মো. আলম হোসেন॥ সংবাদপত্র জগতে হলুদ সাংবাদিকতা শব্দটি এসেছে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে। হলুদ সাংবাদিকতার একটি মজার ইতিহাস রয়েছে। সেই সময়ের দুই বিশ্ববিখ্যাত সাংবাদিকের নাম জড়িয়ে আছে এ ইতিহাসের সঙ্গে। জোসেফ পুলিৎজার এবং উইলিয়াম রুডলফ হার্স্টে লিপ্ত হন এক অশুভ প্রতিযোগিতায়। জোসেফ পুলিৎজার একটি পত্রিকা ক্রয় করলেন ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে। পত্রিকাটির নাম নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ড। ওই পত্রিকাটির মালিক ছিলেন জে গোল্ড। ক্রমাগত লোকসানের বোঝা বইতে না পেরে তিনি পত্রিকাটি জোসেফ পুলিৎজারের কাছে বিক্রি করে দেন। ওদিকে উইলিয়াম হার্স্ট ১৮৮২ সালে ‘দ্য জার্নাল’ নামে একটা পত্রিকা কিনে নেন জোসেফ পুলিৎজারের ভাই অ্যালবার্ট পুলিৎজারের কাছ থেকে। তার পরিবারের সদস্যের পত্রিকা হার্স্টের হাতে চলে যাওয়ার বিষয়টিকে সহজভাবে নিতে পারেননি পুলিৎজার। তার সঙ্গে দ্বন্দ শুরু হয়। পুলিৎজার নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ড ক্রয় করেই ঝুঁকে পড়লেন কিছু কেলেঙ্কারির খবর, চাঞ্চল্যকর খবর, চটকদারি খবর ইত্যাদির দিকে। তিনি একজন রিচার্ড ফেন্টো আউটকল্ট নামে কার্টুনিস্টকে চাকরি দিলেন তার কাগজে। ওই কার্টুনিস্ট ‘ইয়েলো কিড’ বা ‘হলুদ বালক’ নামে প্রতিদিন নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ডের প্রথম পাতায় একটি কার্টুন আঁকতেন এবং তার মাধ্যমে সামাজিক অসংগতি থেকে শুরু করে এমন অনেক কিছু বলিয়ে নিতেন, যা একদিকে যেমন চাঞ্চল্যকর হতো, অন্যদিকে তেমনি প্রতিপক্ষকে তির্যকভাবে ঘায়েল করত। জার্নাল এবং নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ডের বিরোধ সে সময়কার সংবাদপত্র পাঠক মহলে ব্যাপক আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছিল।

এক সময় হার্স্ট পুলিৎজারের কার্টুনিস্ট রিচার্ড ফেন্টো আউটকল্টকে ভাগিয়ে নিলেন তার ‘জার্নাল’ পত্রিকায়। শুধু তাই নয়, মোটা অঙ্কের টাকা-পয়সা দিয়ে পুলিৎজারের নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ডের ভালো সব সাংবাদিককেও টেনে নিলেন নিজের পত্রিকায়। ওদিকে পুলিৎজার তার পত্রিকায় জর্জ চি লুকস নামে আরেক কার্টুনিস্টকে দিয়ে ‘ইয়েলো কিড’ চালাতে শুরু করলেন দু’জনই পত্রিকার কাটতি বাড়ানোর জন্য স্ক্যান্ডাল কেলেংকারি চমকপ্রদ ভিত্তিহীন খবর ছাপা শুরু করলেন প্রতিযোগিতামূলক ভাবে। এভাবেই জোসেফ পুলিৎজার এবং উইলিয়াম হার্স্ট দু’জনেই “হলুদ সাংবাদিকতা‘র দায়ে অভিযুক্ত এবং ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে রইলেন। পেশাগত প্রতিযোগিতায় নেমে দুই সম্পাদক তাদের নিজ নিজ পত্রিকার ব্যবসায়িক স্বার্থে একে অপরের দিকে কাঁদা ছোঁড়াছুড়ি করেছিলেন। ঠিক তখনি বিশ্ব মিডিয়ায় উঠে আসে হলুদ সাংবাদিকতার নাম। সেই হলুদ রং আর হলুদ নেই, তার উপর ভিন্ন ভিন্ন রংয়ের স্তর জমে রং বদলে গেছে। সাংবাদিকতা হলুদ কিংবা লাল নয়।

এই ছোট দেশটিতে সংবাদপত্র ও সংবাদপত্র কর্মী যে হারে বাড়ছে তা কতটুক সুখকর এই প্রশ্নটিকে বার বার এড়িয়ে যাই। যে কারণেই হোক, যে উদ্দেশ্যেই হোক সংবাদপত্র ও সংবাদ কর্মীরা বাংলাদেশ নামক এই দেশটিকে অনেক অংশে শান্তিময় করে রেখেছে। পৃথিবীর সব ক্ষমতাসীনরা কমবেশি মিথ্যা বলে। আড়ালে রাখতে চায় সত্য। জনগণের কাছ থেকে কিছু না কিছু লুকোতে চায়, আর সাংবাদিকতার কাজ হচ্ছে সেই আড়ালে রাখা সত্য আর লুকোনো বিষয়কে বের করে জনসমক্ষে প্রকাশ করা। প্রিন্ট সংবাদ পত্র ও অনলাইন ভিত্তিক সংবাদপত্র বাড়ছে বলেই শিক্ষিত বেকাররা ঝুঁকে পড়ছে এ পেশায়। যখন কিছুই করার সুযোগ আসে না তখন শেষ অবলম্বন হিসেবে সাংবাদিকগতা পেশা বেচে নেয়। এর মধ্যে কিছু ভালো সাংবাদিক তৈরি হলেও অনেকেই সৃষ্টিশীলতার ধারের কাছেও নেই। একটি আইডি কার্ড হাতে নিয়ে অপ-সাংবাদিকতা করে নিজেকে জাহির করেন। তবে এখনো বাংলাদেশে সৎ সংবাদপত্র কর্মীদের সংখ্যাই বেশী। সামান্য অসৎ কর্মীও আছে। এটা থাকবে। এড়িয়ে যাবার কোন পথ নেই।

রাজধানীসহ বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নীতিমালা না মেনে প্রতিনিয়ত ব্যাঙের ছাতার মতো নামে-বেনামে নতুন নতুন মিডিয়া আত্মপ্রকাশ করছে। এখন গণমাধ্যমে কাজ করা মামার বাড়ির আবদারের মতো হয়ে গেছে, যেন চাইলেই সাংবাদিক হওয়া যায়। শিক্ষাগত যোগ্যতা থেকে শুরু করে কোনো যোগ্যতারই প্রয়োজন পড়ে না। শুধু কর্তৃপক্ষের পকেট ভরাতে পারলেই হয়। সকালে যোগাযোগ করলে বিকেলেই পত্রিকা বা নিউজ পোর্টালের পরিচয়পত্র প্রস্তুত। তারপর গলায় ঝুলিয়ে অফিসপাড়ায় আনাগোনা শুরু করে দিলেই সাংবাদিক বনে যাওয়া যায়।

শুধুমাত্র স্থানীয় পত্রিকাই নয় কিছু কিছু জাতীয় পত্রিকারও একই হাল। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে জাতীয় দৈনিকগুলোর পাশাপাশি স্থানীয় পত্রিকার সাংবাদিক রয়েছে। দেশে প্রকৃত সাংবাদিকের সংখ্যা ও পত্রপত্রিকার সংখ্যা কত তা হয়তো কারো জানা নেই। পেশাদারিত্বের চেয়ে সাংবাদিকতার আড়ালে টু পাইস কামানোর জন্য সাংবাদিকতায় আসার প্রবণতা এখন বেশি দেখা যাচ্ছে। সাংবাদিকতা পেশা ছাড়া অন্য কোনো পেশা নেই এবং সংশ্লিষ্ট পত্রিকা অফিস থেকে কোনো প্রকার বেতন-ভাতাদি না পেয়েও অনেক সাংবাদিক সচ্ছল জীবনযাপন করেন। অনেকেই অল্প দিনেই বাড়ি-গাড়ির মালিক হয়ে যান। এটা কি করে সম্ভব তা সহজেই বুঝা যায়। ফলে সমাজ ব্যবস্থায় প্রশ্নবিদ্ধ হতে হয় প্রকৃত সাংবাদিকদের। চক্ষুলজ্জায় সামনে কেউ কিছু না বললেও অন্তরালে নানামুখী সমালোচনা আর ধিক্কার দেন গোটা সাংবাদিক সমাজকে।

আমরা সাংবাদিকরা সরল পথটি ছেড়ে কেন কঠিন পথে হাঁটছি। কেন বাড়াচ্ছি এক অপরের সাথে তিক্ততা? মনক্ষুন্ন হয়ে উঠার প্রশ্নটি আসবে কেন? সাংবাদিকতার মৌল তিন নীতি, সততা, বস্তুনিষ্ঠতা এবং নিরপেক্ষতা থেকে সাংবাদিকরা আজ সরে গিয়ে স্বার্থসংশ্লিষ্ট হয়ে পড়েছে? তাহলে আমরা কি হলুদ কিংবা লাল রংয়ের সাংবাদিকতার বৃত্ত ভেঙ্গে সবুজ সাংবাদিকতার দিকে পা বাড়াবো না? আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বিভেদ মুক্ত সামাজিক সাংবাদিকতার পথ প্রশস্ত করে যাব না?