ই-কণ্ঠ ডেস্ক রিপোর্ট:: সম্প্রতি বাগেরহাটে উদ্ভাবিত হয় নতুন প্রজাতির ধান। কৃষক লেবুয়াতের নামে এই ধানের নাম হলেও ধানের উদ্ভাবক তারা মা ফাতেমা বেগম। তিনি চান এই ধান ‘ফাতেমা ধান’ নামেই পরিচিতি লাভ করুক…

বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার বেতাগা ইউনিয়নের চাকুলী গ্রামের কৃষক লেবুয়াত শেখের মা ফাতেমা বেগম। সম্প্রতি তিনি উদ্ভাবন করেছেন নতুন প্রজাতির এক উচ্চ ফলনশীল ধান। ধানের ফলন দেখে এলাকার কৃষকসহ কৃষি বিভাগ দারুণভাবে সন্তোষ প্রকাশ করে আশাবাদ ব্যক্ত করেন, ফাতেমা বেগম উদ্ভাবিত ‘ফাতেমা ধান’ পাল্টে দিতে পারে দেশের খাদ্য উৎপাদনের চিত্র। ইতিমধ্যে স্থানীয়রা নতুন এই জাতের ধানের নামকরণ লেবুয়াত শেখের মায়ের নাম অনুসারে ‘ফাতেমা ধান’ করেছেন।

বর্তমানে প্রতি কেজি ধান ৪শ’ টাকা দরে সংগ্রহ করছেন অনেকে। শুধু সাধারণ কৃষক নন, নতুন এই জাতের ধান নিয়ে উৎসুক বাগেরহাটের কৃষি বিভাগও। মাত্র ৩ ছড়া (ধানের শীষ) ধান দুই বছরে বেড়ে হয়েছে প্রায় ১শ’ মণ।

ফাতেমা বেগম বলেন, ‘দুই বছর আগে মাঠে ধান কাটতে থাকা কাজের লোকরা পানি চাইলে আমি পানি দিতে যাই। এ সময় ধানের ভেতর একটি বড় ধরনের ধানের বাইল (শীষ) পাই। তখন মনে করলাম, এটি আবার কী ধান? একটু সামনে গিয়েই আরও দুটি বাইল পাই। এই ধানগুলো নিয়ে বাড়ি এসে ছেলেকে দিলে সে বলল, এটা আবার কী ধান? এ দিয়ে আবার কী করতে হবে? তখন আমি বললাম, আমি রাখব এবং জমির এক কোণে ফেলে রাখব। পরে একটি কাচের বোতলে এটি সংরক্ষণ করি। পরের বছর এই ধান থেকে ৩ আঁটি ধান হয়। সেখান থেকে যে ধান হয় তা আবার পরের বছরের জন্য বীজ হিসেবে রেখে দিই। সেখান থেকে আজ এত ধান হয়েছে।’

সরেজমিন ও কৃষি বিভাগের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ ধানের গাছ, ফলন, পাতা, শীষ সবকিছু অন্য যে কোনো জাতের ধানের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। প্রতি গোছে একটি চারা রোপণ করা হয়, যা বেড়ে ৮-১২টি হয়েছে। প্রতিটি ধান গাছ ১১৫ থেকে ১৩০ সেন্টিমিটার লম্বা। একেকটি ছড়ার দৈর্ঘ্য ৩৬-৪০ সেন্টিমিটার। প্রতি ছড়ায় দানার সংখ্যা ১ হাজার থেকে ১২শ’টি। যার ওজন ৩০-৩৫ গ্রাম। ধানগাছের পাতা লম্বা ৮৮ সেন্টিমিটার, ফ্লাগলিপ (ছড়ার সঙ্গের পাতা) ৪৪ সেন্টিমিটার। ধানগাছের পাতা চওড়া দেড় ইঞ্চি। এই জাতের গাছের কাণ্ড ও পাতা দেখতে অনেকটা আখ গাছের মতো এবং অনেক বেশি শক্ত। একরপ্রতি ফলন প্রায় ১৩০ মণ। অন্য যে কোনো জাতের তুলনায় এই জাতের ধান অনেক ব্যতিক্রম।

চাকুলী গ্রামের কৃষক মোস্তাফিজুর রহমান হাফিজ জানান, এই ধান নিজে চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা অসম্ভব। প্রতিটি ধানের শীষ ১৩-১৫ ইঞ্চি লম্বা, প্রতি শীষে ১ হাজার থেকে ১২শ’টি ধান রয়েছে। যার ওজন ৩০ থেকে ৪০ গ্রাম, যা দেশের অন্য কোনো স্থানে আছে বলে কারও কাছে শুনিনি।

মাত্র ৩টি শীষ থেকে আজ ৭৫ শতক জমিতে এই ধানের চাষ করেছেন লেবুয়াত। আর এই ভিন্ন জাতের ধান দেখতে প্রতিদিনই অনেক লোক বিভিন্ন স্থান থেকে ছুটে আসছেন। এবং তারা ধান সংগ্রহের আগ্রহ প্রকাশ করছেন। তিনি সরকারিভাবে এ ধানের উদ্ভাবক কৃষক লেবুয়াতের মায়ের নামেই এ ধানের নামকরণের জন্য সবার কাছে দাবি জানান।

কৃষাণি রীনা বেগম জানান, সবার আগ্রহ এখন ‘ফাতেমা ধানে’র দিকে। এই ধান বীজ হিসেবে সংগ্রহ করতে প্রতিদিনই অনেক লোক আসছেন। তিনি নিজেও প্রতি কেজি ৪শ’ টাকা দরে ৪ কেজি ধানের বীজ কিনেছেন।

স্থানীয় উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. সোলায়মান আলী জানান, প্রথমে তারা ধানের ক্ষেতে গিয়ে ধানের নমুনা দেখে অবাক হয়ে যান। বিষয়টি তিনি তাৎক্ষণিক উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে অবহিত করেন। পরে তার পরামর্শে লেবুয়াতকে হাতেকলমে ও সার্বক্ষণিক পরামর্শ প্রদান করেন। ফকিরহাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. মোতাহার হোসেনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই বিশেষ জাতের ধানের নানা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এটি অনেক বেশি লবণ সহিষ্ণু জাত। গাছের কাণ্ড অনেক বেশি মোটা ও শক্ত, ফলে ঝড়ে হেলে পড়ার কোনো আশঙ্কা নেই। বৈরী আবহাওয়ায়ও পাতায় কোনো স্পট নেই। এই জাতের ধানের শীষ (বাইল) অনেক বেশি লম্বা এবং প্রতিটি শীষে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২শ’ দানা আছে। যা সাধারণ বিআর-২৮ জাতের ধানের থেকে প্রায় ৬ গুণ। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এটি ‘ফাইন রাইস’ প্রজাতির ধান। এই ধান ইতিমধ্যে অনেক বেশি সাড়া জাগিয়েছে।সুত্র-সমকাল