ডি এইচ দিলসান॥ আগামী ৬ই মার্চ জাতীয় পাট দিবসকে সামনে রেখে খাদ্যশস্য, চিনি ও সারের ক্ষেত্রে পাটের বস্তা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। তবে এ নিয়ম মানছে না বেশিরভাগ পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। আগের মতো প্লাস্টিকের বস্তা ব্যবহার করা হচ্ছে। ব্যয় বেশি ও পাটের বস্তায় গায়ে পণ্যের লগো ব্যবহারের অসুবিধাকে নিয়ম না মানার কারণ হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন তারা। পাটের বস্তা সরবরাহের অপ্রতুলতার কথাও বলছেন তারা। এবারের পাট দিবস উপলক্ষে সরকার সপ্তাহ ব্যাপি নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। একই সাথে সরকার খাদ্যশস্য, চিনি ও সার সহ ১৭টি পণ্যের পাটের ব্যাগ বা মোড়ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে।

২০১০ সালের ৩ অক্টোবর পণ্যে পাটজাত মোড়ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা সংক্রান্ত আইন পাস হয়। এবার সরকার পাটের ব্যাট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করলেও প্রশাসনের ঢিলেমি ও কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে প্রয়োগ হচ্ছে না সরকারের যুগান্তকারী এ আইন। পাটের বস্তা ব্যবহার না করে প্লাস্টিকের বস্তা ব্যবহার করার দায়ে জেল জরিমানার আইন থাকলেও আইন অমান্যকারী কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ বা কারও এজন্য জেল-জরিমানা হয়েছে এমন নজিরও নেই। ফলে প্লাস্টিক মোড়ক ব্যবহারের পরিবর্তে পাটজাত মোড়কের ব্যবহার বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে সরকারের লক্ষ্য অর্জিত না হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

যশোরের বাজার ঘুরে দেখা গেছে- প্রায় সব দোকানেই চাল, ডাল, ছোলা, চিনি, ভুট্টা সহ সকল প্রকার পন্য থরে থরে সাজানো রয়েছে প্লাস্টিকের বস্তায়। পাটর বস্তা চোখেই বাধেনা। এ ব্যাপারে ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বললে, তাদের অভিযোগ পাটের বস্তার দাম বেশি ও সহজলভ্য নয়, তাই তারা প্লাস্টিকের বস্তা ব্যবহার করছে। আর এই অজুহাতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তো বটেই, কোনো কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানও প্লাস্টিকের বস্তা ব্যবহার করছে।

এ ব্যাপারে যশোর বড় বাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী শেখ জিয়াউর রহমান জিকো বলেন, আমরা পাটের বস্তা ব্যবহার করতে চাই, কিন্তু সরকারি গোডাউন থেকে শুরু করে আমদানিকৃত পন্য এবং কারখানা থেকে ক্রয়কৃত সকল পন্যেই আমরা পাই প্লাস্টিকের বস্তায়। তিনি বলেন সরকার উপর থেকে পাটের বস্তার ব্যবহার নিশ্চিত করলে আমরা খুচরা ব্যবসায়ীরা পাটের বস্তা ব্যবহার করতে পারি।

এ ব্যাপারে যশোরের কৃষিবীদ সিরাজুল ইসলাম মৃধা বলেন, পাটের বস্তার দাম যেখানে ৬০ টাকা সেখানে প্লাস্টিকের বস্তার দাম ২০ টাকার মতো। কিন্তু প্লাস্টিকের বস্তা একবার মাত্র ব্যবহার করা যায়। আর পাটের বস্তা ব্যবহার করা চলে অনন্ত চারবার। এভাবে পাটের বস্তা ব্যবহার করেও খরচ কমানো যায়। তা ছাড়া প্লাস্টিক পরিবেশের ক্ষতি করে কিন্তু পাটের মোড়কে পরিবেশের পক্ষে ক্ষতিকারক উপাদান অনুপস্থিত। তাই পাটের বস্তা বা মোড়ক ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবেশেরও দূঘন রোধ হবে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন দেশের প্রায় চার কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাট খাতের ওপর নির্ভরশীল, তাই দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আমাদের উচিৎ পাটজাত দ্রব্য ব্যবহার করা।

এ ব্যাপারে যশোর আঞ্চলিক পাট গবেষনা ইনস্টিটিউটের উর্ধতন বৈঙ্গানিক কর্মকর্তা সাখাওয়াত হোসেন বলেন, পাটের বস্তার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা দরকার। কারণ পাটের বস্তা ব্যবহার করলে দেশে পাটের চাহিদা যেমন বাড়বে তেমনি ভালো থাকবে পরিবেশও। তিনি বলেন যারা প্রাস্টিক বস্তা ব্যবহার করছেন তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। তিনি বলেন, এবারের পাট দিবসে আমরা উর্ধতন কর্মকর্তাদের এ ব্যাপারে অবশ্যয় বলবো। তিনি আরো বলেন, ২০১০ সালের ৩ অক্টোবর পণ্যে পাটজাত মোড়ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা সংক্রান্ত আইন পাস হয়। পরিবেশ দূষণ রোধ ও পাট ব্যবসার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে এ আইন পাস করা হয়। আইনটি কার্যকরের জন্য বিভিন্ন সময় খাদ্যপণ্য ও সিনথেটিক ব্যাগ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেছে বিজেএমসি ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। তাঁদের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে ২০১৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পযর্ন্ত আইনের কার্যকারিতা শর্তসাপেক্ষে শিথিল করা হয়। ২০১৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে আইনটি বাধ্যতামূলক করা হয়। কিন্তু এরপর ৪৮ মাস পর হয়ে গেলেও চিত্র বদলায়নি। ২০১০ সালের আইনে বলা হয়েছে, ‘এ আইন কার্যকর হইবার পর কোনো ব্যক্তি, এই আইনের অধীন প্রণীত বিধি দ্বারা নির্ধারিত পণ্য পাটজাত মোড়ক দ্বারা মোড়কজাতকরণ ব্যতীত বিক্রয়, বিতরণ বা সরবরাহ করতে পারিবেন না বা করিবার অনুমতি প্রদান করিতে পারিবেন না।’করলে জেল ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে। শুরুতে ধান, চাল, গম, চিনি, সার ও ভুট্টার পাটজাত মোড়কের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ধান, চাল ও গমের ক্ষেত্রে শতভাগ পাটের বস্তা ব্যবহার করতে হবে। দেশে উৎপাদিত ও আমদানি করা সব সারের মোড়কজাতকরণে বাধ্যতামূলকভাবে শতকরা ৫০ ভাগ পাটের বস্তা ব্যবহার করতে হবে। চিনির ক্ষেত্রেও শতকরা ৫০ ভাগ লেমিনেটেড পাটের বস্তা ব্যবহার করতে হবে। এ ছাড়া ভুট্টার মোড়ক হিসেবে শতভাগ পাটের বস্তা ব্যবহার করতে হবে। ‘১৯৮৭ সাল থেকে ভারতে এ আইনটি কার্যকর আছে। অথচ আমাদের দেশে তিন বছরেও এটি কার্যকর করা যায়নি। আইনটি বাস্তবায়িত হলে পাটকলগুলো বেঁচে যাবে।’