ই-কণ্ঠ ডেস্ক রিপোর্ট:: বাংলাদেশে প্রথম লাল আপলের গাছ লাগিয়ে তা থেকে ফলন, বিরল প্রজাতির মনমাতানো নন্দিনী ফুল ফুটিয়ে তা ছড়িয়ে দেয়া, গাছগাছালির রোগ ও প্রতিকার সবই তারা করছেন সবুজ বাংলাদেশের জন্য। এদেশে হয় না এমন সবজি চাষ করে দেশকে স্বাবলম্বী করা ছাড়াও প্রকৃতিকে সুন্দর ও বাসযোগ্য করার তাগিদে সারাদেশে নীরবে সবুজ বিনিময়ের কাজ করে যাচ্ছেন কয়েক লাখ মানুষ। তারা নিজে চাষ করছেন, অন্যকে চাষে উৎসাহ দিচ্ছেন। নিজেরা চারা বা বীজ তৈরি করে তা বিনামূল্যে বিলিয়ে দিচ্ছেন দেশজুড়ে।

জানা গেছে, সবচেয়ে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুককে প্লাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করে সবুজের এই নীরব আন্দোলন গড়ে ওঠেছে। বিভিন্ন নামে প্রায় ৫০টির মত গ্রুপ খুলে তারা বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে থাকা বাংলাভাষীদের মধ্যে গাছের চারা, কলম ও বীজ বিনিময় করছেন।

শুধু বীজ, চারা বা গাছের কলম বিনিময় নয়, কীভাবে গাছ লাগতে হবে, কোন মাটিতে কি গাছ লাগালে বেশি ভাল হবে, গাছের রোগবালাইয়ের প্রতিকারও জেনে নিচ্ছেন ৯০ মিনিট স্কুলিং প্রোগ্রামের মাধ্যমে। আর সবই গড়ে উঠেছে অদম্য গাছ ও বাগান প্রেমীদের স্বেচ্ছাশ্রমে।

একাজে জড়িত একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই সবুজ বিনিময়ের উদ্যোক্তা জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সহকারি সচিব এবিএম বিল্লাহ হোসেন। তিনিই বাংলাদেশে প্রথমে ফেসবুকে গ্রুপ খুলে সবুজ বিনিময়ের ধারণা চালু করেন। গ্রুপের সদস্যরা একটি জায়গায় একত্রিত হয়ে ৯০ মিনিট স্কুলিংয়ে যোগ দেন। এরপর এই ধারণা আস্তে আস্তে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

বিরল প্রজাতির নন্দিনী ফুল বাংলাদেশে চাষ করতে সক্ষম হয়েছেন ড. জামাল উদ্দিন:

এবিএম বিল্লাহ হোসেন বলেন, ‘শহরে সবুজায়ন, বায়ুদূষণরোধ, নিরাপদ খাদ্যের বিকল্প উৎস তৈরি, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, এসব উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে সমমনা কিছু মানুষের সমন্বয়ে যাত্রা শুরু করি। পরে দেখি আমাদের কিছু গাছ, চারা বা বীজ আছে যা ব্যবহার করার জায়গা বা প্রয়োজন নেই। সেইগুলো অন্যকে কীভাবে দেয়া যায় সেই চিন্তা থেকেই এই সিদ্ধান্ত নিই।’

জানা যায়, পরে ফেসবুকের এই পদ্ধতিতে যুক্ত হন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যান তত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. জামাল উদ্দিনসহ অনেক কৃষিবিদ, নার্সারি মালিক, কৃষক, ছাদে বা বাড়িতে বাগান করেন এমন অসংখ্য বৃক্ষপ্রেমী। ড. জামাল উদ্দিন বিরল প্রজাতির নন্দিনী ফুল বাংলাদেশে চাষ করতে সক্ষম হয়েছেন। এখন শত শত চারা তৈরি করে বিলি করছেন। অপরূপ সৌন্দয্যের এ ফুল চাষ নিয়ে গবেষণায় এখনও ভারত, নেপাল, ভুটান, পাকিস্তান ও থাইল্যান্ডের কৃষিবিজ্ঞানীরা সাফল্য না পেলেও বাংলাদেশের আবহাওয়ায় ২০ রঙের ‘নন্দিনী ফোটাতে সক্ষম হয়েছেন জামাল উদ্দিন। তিনিই ৯০ মিনিট স্কুলিংয়ের ধারণা নিয়ে শুরু করেন মত ও সবুজ বিনিময়।

এ বিষয়ে কথা হয় ড. জামাল উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘জাপানে পিএইচডি করার সময় যু্ক্তরাষ্ট্রের একটি ফুল ‘লিসিয়েনথাস’ বা বাংলায় ‘নন্দিনী’ নিয়ে গবেষণা করি। সেই সময় সেখানে কিছু জাতও উদ্ভাবন করি। দেশে ফিরে আসার পর সেই নন্দিনী চাষের চেষ্টা করি। কিন্তু বাংলাদেশের আবহাওয়ার কারণে চারা নষ্ট হয়ে যায়। ২০০৯ সালে নতুন করে চারা তৈরি করতে সক্ষম হই। এখন নিজেদের উদ্যোগে গবেষণা করে চারা বিতরণ করছি।’

এই গাছের উপকারিতা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এদেশে গোলাপসহ অধিকাংশ বাণিজ্যিক ফুল শুধু শীতকালে সহজলভ্য। তবে ‘নন্দিনী’ মূলত জুন থেকে জুলাই মাসে ফুটলেও সারা বছরই উৎপাদন এবং ১০ থেকে ১৫ দিন তাজা রাখা যায়। একটি ফুলে দুটি রঙ হয় এমন জাতও আছে।’

আঙুরের মতো দেখতে বিদেশি সুস্বাদু গুজিবেরি ফল চাষ হচ্ছে দেশেই:

এছাড়া জার্মানির বিশেষ জাতের আপেল বাংলাদেশেই প্রথম উৎপাদনে সক্ষম হয়েছেন বলে জানিয়েছেন এবিএম বিল্লাহ হোসেন। তিনি বলেন, ‘ট্রপিক্যাল জাতের আপেল বাংলদেশে খুব কম সংখ্যক চাষ হলেও লাল আপেল এখনও কেউ চাষ করতে পারেনি। আমি জার্মান প্রবাসী এক ভাইয়ের মাধ্যমে এই চারা আমার সরকারি বাসভবনের ছাদে লাগিয়ে ফল ধরাতে সক্ষম হয়েছি।’

আরও কয়েক উদ্যোক্তা জানান, তারা মনে করেন দেশের ৩৭ হাজার বর্গকিলোমিটারের বড় ১০টি মেট্রোপলিটন শহর তাপ উৎপাদন করে আর কার্বন ডাই অক্সাইট ছাড়ে। কিন্তু সেই তুলনায় গাছ নেই, বাগান নেই। শাকসবজির জন্য অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয়।

গ্রিন বাংলাদেশ, সবুজ কথন, সবুজ বাগান সোসাইটি, সবুজ সেনা সোসাইটি, এসো বাগান করি, গ্রিন রুফ মুভমেন্টসহ ৫০টির বেশি ফেসবুক ভিত্তিক গ্রুপ গাছগাছালি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। তবে বিনামূল্যে সব দেয় গ্রিন বাংলাদেশ, সবুজ কথন, সবুজ বাগান সোসাইটি, সবুজ সেনা সোসাইটিসহ কিছু গ্রুপ। অন্যরা ফেসবুকের মাধ্যমে ব্যবসা করা ছাড়াও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মতবিনিময় করেন।

এসব ফেসবুক গ্রুপের সদস্য আড়াই লাখের মতো। বিভিন্ন নার্সারি বা বৃক্ষমেলায় যেসব গাছ হাজার টাকা থেকে ৫হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয় সেগুলোও তারা বিনামূল্যে বিতরণ করছেন। আর গাছবিষয়ক নানান সমস্যার সমাধানের জন্য ৯০ মিনিট নামে স্কুলিং করছেন তারা। বর্তমানে শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমে শুক্রবার সকালে জমায়েত হচ্ছেন তারা। দেশের দূর দূরান্ত থেকেও আসেন অনেকে।

গ্রিন বাংলাদেশ নামের ফেসবুক ভিত্তিক সদস্যদের স্কুলিংই বাংলাদেশে এই ধরনের সবচেয়ে বড় আয়োজন বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে এটি শুরু হলেও পরে ভিসি তাদের কার্যক্রম দেখে ক্লাস রুম বরাদ্দ দিয়েছেন। আর অনেক চাহিদা থাকায় দুর্লভ ও দামি গাছের বীজ বা চারা লটারির মাধ্যমে বিতরণ করা হয়। তবে সেখানে অংশ নিলে সবাইকে কিছু না কিছু দেয়া হয়। থাকে সারপ্রাইজ পুরস্কারও। এ কারণে অনেক তরুণও যুক্ত হয়েছেন এই প্রক্রিয়ায়। প্রতি ক্লাসে ৫০০ থেকে ৭০০ গাছপ্রেমী অংশ নেন। এছাড়াও রাজধানীর রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, কার্জন হলসহ বিভিন্ন জায়গায় এই ধরনের স্কুলিং হয়।

বাংলাদেশে জার্মানির বিশেষ জাতের আপেল চাষে সফল হয়েছেন এবিএম বিল্লাহ হোসেন:

গ্রুপ থেকে গাছ, চারা ও বীজ নিয়ে রাজধানীর মধ্যবাড্ডার বাড়ির ছাদে বাগান করেছেন রফিকুল ইসলাম। সরেজমিনে দেখা গেছে তার বাগানে বারোমাসি সজনা, শিম থেকে শুরু করে টমেটো, কলম্বো লেবু, বিভিন্ন জাতের মরিচ, সাদা এলাচ, লবঙ্গ, বিভিন্ন ধরনের আম, পেঁপে, বিরল প্রজাতির ডে লিলি, চায়না কদমসহ নানা রঙ ও আকৃতির অর্কিডসহ বিভিন্ন দেশি-বিদেশি ফুলের গাছ। তিনি বলেন, ‘বাইরে যেসব গাছের দাম ১ শ’ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত সেগুলোও তিনি বিনামূল্যে পেয়েছেন। এছাড়া বাইরের বীজ বা চারার গুণগত মান জানা যায় না। কিন্তু ফেসবুকের মাধ্যমে তিনি উন্নত জাতের চারা বা বীজ পেয়েছেন।’

ধানমন্ডির অধিবাসী সরকারি চাকরি থেকে অবসরে যাওয়া ডা. ফেরদৌস আরা চৌধুরী নিয়মিত এই স্কুলিংয়ে অংশ নেন। তিনি বলেন, ‘এটা থেকে আমরা বিভিন্ন ধরনের উপকার পাই। এটি আমাদের জন্য নির্মল চিত্ত বিনোদনের জায়গাও। সেখানে বয়স্ক থেকে টিনএজরা যান। এতে সবার মধ্যে একটা যোগাযোগ গড়ে ওঠে। আগে আমরা বাড়তি সব কিছু ফেলে দিতাম। এখন সেটা অন্যকে দিচ্ছি। এ সময়ের যুব সম্প্রদায় ভার্চুয়াল দিকে ঝুঁকে গেছে তারাও আগ্রহ দেখাচ্ছে। গাছকে ভালোবেসে আনন্দ পাচ্ছে ‘

নরসিংদীর স্বপ্না আহমেদ জানান, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে আমি এখন বিষমুক্ত শাকসবজি খেতে পারছি। এছাড়া বিনামূল্যে ব্ল্যাকবেরির ও সাথী পানের চারাসহ অনেক দুর্লভ গাছ পেয়েছি।

সরেজমিন বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে দেখা গেছে, নন্দিনী ফুল ও বিশেষ প্রজাতির আপেল ছাড়াও বাংলাদেশে প্রথমবারের মত ভ্যানিলার চাষ, ভারতের বারমাসি সজনা, মালেশিয়ান চয়থান সবজি, বারমাসি শসার প্রসার ঘটাচ্ছেন তারা। এছাড়াও ঔষধি গাছসহ বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদের সংরক্ষণ ও প্রসার করেন তারা।

এ বিষয়ে ড. জামাল উদ্দিন বলেন, ‘অনেক দুর্লভ গাছ যা বাংলাদেশে থেকে হারিয়ে যাচ্ছে, যেসব গাছের ঔষধিমূল্য খুব বেশি অথবা মানুষের মধ্যে অনেক চাহিদা আছে, আমরা নিজেরা শেরে বাংলার মাঠে সেসব ফল, শাকসবজির চারা উৎপাদন করে বিনামূল্যে তাদের হাতে দিচ্ছি।’

তিনি বলেন, ‘এর মাধ্যমে বাংলাদেশে ভ্যানিলা বীজ বিতরণ করে এর চাষের প্রসার ঘটাচ্ছি। যা আইসক্রিমে ব্যবহার করা হয়। এটি বাংলাদেশে ছিল না। ব্যক্তিগতভাবে আমি এটা নিয়ে এসেছি। তারপর দেশের কয়েক হাজার মানুষের হাতে তুলে দিয়েছি। যার আর্থিক মূল্য নিরূপণ করা যায় না।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশের বাইরে থেকেও অনেকে নিজ আগ্রহে বীজ সরবরাহ করেন। সরকারের অনুমতি নিয়ে আনেন বিভিন্ন জাতের সুস্বাদু ফল ও সবজির চারা।

এবিএম বিল্লাহ হোসেন বলেন, সুইডেন থেকে নুরনবী আলভি প্রচুর সংখ্যক মিষ্টি ও সুস্বাদু গুজিবেরি ফলের বীজ পাঠিয়েছেন। এই ফল আঙুরের মত দেখতে হলেও স্বাদ বেশি ও স্বাস্থ্যকর। এখন বাংলাদেশের বিভিন্ন বাগানে এই ফলের চাষ হচ্ছে। মালেশিয়া থেকে রফিক আবদুল মান্নান চীন অঞ্চলের শাকসবজির বীজ সরবরাহ করছেন।’

ফেসবুকের মাধ্যমে গাছ বিক্রি করা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ব্যবসা করলেও এটিও ভাল উদ্যোগ। কারণ এর মাধ্যমে দূর-দূরান্তের মানুষ এ বিষয়ে জানতে পারছেন। ফুল, ফল, গাছ, সবজির ছবি দেখে আগ্রহী হচ্ছেন।’

কৃষিবিদ মাহবুবুল ইসলাম ইসলাম জানান, আমরা এইসব গ্রুপ ও স্কুলিংয়ের মাধ্যমে গাছের নানান সমস্যার সমাধান দিয়ে থাকি। নতুনরা অনেক আগ্রহ নিয়ে আমাদের কাছে এসব বিষয়ে জানতে চায়। আমরা তাদের যথাসাধ্য সাহায্য করি।’

তিনি বলেন, ‘বিদেশ থেকে আনা বীজ বাংলাদেশের আবহাওয়া, মাটি কিংবা পরিবেশের কোনো ক্ষতি করবে কি না আমরা তার পরীক্ষা করে তারপর বিলি করি।’