এস.এম.সাঈদুর রহমান সোহেল,খুলনা ব্যুরো::
খুলনায় ময়ূর নদী ও সংযুক্ত ২২টি খালের প্রায় ১৪ হাজার বর্গমিটার জায়গা বেদখল হয়ে গেছে। এর মধ্যে ময়ূর নদীর বেদখল হওয়া জমির পরিমাপ ১০৭৫ বর্গমিটার। নদীর আয়তন কমেছে চার দশমিক ১৭ শতাংশ। অবৈধ দখলের কারণে খালগুলো সংকীর্ণ হওয়ায় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ব্যাহত হয়। ফলে প্রতি বর্ষা মৌসুমে শহরের বড় অংশ জুড়ে সৃষ্টি হচ্ছে স্থায়ী জলাবদ্ধতা।
এদিকে, খুলনার ২২টি খালের ওপর থেকে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদে মঙ্গলবার থেকে অভিযান শুরু করেছে কেসিসি ও জেলা প্রশাসন। প্রথম দিন গল্লামারী এলাকায় ময়ূর নদী ঘিরে গড়ে ওঠা কাঁচা, সেমিপাকা, পাকা স্থাপনা ক্রেন দিয়ে গুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
অভিযানে নেতৃত্ব দেন খুলনা জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বটিয়াঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেবাশীষ চৌধূরী, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. দেলোয়ার হোসেন, খুলনা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট খান মাসুম বিল্লাহ।
খুলনা জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসেন বলেন, জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে খুলনা সিটি কর্পোরেশনের সহযোগিতায় ময়ূর নদী সহ মহানগরীর অভ্যন্তরীণ ও পার্শ্ববর্তী খালসমূহের অবৈধ দখল উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। মহানগরীর ময়ূর নদীসহ ২২খালের স্বাভাবিক গতি প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, খুলনার সৌন্দর্য্য ফিরিয়ে আনা ও বসবাসের উপযোগি করার লক্ষে সম্পূর্ণরূপে দখলমুক্ত করা হবে।
সূত্র জানায়, খুলনা জেলা প্রশাসন, খুলনা সিটি কর্পোরেশন (কেসিসি), পানি উন্নয়ন বোর্ড, এলজিইডি ও সেটেলমেন্ট অফিস যৌথভাবে দখলমুক্ত করার কাজ বাস্তবায়ন করছে। তিনটি পদক্ষেপের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে কাজগুলো সম্পন্ন হবে। উচ্ছেদ কার্যক্রম সফল করার জন্য ১১ সদস্য বিশিষ্ট টেকনিক্যাল কমিটি এবং ২৫ সদস্য বিশিষ্ট উদ্ধার কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এর আগে ৪ জানুয়ারি খুলনা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেন মহানগরীর অভ্যন্তরীণ ও পার্শ্ববর্তী খালসমূহের বর্তমান অবস্থা সরেজমিন পরিদর্শন করেন ।
সূত্র জানায়, প্রভাবশালীরা ময়ূর নদীতে খুব সহজেই পাটা ও বাঁধ দিয়ে প্রতিদিনই দখল কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। পৈত্রিক সম্পত্তির মতো গাছপালা লাগানো ও চাষাবাদসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা, এমনকি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও পাকা বাড়ী-ঘর ভবন নির্মাণ করেছিলেনও অনেকে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দুই যুগ আগেও ময়ূর নদীতে পালতোলা নৌকা চলাচল করতো। অনেক জেলে পরিবারের জীবিকার মূল উপজীব্য ছিল এ নদী। গোসল ও তৈজসপত্র ধোয়ার কাজে নদীর পানি ব্যবহার করত। অথচ এখন দখল ও দূষণে আর ব্যবহারের উপযোগী নেই। ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ ময়ূর নদীর সাথে আগে রূপসা নদীর সরাসরি সংযোগ ছিল। দখলে নদী হারিয়েছে নিজস্বতা। ময়ূর নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনতে ৫ কোটি ৭৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০১৬ সালে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে খুলনা সিটি কর্পোরেশন। তাতে পুরোপুরি দখল মুক্ত হয়নি নগরীর খালগুলো।
বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটিসহ বিভিন্ন পরিবেশবাদী সামাজিক সংগঠন খাল দখল মুক্তকরণের দাবিতে আন্দোলন করে আসছিল।
সিটি মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক বলেন, ২০১০ সালে সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে নগরীর ২২টি খালের অবৈধ দখলদার চিহ্নিত করে উচ্ছেদ অভিযান শুরু করা হয়। এর আগে ২০০৯ সাল থেকে ময়ূর নদী ও সংযুক্ত খালগুলো দখলমুক্ত করার জন্য জরিপ, অনুসন্ধান ও সুপারিশ গ্রহণ করা হয়। কিন্তু পরবর্তীকালে ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়নি। তবে এবার পানি নিষ্কাশন ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে আটশ’ কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। পর্যায়ক্রমে খালের অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা হবে।
খুলনা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেন বলেন, খালের অবৈধ দখল উচ্ছেদে এবার সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমরা খুলনার ২২টি খাল পরিদর্শন করেছি। এরই মধ্যে কিছু কিছু জায়গায় উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়েছে। তবে অনেকেই খালের জমিকে তাদের ব্যক্তিগত বলে দাবি করছে। সিএস এসএ আরএস ম্যাপ থেকে তাদের উচ্ছেদ নোটিশ দেয়া হচ্ছে।