ঝিনাইদহ প্রতিনিধি:
সময়মত কৃষকদের আখের মূল্য পরিশোধ করতে না পারা ও দীর্ঘ মেয়াদি ফসল চাষে প্রান্তিক চাষীদের আগ্রহ হারিয়ে ফেলাসহ বহুবিধ কারনে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে অবস্থিত দক্ষিণনাঞ্চলের অন্যতম ভারী চিনি শিল্প প্রতিষ্ঠান মোবারকগঞ্জ সুগারমিলের আওতাধীন ৬ টি সাবজোনে দিন দিন আখ চাষ কমে যাচ্ছে। সুগার মিলের বিগত কয়েক বছরের চিত্রে এ তথ্য উঠে এসেছে। ২০১৭-১৮ মৌসুমে চাষীদের ৫ কোটি সাড়ে ৬৭ লাখ টাকার ঋণ প্রদান ও আখের মূল্য বৃদ্ধি করার পরও আখ রোপনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হয়নি। ফলে আসন্ন আখ মাড়াই মৌসুমে সুগারমিলটিকে কোটি কোটি টাকার লোকসান গুনতে হবে মিলের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা ধারণা করছেন।

মিল সূত্রে জানাগেছে, ২০১০-১১ মৌসুমে ১২ হাজার একর জমিতে আখ রোপনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। সেখানে অর্জন হয় ৭ হাজার ৪শ ৫৪ একর। ২০১১-১২ মৌসুমে ১২ হাজার একর জমিতে আখ রোপনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। সেখান অর্জন হয় ৭ হাজার ৮ একর। ২০১২-১৩ মৌসুমে ১১ হাজার একর জমিতে আখ রোপনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। সেখানে অর্জন হয় ৮ হাজার ৫শ একর। ২০১৩-১৪ মৌসুমে ১১ হাজার একর জমিতে আখ রোপনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। সেখান অর্জন হয় ৩ হাজার ৩শ ২৬ একর। ২০১৪-১৫ মৌসুমে মিলটি ১০ হাজার একর জমিতে আখ রোপনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। সেখানে অর্জন হয়েছে ৪ হাজার ৮শ ৮৩ একর। ২০১৫-২০১৬ মৌসুমে ১০ হাজার ৫০০ একর জমিতে আখ রোপনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধান করা হয়। সেখানে অর্জন হয় ৪ হাজার ৯৪১ একর। ২০১৬-১৭ মৌসুমে আখ রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করা হয় ৯ হাজার একর। সেখানে অর্জিত হয়েছে ৬ হাজার ৮০ একর। সর্বশেষ ২০১৭-১৮ মৌসুমে আখ রোপনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ১০ হাজার ৫০০ একর। সেখানে অর্জিত হয়েছে ৫ হাজার ৭৭২ একর। গত ৮টি মাড়াই মৌসুমের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায় কোন মৌসুমেই আখ চাষের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি।

দিন দিন আখ চাষ কমে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে মোবারকগঞ্জ সুগারমিলের মহাব্যবস্থাপক (কৃষি) নঈম সিদ্দিকী বলেন, কৃষকরা মিলে যে আখ বিক্রি করছে, ঠিকমত চিনি বিক্রি না হওয়ায় সেই টাকা কৃষকদের সময়মত পরিশোধ যাচ্ছে না। তাছাড়া বর্তমানে কৃষকরা স্বল্প মেয়াদি ফসল করতে আগ্রহী হওয়ায় দীর্ঘ মেয়াদি ফসল চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এসব কারনে আখ চাষ কমে যাচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি আরো জানান, সুগারমিলটিতে আগে ৮ টি সাবজোন ছিল। বর্তমানে সেটি কমিয়ে ৬ টি ( যশোর, চৌগাছা, ঝিনাইদহ, হরিণাকু-ু, মিলগেট এ ও মিলগেট বি ) সাবজোনে বিভক্ত করা হয়েছে। প্রতিটি সাবজোনে ২ জন কর্মকর্তা রয়েছেন। এছাড়া ইউনিট পর্যায়ে রয়েছেন ১ জন সিডিএ। তারা সার্বক্ষনিকভাবে কৃষকদের সাথে ব্যক্তিগত যোগাযোগ, দলীয় সভা, উঠান বৈঠাক, পোস্টার, লিফলেট বিতরণ ও মাইকিং এর মাধ্যমে কাউন্সিলিং চালিয়ে যাচ্ছেন।

তিনি আরো বলেন, আখ চাষীদের স্বার্থ বিবেচনা করে ২০১৮-১৯ আখ মাড়াই মৌসুম থেকে মিল গেট ও আখ ক্রয় কেন্দ্রে মণ প্রতি ১৫ টাকা বেশি দরে আখ কেনা হবে। গত ২০১৭-১৮ আখ মাড়াই মৌসুমে মিল গেটে আখ কেনা হয়েছে প্রতি মণ (৪০ কেজি) ১২৫ টাকা। আর বহিঃকন্দ্রে প্রতি মণ (৪০ কেজি) ১২২ টাকা ৩৬ পয়সা দরে।
আসন্ন ২০১৮-১৯ আখ মাড়াই মৌসুমে মিল গেট এলাকায় প্রতি মণ ১৪০ টাকা দরে এবং বহিঃকেন্দ্রে প্রতি মণ ১৩৭ টাকা ৩৬ পয়সা দরে ক্রয় করা হবে। অর্থাৎ আসন্ন মৌসুম থেকে আখ চাষীরা মণ প্রতি ১৫ টাকা করে আখের দাম বেশি পাবেন।
এ ব্যাপারে মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইউসুফ আলী শিকদার বলেন, কৃষকদের আখ চাষে ফিরিয়ে আনার জন্য মণ প্রতি আখের মূল্য ১৫ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এছাড়া পূর্জি দুর্নীতি প্রতিরোধে এখন থেকে মোবাইল ফোনে তাদের আখ বিক্রির ম্যাসেজ দেওয়ার পদ্ধতি চালু হয়েছে। ওজনে চুরি প্রতিরোধে ডিজিটাল ওজন মাপার যন্ত্র কেনা হয়েছে। যাতে কৃষকরা ওজন স্বচোখে দেখতে পারে। এছাড়া তাদের পেমেন্টও মোবাইল ফোনের শিউর ক্যাশের মধ্যেমে দেয়া হবে। আখ বিক্রির টাকার নেওয়ার জন্য তাদের আর এখন থেকে মিলে আসতে হবে না। তবে ঠিকমত চিনি বিক্রি না হওয়ায় অনেক সময় তাদের আখের বিক্রির দাম পরিশোধ করতে একটু দেরি হচ্ছে। তাছাড়া কৃষকরা এখন সবজী চাষের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে।
তিনি আরো বলেন, ঝড়,বৃষ্টি বন্যায় অন্যান্য ফসলের ক্ষতি হলেও আখের তেমন কোন ক্ষতি হয় না। আখ রোপন যে লাভজনক ফসল সেটা কৃষকদের বুঝাতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। আখের মূল্যও বৃদ্ধি পেয়েছে। আশা করা যায় আগামী মৌসুম থেকে আখ রোপণের লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধি পাবে।