রাজবাড়ী প্রতিনিধি::

বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজবাড়ীর ৫টি উপজেলার প্রায় সবগুলি উপজেলাতেই প্রতিটি স্তরসহ সড়ক বিভাগে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়েছে। রাজবাড়ী টু বালিয়াকান্দি, বালিয়াকান্দি থেকে জামালপুর হয়ে মধুখালী এবং বালিয়াকান্দি থেকে সোনাপুর সড়কই বলে দেয় সেটি। তাছাড়াও গ্রামের অধিকাংশ সড়কই পাকা।

আর উপজেলা পরিষদের ভিতর তো আছেই, যার দৃশ্যমান উপজেলা পরিষদ ভবন, পরিষদ চত্বরে পানির ফোয়ারা, লাল, নীল, সবুজ বাতি, ফুলের বাগান। কিন্তু এই রঙিন বাতি, পানির ফোয়ারা আর পরিচ্ছন্ন উপজেলা পরিষদ উপজেলার সাধারণ মানুষের কাছে কতটুকু উন্নয়নের বার্তা দিচ্ছে সেটিই ভাববার বিষয়!

বালিয়াকান্দি উপজেলাবাসীর মধ্যে বর্তমান সরকারের বিগত ১০ বছরের উন্নয়নকে ঢেকে দিচ্ছে বালিয়াকান্দি শহর কেন্দ্রিক প্রধান সড়ক এবং বালিয়াকান্দি-নারুয়া, ওয়াপদা-মধুখালী সড়কের বেহাল দশার ফলে। দিন দিন সাধারণ মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে ক্ষোভ যার দিকে কোন নজর নেই জনপ্রতিনিধিদের। সড়ক গুলোর এমন বেহাল দশা কয়েক বছর অতিবাহিত হলেও মেরাত বা নতুন করে সড়ক নির্মানে নেওয়া হয়নি কোন উদ্যোগ। জনগুরুত্বপূর্ণ এই সড়ক গুলোর সমস্যা সমাধানে আর কত বছর অপেক্ষা করতে হবে সেটিই দেখার বিষয়। সড়কে চলাচলরত সাধারণ মানুষের এমন দুর্ভোগ যেন দেখার কেউ নেই।

দিন যাচ্ছে, মাস যাচ্ছে, বদল হচ্ছে ঋতু কিন্তু দুর্ভোগ শেষ হচ্ছে না সড়কে যাতায়াতকারী মানুষের, চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে এসব সড়কের পাশে বিভিন্ন ব্যাবসায়ীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন বালিয়াকান্দি শহরের মানুষ গুলো তো আর মানুষ নয় আমাদের রাস্তা থাকলেই কি আর না থাকলেই কি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন খুব শীঘ্রই এর আশু সমাধান হবে।

সরেজমিনে বালিয়াকান্দি সদরের রাস্তা গুলোতে গিয়ে দেখা যায়, বালিয়াকান্দি হাসপাতাল থেকে চৌরাস্তা হয়ে বাজারের মধ্যে দিয়ে যাওয়া সোনাপুর সড়কটি খুবই ভাল। সম্প্রতি থানা রোড পাকাকরণ করা হয়েছে। বালিয়াকান্দি স্টেডিয়াম মাঠ থেকে সাধু মোল্যার মোড়, সাধু মোল্যার মোড় থেকে ওয়াপদা মোড়, ওয়াপদা মোড় থেকে তালপট্টি, বালিয়াকান্দি চৌরাস্তা থেকে ঘিকমলা প্রায় ১৪ কি.মি., বালিয়াকান্দি থানা গেট থেকে চন্দনা ব্রিজের সড়কের অধিকাংশ জায়গাতে ভাঙ্গাচোড়া সড়কে ধুলো বালির প্রলেপ সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা আর শুকনো মৌসুমে যানবাহন চলার সময় ধুলাবালিতে একাকার হয়ে যাচ্ছে। সড়কের পাশের বাড়ীগুলোতে ধুলোর আস্তরন পড়ে রয়েছে। এসময় কয়েকটি জায়গাতে ব্যক্তি উদ্যোগে সড়কে ধুলুবালির হাত থেকে বাচঁতে নিজেরাই পানি দিচ্ছেন।

২৪ ঘন্টা সড়কে পর্যবেক্ষন করে দেখা যায়, শুধুমাত্র ওয়াপদা-মধুখালী সড়কেই বৈধ-অবৈধ ট্রাক, ড্রামট্রাক, ইট ভাটার গাড়ী মিলিয়ে ২ শতাধিক যানবাহন চলাচল করে। এর মধ্যে ২০% ট্রাকই ১০ টনের উপরে। যা গ্রামীন সড়কে চলাচলে নিষেধ রয়েছে।

একাধিক পথচারী জানান, সম্প্রতি ড্রামট্রাক ও ভারী যানবাহন চলাচল বৃদ্ধি পেয়েছে আর ইটভাটার ট্রাক তো সব সময় আছেই, যখন যানবাহন গুলো সড়কে চলে তখন ধুলাবালিতে একাকার হয়ে যায়, দম বন্ধ হয়ে আসে। অসুস্থ কোন মানুষ এ সড়ক দিয়ে যানবাহনে আসা যাওয়া করলে সে আরো বেশি অসুস্থ্য হয়ে যাচ্ছে। ট্রাক বা যে কোন বাহনবাহন সড়ক দিয়ে চললেই সৃষ্টি হচ্ছে ধুলার ঘূর্ণি পাক, ওই সময় নি:শ^াস নিতেই কষ্ট হয় তাদের। এসময় তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বছরের পর বছর এভাবে সড়কের বেহালদশা থাকলেও যেন দেখার কেউ নেই।

কয়েকজন যানবাহন চালক জানান, শুধু মাত্র বালিয়াকান্দি চৌরাস্তা থেকে হাসপাতাল ও তালপট্টি সড়কটি ভালো। বালিয়াকান্দি সদরের চারপাশের সড়কগুলোতে ছোট বড় গর্তের পরিমাণ বেড়ে গেছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতে কাঁদা ও শুকনো মৌসুমে ধুলোবালিতে চরম দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে। এছাড়া সড়কে গর্তের ফলে প্রতিনিয়তই তাদের যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, নষ্ট হয়ে যাচ্ছে দামি যন্ত্রাংশ।

বালিয়াকান্দি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো: কারিম শেখ জানায়, বাসা থেকে বের হয়ে বিদ্যালয়ে আসতে শরীরে ধুলাবালিতে একাকার হয়ে যেতে হয়। নাকের মধ্যে ধুলিকণা গিয়ে দম নিতেও কষ্ট হয়।

নারুয়া থেকে বালিয়াকান্দি আসা সাবিনা নামে এক যাত্রী বলেন, নারুয়া থেকে বালিয়াকান্দির যাতায়াতের সড়কটি দীর্ঘদিন যাবত এমন ভাঙাচুরা রয়েছে। এতে করে যে কোন ধরনের যানবাহনে বালিয়াকান্দি যাতায়াতে চরম দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে, দ্রুত সড়কটি মেরামতের দাবী জানাচ্ছি।

পত্রিকা বিক্রেতা ভরত বলেন, প্রতিদিন দোকান থেকে পত্রিকা নিয়ে বিভিন্ন অফিস ও বাসাবাড়ি পৌঁছে দিই। বালিয়াকান্দি সদরের অধিকাংশ সড়কের খানা খন্দকের ফলে বর্ষাকালে কাঁদাপানি আর শুকনা মৌসুমী ধুলোবালিতে বড্ড অসহায় হয়ে পড়ছি। এসময় তিনি দ্রুত সড়কগুলো সংস্কারের দাবী করেন।

বালিয়াকান্দি বাজারের নারুয়া রোড কাপড় ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাক জানান, দোকানের সামনের সড়কে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছিল। ব্যক্তি উদ্যোগে আমরা বাজার ব্যবসায়ীগণ নিজেরা চাঁদা তুলে গর্ত ভরাট করেছি। বৃষ্টি কিংবা রোদ সবই আমাদের দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব সড়কগুলো মেরামতের দাবি জানান তিনি।

তালপট্টি বাজারের মাসুদ রানা একজন ব্যাবসায়ী মালিক বলেন, মাদ্রাসা সড়কের বেহাল দশার কারণে আমাদের দোকানে কাস্টমার আসতে চাই না। বেচা বিক্রিও কমে যাচ্ছে দিনদিন। ছোট বড় যানবাহন চলার সময় ধুলোবালিতে একাকার হয়ে যায় আবার সামান্য বৃষ্টিতে দোকানের সামনে কেউ দাঁড়াতে পারে না, কাদার জন্য। লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যবসায় পুঁজি খাটিয়ে সামান্য রাস্তার জন্য বেচা বিক্রি হচ্ছে না। দ্রুত সমাধানের দাবি জানাচ্ছি।

বালিয়াকান্দি বাজার ব্যবসায়ী আলেক মৃধা জানান, আমি আমার পরিবার নিয়ে বালিয়াকান্দির তালপট্টিতে দ্বিতীয় তলায় বসবাস করছি। সড়কের বেহালদশার ফলে সামান্য যানবাহন চলাচলের সময় যে পরিমাণ ধুলোবালির সৃষ্টি হয় তাতে করে সন্তানদের নিয়ে দু:চিন্তায় আছি, ধুলোবালিতে শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি হচ্ছে। আশা করছি খুব শীঘ্রই সড়কগুলো সংস্কার করা হবে।

বালিয়াকান্দি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রভাষক মো: সাইফুল ইসলাম বলেন, ধুলার বালিয়াকান্দি শহর আর কত দিন, বালিয়াকান্দি ভায়া নারুয়া সড়কের অবস্থা খুবই খারাপ, ওয়াপদা ভায়া মধুখালী সড়কের চিত্র দেখলে মনে হয় এটি কোন প্রাচীন গ্রামের রাস্তা। সড়কের পাশে দ্বিতল ভবনেও বসবাস করা দায় হয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্টরা খুব শীঘ্রই এর সমাধান করবে বলে আশা করছি।

বালিয়াকান্দি ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের একাধিক ব্যক্তি জানান, অফিস থেকে ভাল সড়ক হওয়ায় জামালপুর এলাকায় যেতে যে পরিমাণ সময় লাগে অথচ সড়কের বেহালদশার কারণে একই দুরত্বের নারুয়া যেতে তার থেকে দ্বিগুন সময় লাগছে। এর ফলে নারুয়া এলাকায় কোন দুর্ঘটনা ঘটলে ক্ষতির পরিমাণও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বালিয়াকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্য ও প: প: কর্মকর্তা ডা: আব্দুল্লাহ আল মুরাদ বলেন, সড়কের ধুলাবালি এক ধরনের ডাস্ট এটি সববয়সের মানুষের জন্য খুবই ক্ষতিকর। ধুলাবালির সাথে বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত ও রোগ জীবানু মানুষের ফুসফুসে প্রবেশ করে ফুসফুসের কার্যক্ষমতাকে হ্রাস করে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছে শিশু ও বৃদ্ধারা। ফিল্ড পর্যায়ে কাজ এসময় তিনি দ্রুত বালিয়াকান্দি সদর ও বালিয়াকান্দি-নারুয়া সড়ক মেরামতের জন্য উর্দ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

বালিয়াকান্দি উপজেলা প্রকৌশলী সজল কুমার দত্ত বলেন, বালিয়াকান্দি থেকে নারুয়া এবং বালিয়াকান্দির ওয়াপদা থেকে মধুখালী সড়ক দীর্ঘদিন খানাখন্দক সৃষ্টি হওয়ায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সড়কে যাতায়াতকারীদের। আরসিআইপি নামে একটি প্রকল্পে সড়কগুলো অর্ন্তভুক্ত হয়েছে আসা করছি দ্রুত সড়কগুলো মেরামতের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, সড়কগুলো প্রকল্প ভুক্ত হয়েছে। তালপট্টি-ওয়াপদা হয়ে মধুখালী সড়ক, চৌরাস্তা থেকে নারুয়াসহ সদরের খানাখন্দক সৃষ্টি হওয়া সড়কগুলোর জুন মাসের মধ্যেই টেন্ডার সম্পন্ন হবে। আশা করছি খুব শীঘ্রই সড়কে চলাচলকারী সবার দুর্ভোগ লাঘব হবে।

রাজবাড়ীর নির্বাহী প্রকৌশলী খান এ শামীম বলেন, ‘বালিয়াকান্দি সদর কেন্দ্রিক সড়ক এবং বালিয়াকান্দি থেকে নারুয়া, ওয়াপদা- মধুখালী সড়কের অবস্থা খুবই খারাপ। এই রাস্তায় গেলে আমার নিজেরও মাজা ভেঙ্গে যাওয়ারমত অবস্থা হয়। সড়কগুলো আরসিআইপি প্রকল্পভুক্ত হয়েছে। ইতোমধ্যে সড়কগুলোর ষ্টেটিমেট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে, এখনো আমরা টেন্ডার করার অনুমতি পাইনি। আশা করছি খুব শীঘ্রই আমরা টেন্ডারে অনুমতি পাব, এরপরই সড়কের দৃশ্যমান উন্নয়ন ঘটাতো পারবো।