স্পোর্টস ডেস্ক:: ১৯৯৮ সালের ১৭ মে। হায়দরাবাদে কেনিয়াকে হারিয়ে বাংলাদেশ জিতল নিজেদের প্রথম ওয়ানডে। আজ সেই গৌরবের ২০ বছর পূর্তির দিনে মোহাম্মদ রফিকের কণ্ঠে কেবলই গর্ডন গ্রিনিজ।

ব্যাপারটা কাকতালীয়ই।

ক্যালেন্ডারের পাতায় ১৭ মে তারিখটায় চোখ পড়তেই ব্যাপারটা মনে পড়ল। এমন একটা তারিখে গর্ডন গ্রিনিজ বাংলাদেশে! তারিখটা বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য বিশেষ কিছুই। ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশের প্রথম জয়ের দুই দশক পূর্তি যে আজ! গ্রিনিজের কি মনে আছে, আজকের তারিখটা ২০ বছর আগে তাঁকে কতটা আপ্লুত করেছিল! কতটা আনন্দ নিয়ে তিনি উদ্‌যাপন করেছিলেন ১৭ মের রাতটি। গ্রিনিজের এটি মনে না থাকারই সম্ভাবনা বেশি। বাংলাদেশের ক্রিকেট যে পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, ক্রিকেট-সংশ্লিষ্ট অনেকেরই হয়তো মনে নেই এদিনটি কতটা গুরুত্ববাহী এ দেশের ক্রিকেটে।

আর কারও মনে থাকুক কি না থাকুক, একজন মানুষের কিন্তু ঠিকই মনে আছে সবকিছু। তিনি মোহাম্মদ রফিক। ১৯৯৮ সালের ১৭ মে হায়দরাবাদের লাল বাহাদুর শাস্ত্রী স্টেডিয়ামে তাঁর কাঁধে চড়েই তো ইতিহাস গড়েছিল বাংলাদেশ। কেনিয়ার বিপক্ষে পেয়েছিল প্রথম ওয়ানডে জয়ের স্বাদ। নিজের ‘বীর’ হয়ে ওঠার গল্পটা শোনাতে গিয়ে রফিকের কণ্ঠে বারবারই ফিরে এল গ্রিনিজের নাম।

১৯৯৬ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশের কোচ হয়ে আসা ক্যারিবীয় কিংবদন্তি ছিলেন পাকা জহুরি। এ দেশের ক্রিকেটের দায়িত্ব নিয়েই চিনে নিয়েছিলেন নিজের অস্ত্রগুলো। সেই অস্ত্রগুলো সময়মতো ব্যবহার করেই তো তাঁর যত সাফল্য। রফিক যে তাঁর অন্যতম সেরা অস্ত্র ছিলেন, সেটা তো বলাই বাহুল্য। বাঁ হাতি অলরাউন্ডারের মারকাটারি ব্যাটিংকে আটানব্বইয়ের ১৭ মে কেনিয়ার বিপক্ষে ব্যবহার করেছিলেন দারুণভাবে। রফিককে হঠাৎ ওপেনিংয়ে পাঠিয়ে বের করে নিয়ে এলেন ৭৭ রানের এক ইনিংস। কেনিয়ার ২৩৬ রানের জবাবে সেই ৭৭ রানের ইনিংসটি ছিল মহাগুরুত্বপূর্ণ।

মহাগুরুত্বপূর্ণ সেই ইনিংসটির পেছনের গল্পটা খুবই সাধারণ। অন্তত রফিকের কাছে তা-ই, ‘কেনিয়া ২৩৬ রানে থেমে যাওয়ার পর আমাদের জেতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু কাজটা কিছুটা কঠিন ছিল। ফ্লাড লাইটের আলোতে সে সময় আমাদের ব্যাটিং করার বেশি অভিজ্ঞতা ছিল না। আমাদের ২৩৭ রান করতে হতো ফ্লাড লাইটের নিচে। হায়দরাবাদের গরমটা ছিল খুব বাজে। সেদিন ম্যাচটা জিততে আমাদের একটা ভালো শুরু খুবই জরুরি ছিল। গ্রিনিজ বিরতির সময় এসে বললেন, “রফিক, তোমাকে ওপেন করতে হবে।”’

প্রস্তাবটা রফিককে যে কিছুটা অবাক করেছিল, সেটা অস্বীকার করলেন না, ‘আমি কিছুটা অবাক হয়েছি। তবে সেটা গ্রিনিজকে বুঝতে দিইনি। ১৯৯৭ আইসিসি ট্রফি ফাইনালে আমি দুর্জয়ের (নাঈমুর রহমান) সঙ্গে ওপেনিংয়ে নেমেছিলাম। দ্রুত কিছু রানও করেছিলাম। তবে এই দুই ম্যাচে তো পার্থক্য আছেই। আমি ভরসা পেয়েছিলাম আতহার ভাইয়ের (আতহার আলী খান) জন্য। তিনি অভিজ্ঞ ওপেনার। বলেছিলেন, “রফিক, তুই তোর খেলা খেলে যা।”’

নিজের খেলাটাই খেলেছিলেন রফিক। ৮৭ বলে ৭৭ রান করলেন ১১ চার আর এক ছয়ে। ইনিংসের একমাত্র ছক্কার স্মৃতি এখনো মনে আছে তাঁর, ‘আমি ক্রিকেটীয় শট খেলতে চেয়েছিলাম সে ম্যাচে। কীভাবে যেন ৪৬ রানে পৌঁছে গেলাম। সে সময় আমি মরিস ওদুম্বেকে উড়িয়ে ছক্কা মারি। ফিফটি তুলে নিই। কিন্তু কেন যেন গ্রিনিজ আমার সেই ছক্কাটি পছন্দ করেননি। ইশারায় বুঝলাম, তিনি আমাকে ইনিংসটা লম্বা করতে বলছেন।’

রফিকের অনেক গর্ব সেই ইনিংসটি নিয়ে। সেই গর্ব দেশের প্রথম ওয়ানডে জয়ে অবদান রাখতে পারার জন্য। সেটা জানাচ্ছেন গর্বের সঙ্গেই, ‘আমি এটা নিয়ে সব সময়ই ভাবি। ১৯৯৮ সালের ১৭ মে আমাদের প্রতিপক্ষ কেনিয়া হতে পারে, কিন্তু ওটা ছিল বাংলাদেশের প্রথম ওয়ানডে জয়। সেই জয়ে আমি ম্যাচসেরা হয়েছি। আমার গর্বটা অন্য রকম। আমি চিরদিনই কৃতজ্ঞ গ্রিনিজের প্রতি, তিনি আমাকে সে সুযোগটা করে দিয়েছিলেন।’

রফিকের মতো গোটা বাংলাদেশও কৃতজ্ঞ গ্রিনিজের প্রতি। তাঁর অধীনেই তো হয়েছিল জয়যাত্রার শুরুটা।