মুজিবর রহমান বাবু ॥ বাংলাদেশের যুব গেমসের শুরুটা হয়েছিল আলোকোজ্জ্বল ও শেষটা হয়েছে আলোকমালায় অপরূপ সাজ নিয়ে সবাইকে স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশের যুব গেমসের সমাপনী অনুষ্ঠান বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে। বাংলাদেশ যুব গেমস ২০১৮ উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে হয়েছে যুব গেমসের সমাপনী ডিজে শো অনুষ্ঠান। সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিট। বাংলাদেশ অলিম্পিক এ্যাসোসিয়েশনের (বিওএ) ব্যবস্থাপনায় প্রথমবারের মতো আয়োজিত ‘বাংলাদেশ যুব গেমসের পর্দা নামে গত শুক্রবার।

এ উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে আয়োজিত হয় জমকালো সমাপনী অনুষ্ঠান। এদিকে গত শুক্রবার বিকেল চারটায় দর্শকদের জন্য স্টেডিয়ামের সব প্রবেশদ্বার খুলে দেয়া হয়েছিল। নিজেদের আসন গ্রহণের জন্য দর্শকরা এক ঘণ্টা ২০মিনিট সময় পান। এরপরেই বিকেল প্রায় ৫টায় শুরু হয় ডিজে শো। ৬টা ৫৫ মিনিটে স্টেডিয়ামে প্রবেশ করেন যুব গেমসের সমাপনী অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। ৬টা ৫৫ মিনিটে গেমসে অংশগ্রহণকারী আট বিভাগের এ্যাথলেটরা মার্চপাস্ট করে স্টেডিয়ামে প্রবেশ করেন। ৭টা ৯ মিনিটে নেপালে বিধ্বস্ত ইউএস বাংলার নিহত যাত্রীদের স্মরণে একমিনিট নীরবতা পালন করা হয়। ৭টা ১০ মিনিটে বাংলাদেশ যুব গেমসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে বিভিন্ন খেলাধুলার অডিও ভিজুয়াল (এভি) প্রদর্শন করা হয়। ৭টা ১৫ মিনিটে গেমসের এ্যাথলেটিক্স ডিসিপ্লিনের বালক ও বালিকাদের আকর্ষণীয় ১০০ মিটার স্প্রিন্ট শুরু হয়। এরপরই দ্রুততম মানব ও মানবীকে পুরস্কৃত করা হয়। ৭টা ৩৫ মিনিটে সমাপনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বিওএ সভাপতি ও সেনাপ্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক এসবিপি, এনডিসি, পিএসসি। এরপর যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বীরেন শিকদার বক্তব্য দেন। এরপর যুব গেমসে প্রদত্ত পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠানসমূহকে ক্রেস্ট দিয়ে সম্মাননা জানানো হয় বিওএ’র পক্ষ থেকে। ৭টা ৫৫ মিনিটে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ডিসপ্লে প্রদর্শন করা হয়। ৮টা ৩০ মিনিটে থিম সংয়ের তালে তালে মাঠ ছাড়ে যুব গেমসের মাস্কট ‘তেজস্বী’। ৮টা ৩৭ মিনিটে সমাপনী বক্তব্য প্রদান করেন অর্থমন্ত্রী। ৮টা ৪২ মিনিটে নিভে যায় যুব গেমসের প্রজ্জ্বালিত মশাল। ৮টা ৪৭ মিনিটে সমাপ্তি ঘটে প্রথম বাংলাদেশ যুব গেমসের। যার চূড়ান্তপর্ব গত ১০ মার্চ ঢাকায় শুরু হয়েছিল ২১টি ডিসিপ্লিন নিয়ে। সাধারণ দর্শকদের জন্য বিভিন্ন গ্যালারিতে ১৪ হাজার ১৯৯টি সিট বরাদ্দ রাখা হয়।

নিহতদের স্মরণ করে যুব গেমসের সমাপনী
গত ১০ মার্চ জমকালো আতশবাজির স্ফুরণে প্রথম যুব গেমসের পর্দা উঠেছিল। ছয় দিনের ব্যবধানে সমাপনী অনুষ্ঠানে উজ্জ্বলতা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে কাঠমান্ডু ট্রেজেডির কারণে। নেপালে বাংলাদেশের বিমান দুর্ঘটনায় নিহতদের স্মরণে যুব গেমসের আনন্দ উল্লাস কমিয়ে দেওয়া হয়। নিহতদের স্মরণে আতশবাজির স্ফুরণ ঘটানো হয়নি। নিহতদের স্মরণ করে সমাপনী অনুষ্ঠানে নীরবতা পালন করা হয়। শুধু সমাপনী অনুষ্ঠানই নয়, সেদিনের ঘটনার পর বিওএ গেমসের প্রত্যেকটি খেলা শুরু হওয়ার আগে এক মিনিট নীরবতা পালন করে। যুব গেমস অনূর্ধ্ব-১৭ বছরের ছেলে-মেয়েদের নিয়ে দেশজুড়ে আয়োজিত খেলাধুলার প্রথম আসর।

প্রধানমন্ত্রীর শুভ উদ্বোধন ঘোষণার পর কৃতি শ্যুটার আসিফ হোসেন খান গেমসের মশাল প্রজ্জ্বালন করেছেন। পরে গেমস মাস্কাটের মাঠ প্রদক্ষিণ শেষে মেহজাবীন ও সাবিনা ইয়াসমিনের দেশের গানের সঙ্গে মঞ্চ মাতিয়েছেন নৃত্যশিল্পীরা।
আলোকমালায় অপরূপ সাজ নিয়ে সবাইকে স্বাগত জানিয়েছেন বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম। এ আলোতে তরুণদের চোখে-মুখে আনন্দের খুশির ঝিলিক ছিল। চারদিকে কত বর্ণিল আয়োজনের মধ্য দিয়ে তারা মার্চপাস্ট করছে, সামনে বসা প্রধানমন্ত্রী অভিনন্দন জানিয়েছেন হাত নেড়ে নেড়ে। গ্রাম ও গঞ্জ থেকে আসা এক তরুণ অ্যাথলেটের জীবনে এ এক নতুন অভিজ্ঞতা। হয়তো বা অনেকেরই প্রথমবারের মতো ঢাকা আগমন করেছেন। ঐতিহাসিক স্টেডিয়ামের বুকে প্রথমবারের মতো দাঁড়িয়ে সে নিজেকে আবিষ্কার করছে নতুনভাবে। সামগ্রিক আয়োজনই হয়তো বা নতুন স্বপ্নের বীজ বুনে দিচ্ছে তার মনে। এভাবে তারুণ্যের স্বপ্ন-সারথি হতেই শেষ হয়েছে বাংলাদেশ যুব গেমস।

আয়োজক বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক উদ্বোধনী বক্তব্যে এ আয়োজনের উদ্দেশ্যের কথা বলেছেন এভাবে, ‘প্রথমবারের মতো আমরা এই যুব গেমস আয়োজন করার প্রধান লক্ষ্য তৃণমূল থেকে সম্ভাবনাময় তরুণদের চিহ্নিত করে সামগ্রিক খেলাধুলার মান বৃদ্ধি করবো। প্রতিভাবানদের লালন করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরার পাশাপাশি নতুন সংগঠক সৃষ্টি করাই আমাদের উদ্দেশ্য।’ ১৮ ডিসেম্বর থেকে শুরু প্রথমবারের মতো দেশে অনূর্ধ্ব-১৭ বছর বয়সীদের নিয়ে জেলা পর্যায়ে শেষ হয় বাংলাদেশ গেমসের আঞ্চলিক পর্ব। সেখানকার বিজয়ীরা পরের পর্ব অর্থাৎ বিভাগীয় পর্যায়ে খেলেছে জানুয়ারিতে। দুটো পর্ব শেষে বিওএর হয়েছে অম্ল-মধুর অভিজ্ঞতা।
বিওএ সভাপতি প্রতিভাবানদের ট্রেনিং দিয়ে একটা মানে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সেটা হলে খুব ভাল। ক্রীড়াঙ্গণ হবে সাফল্য আর পদকমুখী। শুধু পদকে খেলাধুলার মানে খুঁজতে চান না উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হয়ে আসা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর কাছে খেলাধুলা একটি সুন্দর জাতি গঠনেরও উপায়, ‘খেলাধুলা একজন মানুষকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। খেলাধুলার সঙ্গে থাকলে শিশু বয়স থেকেই একটি ছেলে শৃঙ্খলাবোধ, অধ্যবসায় ও দায়িত্ব-জ্ঞানসম্পন্ন, সহিষ্ণু হতে শেখে। শুধু লেখাপড়া করলেই তো হয় না, একটা জাতি গঠনে খেলাধুলা ও সংস্কৃতিচর্চা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’ সামগ্রিক বিশ্বের অস্থির সময়ে চারদিকে ছড়িয়ে আছে বিপথগামিতার নানা প্রলোভন। সেসব উপেক্ষা করে তারুণ্যকে পথে রাখার উপায় হলো খেলাধুলা। গত শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় প্রধানমন্ত্রীর শুভ উদ্বোধন ঘোষণার পর কৃতি শ্যুটার আসিফ হোসেন খান গেমসের মশাল প্রজ্জ্বালন করেছেন। এরপর গেমস মাসকাটের মাঠ প্রদক্ষিণ শেষে মেহজাবীন ও সাবিনা ইয়াসমিনের দেশের গানের সঙ্গে মঞ্চ মাতিয়েছেন নৃত্যশিল্পীরা। শেষে লেজার শোর আলো আর আতশবাজি সশব্দে এই নগরীকে দিয়ে গেল বাংলাদেশ যুব গেমস শুরুর বার্তা।

সামান্য অটোরিক্সা চালকের মেয়ের স্বর্ণ জয়
বাংলাদেশ যুব গেমসে মেয়েদের ৪৮ কেজি ওজন শ্রেণিতে স্বর্ণজয়ী নুরজাহান আক্তার বাংলাদেশ যুব গেমসে খুলনা বিভাগের হয়ে মেয়েদের ৪৮ কেজি ওজন শ্রেণিতে স্বর্ণজয়ী নুরজাহান আক্তার ময়নার বাবা পেশায় সামান্য অটোরিক্সা চালক। তাতে যে আয় হয় বাবা-মাসহ ৫ জনের সংসারে টানাটানি আছে বলে তার কথা বার্তায় মনে হলো না।বরং একজন দক্ষ ভারোত্তোলক হয়ে উঠতে প্রশিক্ষণ বাবদ যে টাকা প্রয়োজন হয় তার যোগান অটোরিক্স চালক বাবা দিয়ে যাচ্ছেন। এতে ময়নার স্বপ্নটাও হয়েছে আকাশছোঁয়া। দেশের হয়ে অলিম্পিকে লাল-সবুজের পতাকা ওড়াতে চান বাগেরহাটের এই সোনার কন্যা।