ফেনী প্রতিনিধি::

ফেনীর সোনাগাজীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনার রহস্য উদঘাটন ও পুলিশের দায়িত্বহীনতার বিষয়ে জানতে ফেনীর পুলিশ সুপার (এসপি) এস এম জাহাঙ্গীর আলম সরকারকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। ওই ঘটনায় সোনাগাজী থানা থেকে প্রত্যাহার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোয়াজ্জেম হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট ৪০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

নুসরাত হত্যার তদন্তে গঠিত পুলিশ হেড কোয়ার্টার্সের উচ্চপর্যায়ের কমিটি সূত্রে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।-জাগো নিউজ

দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, নুসরাতকে যৌন হয়রানির পর তাকে আগুন দেয়া এবং তার মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে যেসব পুলিশ কর্মকর্তা যুক্ত ছিলেন তাদের জবানবন্দি নিয়েছে তদন্ত কমিটি। এ তালিকায় পুলিশ সুপার ও ওসিসহ মাদরাসা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও ছিলেন।

সোনাগাজী থানার আলোচিত ওসিকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়ার পর ঢাকার উত্তরায় আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) সদর দফতরে রাখা হয়েছে।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে ‘ওসি দেশ ছেড়ে পালাতে পারেন’- এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে দায়িত্বশীল এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, এপিবিএন সদর দফতর অত্যন্ত শৃঙ্খল ও নিরাপত্তাবেষ্টিত। এখান থেকে চাইলেই কেউ চলে যেতে পারেন না। তবে জেলা শহরের কোনো ওসিকে ক্লোসড করা হলে তাকে ওই জেলায় বা রেঞ্জ ডিআইজির অফিসে সংযুক্ত করা হয়। ওসি মোয়াজ্জেমকে ঠিক কেন এপিবিএন সদর দফতরে রাখা হয়েছে সে বিষয়ে সদুত্তর দিতে পারেননি সংশ্লিষ্ট কেউ।

পুলিশ সদর দফতরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) মো. সোহেল রানা বলেন, ‘তদন্ত চলছে। তথ্য সংগ্রহের প্রাথমিক কাজ শেষ। শিগগিরই প্রতিবেদন জমা দেয়া হবে। প্রতিবেদনে কার কতটুকু দায় ছিল কিংবা আসলেই কারও দায় ছিল কি না- সে বিষয়গুলো পরিষ্কার হয়ে যাবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘প্রতিবেদনে যদি পুলিশের কোনো সদস্যের দায়িত্বে অবহেলা বা অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যায় তবে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তাদের অপরাধ ফৌজদারি সমতুল্য হলে প্রচলিত আইনে মামলা হবে।’

তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, এ ঘটনার তদন্ত মোটামুটি শেষ। এখন প্রতিবেদন প্রস্তুতের কাজ চলছে। আশা করছি, ৮-১০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেয়া যাবে।

তদন্তের বিষয়ে সম্প্রতি ফেনীতে কমিটির প্রধান এবং পুলিশ সদর দফতরের ডিআইজি মো. রুহুল আমীন বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে নুসরাতের ঘটনায় সোনাগাজী থানার সাবেক ওসির ত্রুটি-বিচ্যুতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। ওসিসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার গাফিলতির বিষয়ে তদন্ত চলছে। বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কারণ ২৭ তারিখের (২৭ মার্চ) যৌন হয়রানির ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসন, মাদরাসার ম্যানেজিং কমিটি যথাযথ ব্যবস্থা নিলে মর্মান্তিক ওই ঘটনা এড়ানো যেত।’

তিনি আরো বলেন, ‘আগে থেকেই অধ্যক্ষ সিরাজের অনেক খারাপ হিস্ট্রি ছিল। ব্যাপারটি গভর্নিং বডির সদস্যরাও জানতেন। যদি আগে ব্যবস্থা নেয়া হতো তাহলে এ ধরনের ঘটনা ঘটতো না। এটির সঙ্গে স্থানীয় রাজনীতিও জড়িত। একই দলের দুজন কাউন্সিলর অধ্যক্ষের পক্ষে ও বিপক্ষে মানববন্ধন করেছেন। প্রাথমিকভাবে এর সত্যতা পাওয়া গেছে। সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে, পুরোপুরি তদন্ত শেষে প্রতিবেদন দাখিলের পাশাপাশি গণমাধ্যমকর্মীদের আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।’

উল্লেখ্য, গত ২৭ মার্চ নুসরাত জাহান রাফিকে নিজ কক্ষে নিয়ে শ্লীলতাহানির অভিযোগে মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাকে আটক করে পুলিশ। ওই ঘটনার পর থেকে তিনি কারাগারে।

ওই ঘটনায় রাফির মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন। গত ৬ এপ্রিল (শনিবার) সকালে রাফি আলিম পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসায় যান। সে সময় মাদরাসার এক ছাত্রী তার বান্ধবী নিশাতকে ছাদের ওপর কেউ মারধর করছে- এমন সংবাদ দিলে রাফি ওই বিল্ডিংয়ের চার তলায় যান।

সেখানে মুখোশ পরা চার-পাঁচজন তাকে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার বিরুদ্ধে মামলা ও অভিযোগ তুলে নিতে চাপ দেয়। রাফি অস্বীকৃতি জানালে তারা তার গায়ে আগুন দিয়ে পালিয়ে যায়।

১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।

তার মৃত্যুর পর সোনাগাজী থানায় অভিযোগ নিয়ে যাওয়া নুসরাতের সঙ্গে ওসি মোয়াজ্জেমের কথোপকথনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। নুসরাতের মৃত্যুর পরদিন নুসরাতের পরিবারকে অসহযোগিতার অভিযোগে প্রত্যাহার করা হয় ওসিকে।

আলোচিত এ মামলায় এজাহারভুক্ত আট আসামিসহ এখন পর্যন্ত ২০ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ ও প্রধান তদন্ত সংস্থা পিবিআই। তাদের মধ্যে কিলিং মিশনে অংশগ্রহণকারী পাঁচজন শাহাদাত হোসেন শামীম, জাবেদ হোসেন, জোবায়ের আহমেদ, উম্মে সুলতানা পপি ও কামরুন নাহার মনিসহ আটজন হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

এছাড়া গ্রেফতার হয়েছেন হুকুমদাতা মাদরাসার অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ উদ দৌলা, আশ্রয়দাতা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিন, অর্থ জোগানদাতা পৌর কাউন্সিলর ও পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম এবং মাদরাসার শিক্ষক আবছার উদ্দিন।