ও হাতীবান্ধা এই দুই উপজেলায় ভুট্টা চাষ বেড়েছে বহুগুণে। ব্যাপক ফলনের কারণে এ জেলার ব্র্যান্ডিং পণ্য হিসেবে স্থান পেয়েছে ভুট্টা।
দিন দিন ভূট্টা চাষ বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলায় একেবারে কমে গেছে বিষবৃক্ষ হিসেবে পরিচিত তামাকের চাষ। কৃষি বিভাগের ভুট্টা চাষে উৎসাহ প্রদান ও চাষিদের উপলব্ধিই তামাক চাষে অনীহার মুল কারণ। তামাক কোম্পানির লোভনীয় প্রস্তাবও চলতি বছর কৃষকদের তামাক চাষে উৎসাহিত করতে পারেনি। অথচ এক সময় এই জেলায় আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছিলো তামাকের চাষ।
লালমনিরহাটের কৃষকরা জানান, বৃহত্তম রংপুর অঞ্চলের মধ্যে পাটগ্রাম ও হাতীবান্ধা উপজেলায় এক সময় জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বিপুল পরিমান চাষ হতো তামাক। তামাকের ব্যাপকতার কারণে এসব এলাকায় গড়ে উঠেছিল বড় বড় তামাক ক্রয় কেন্দ্র। এ দুই উপজেলার তামাক দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হতো। এমনকি কিছু তামাক কোম্পানীরা বিদেশেও পাঠাতেন বিপুল পরিমান তামাক।
৯/১০ বছর আগেও তামাকের রাজধানী হিসেবে পরিচিত ছিল পাটগ্রাম উপজেলা। একটানা তামাক চাষের কারণে উৎপাদন কমে আসায় আস্তে আস্তে কৃষকরা নিরুৎসাহিত হয়ে তামাক ছেড়ে ভুট্টা চাষে ঝুঁকে পড়ে। মানুষ, গবাদিপশু, পাখির খাদ্য এবং জ্বালানি হিসেবে প্রতিনিয়ত ভুট্টার চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় কম খরচে অধিক মুনাফার আশায় এ অঞ্চলে বাড়ছে ভুট্টার চাষাবাদ। চাষাবাদ বেড়ে যাওয়ায় ভুট্টার বড় বড় বাজার তৈরি হয়েছে এখন পাটগ্রাম ও হাতীবান্ধা উপজেলায়। গড়ে উঠেছে বড় বড় গোডাউন ও ভুট্টা ক্রয় কেন্দ্র। মাটির গুণগত মান ভালো হওয়ায় এখানে উৎপাদিত ভুট্টাও বেশ ভালো মানের। তাই ভুট্টা ব্যবসায়ীরা ছুটছেন এ অঞ্চলে। দেশের যেসব কারখানায় ভুট্টাজাত পণ্য তৈরি হয় তারা এখান থেকে ভুট্টা কিনে সেসব কারখানায় সরবরাহ করছেন।
পাটগ্রাম উপজেলার শ্রীরামপুর ইউনিয়নের বুড়িরবাড়ি গ্রামের তামাক চাষি গফুর আলী ও রহিদুল ইসলাম ডেইলী বাংলাদেশকে বলেন, বিগত ১০ বছর আগে পুরো এলাকায় ছিল শুধু তামাক আর তামাক। এই এলাকা ছিল তামাকের রাজধানী। উৎপাদন কমে যাওয়ায় এখানে আগের মতো আর তামাক চাষ হয় না। কৃষক হিসেবে সবই অল্প অল্প করে কিছু চাষ করতে হয়, তাই এবারেও কিছু তামাক চাষ করেছি। তবে ভুট্টার চাষ করেছি অনেক বেশি।
হাতীবান্ধার উপজেলার পারুলীয়া গ্রামের চাষি আনোয়ার হোসেন ডেইলী বাংলাদেশকে বলেন, আগে সব জমিতে তামাক চাষ করতাম। এখন আমার আর কোনো তামাক আবাদ নেই। ছয় বিঘা জমির সবটাই ভুট্টা চাষ করেছি। ভুট্টার পাতা, ছাল-বাকল সব কিছুই বিক্রি করা যায়। চাহিদা বেশি থাকায় এবং কম খরচে অধিক মুনাফার জন্য ভুট্টার বিকল্প নেই। ভুট্টাজাত পণ্য তৈরির কারখানা এ অঞ্চলে গড়ে উঠলে চাষিরা আরো বেশি লাভবান হবে বলেও তিনি জানান। তাতে আর্থ সামাজিক অবস্থার আমুল পরিবর্তনের পাশাপাশি ক্ষতিকর তামাক চাষ একেবারে বন্ধ হয়ে যাবে।
হাতীবান্ধার সিংগিমারী এলাকার এক সময়ের তামাক চাষি আজিজার রহমান ডেইলী বাংলাদেশকে বলেন, শ্রমিকসহ উৎপাদন খরচ বাদে ভুট্টায় বিঘা প্রতি লাভ আসে ৭/৮ হাজার টাকা। গত বছর ৬ বিঘায় ৫০ হাজার টাকা লাভ হওয়ায় এবারও তামাক ছেড়ে ১২ বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষ করেছি। আবহাওয়া অনুকুলে ও বাজার ভালো থাকলে লক্ষাধিক টাকা মুনাফা হবে আশা করি।
নগদ অর্থ ও অধিক মুনাফার মোহে আচ্ছন্ন হয়ে তামাকজাত দ্রব্য মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর জেনেও এইজেলায় এক সময় কৃষকরা তামাক উৎপাদন করতেন। পরবর্তীতে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূট্টা চাষে উৎসাহ প্রদান ও কৃষকদের সাথে প্রতিনিয়ত সম্পর্ক জোরদার এবং তামাকের ক্ষতিকর দিক কৃষকদের বোঝাতে সক্ষম হওয়ায় তামাক চাষিরা এখন ভূট্টা আবাদ করছেন।
তামাক কোম্পানিগুলোর বিভিন্ন ধরনের লোভনীয় প্রস্তাব তিস্তা চরের সিরাজুল হককে তামাক চাষে আকৃষ্ট করলেও তিনি আর কখনও তামাক চাষ করেন নি। ভূট্টা চাষে অধিক মুনাফা ও তামাকের ক্ষতিকর দিকের কথা বিবেচনা করে আগামীতে আর তামাক চাষ করবেন না এবং অন্যকেও তামাক আবাদ না করে ভূট্টা চাষ করার জন্য অনুরোধ করবেন তিনি।
লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, চলতি রবি মৌসুমে জেলায় ভুট্টা চাষের লক্ষমাত্রা ২৮ হাজার ৫২০ হেক্টর নির্ধারণ করা হয়েছে। আর চাষ হয়েছে ২৬ হাজার ৬০৫ হেক্টর জমিতে। এবার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে দুই লাখ ৪৯ হাজার ৫৫০ মেট্রিক টন। গত বছর দুই মৌসুমে এ জেলায় দুই লাখ ৮১ হাজার ৮৯৮ মেট্রিক টন ভুট্টা উৎপাদিত হয়। তামাক চাষ প্রতি বছর এক হাজার হেক্টর করে কমে এ বছর চাষ হয়েছে আট হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে। এ বছর তামাক ও ভুট্টা চাষের তুলনা করলে দেখা যায়, জেলার সদর উপজেলায় ভুট্টা ১১৭৫ হেক্টর, তামাক ৫৫০ হেক্টর, আদাতমারীতে ভুট্টা ৩১০ হেক্টর, তামাক ২২৭৫ হেক্টর, কালীগঞ্জে ভুট্টা ৩০৫০ ও তামাক ৮৭০ হেক্টর, হাতীবান্ধায় ভুট্টা ১০ হাজার ২০ হেক্টর ও তামাক ৪৬০ হেক্টর এবং পাটগ্রাম উপজেলায় ভুট্টা চাষ হয়েছে ১২ হাজার ৫০ হেক্টর ও তামাক চাষ হয়েছে ৩৮৯৫ হেক্টর জমিতে।
লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ পরিচালক বিধু ভূষণ রায় ডেইলী বাংলাদেশকে জানান, তামাকের ক্ষতিকর দিক কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া গেলে অদূর ভবিষ্যতে এ জেলায় এক হেক্টর জমিতেও তামাক চাষ হবে না, সবাই ভূট্টা চাষ করবেন। কৃষক যে ফসলে কম খরচে বেশি মুনাফা পায়, সে ফলনের দিকেই ঝুঁকে পড়ে এ এলাকার কৃষকরা। ব্র্যান্ডিং পণ্য হিসেবে ভুট্টা চাষাবাদ বাড়াতে মাঠে কাজ করছে কৃষি বিভাগের লোকজন। ফলে বাড়ছে ভুট্টার চাষাবাদ। এ জেলায় ভুট্টাজাত পণ্য তৈরির শিল্প কারখানা গড়ে তোলা প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।