বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ডেস্ক রিপোর্ট: আইফোনের পেটেন্ট নিয়ে অ্যাপল ও স্যামসাংয়ের মধ্যে সাত বছরের দ্বন্দ্বের অবসান ঘটেছে। গতকাল বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালতে সমঝোতার কথা বলেছে দুটি প্রতিষ্ঠান। নিজেদের মধ্যে অপ্রকাশিত অর্থের বিনিময়ে ওই মামলার সমঝোতা করার কথা বলা হয়েছে।

সাত বছর আগে আইফোনের নকশা নকলের অভিযোগে দায়ের করা মামলার রায়ে গত মাসে স্যামসাংকে দোষী সাব্যস্ত করেন ফেডারেল আদালতের বিচারক। একই সঙ্গে ক্ষতিপূরণ হিসেবে অ্যাপলকে ৫৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর প্রযুক্তিবিশ্বের দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমঝোতার খবর এল।

অর্ধযুগের বেশি সময় ধরে চলা এ মামলার রায়কে অ্যাপল বড় ধরনের জয় মনে করছে। কারণ, প্রতিষ্ঠানটি বরাবরই আদালতে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে এসেছে যে অনন্য নকশা আইফোনে সাফল্যের অন্যতম হাতিয়ার।

আদালতে তারা যুক্তি দিয়ে অ্যাপল কর্তৃপক্ষ বলেছিল, আইফোনের গুরুত্বপূর্ণ নকশার পেটেন্ট ভেঙেছিল স্যামসাং।

২০১১ সাল থেকে অ্যাপল ও স্যামসাং ওই মামলা নিয়ে লড়ছিল। অবশেষে সমঝোতায় এলেও আর্থিক বিষয়টি প্রকাশ করা হয়নি।

ইউএস ডিসট্রিক্ট কোর্টের বিচারক লুসি কোহ বলেছেন, দুই পক্ষই যেহেতু মামলার বিষয়টি সমঝোতা করে ফেলেছে, তাই এ মামলাসংক্রান্ত সব দাবি খারিজ করা হয়েছে।

বার্তা সংস্থা এএফপিকে অ্যাপলের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মামলাটি অর্থের চেয়ে বেশি কিছু ছিল। অ্যাপলের অনেক কর্মীর কঠোর পরিশ্রমের উদ্ভাবন সুরক্ষার জন্য এটি প্রয়োজন ছিল।

বিবৃতিতে অ্যাপল জানায়, তারা অনেক দিন ধরে চলা এ মামলার রায়ে অত্যন্ত খুশি। কারণ, তারা বিচারকদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছে, প্রতিদ্বন্দ্বী স্যামসাং অ্যাপল পণ্যের নকশা, পেটেন্ট করা ফাংশন নকল করেছে। এ মামলার ক্ষেত্রে অর্থ কখনো মুখ্য বিষয় ছিল না। মামলার রায় তাদের জন্য আর্থিক ক্ষতিপূরণের চেয়ে বেশি কিছু। অ্যাপল শুরু থেকেই উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। সৃজনশীল উদ্ভাবনের কারণে একমাত্র স্মার্টফোন ব্র্যান্ড আইফোন দিয়ে বাজারে আধিপত্য ধরে রাখতে সমর্থ হয়েছে। গ্রাহক চাহিদা অনুযায়ী, পণ্যের নকশা এবং প্রয়োজনীয় ফিচার ও ফাংশন উন্নয়নে অ্যাপলের একদল পরিশ্রমী কর্মী নিরন্তর কাজ করছেন। অ্যাপল পণ্যের নকশা, ফিচার এবং এর পেছনের মানুষগুলোর সৃজনশীলতার মূল্যায়নে পেটেন্ট মামলাটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

এএফপির প্রতিবেদনে জানানো হয়, অ্যাপল ও স্যামসাংয়ের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই পেটেন্টবিষয়ক আইনি লড়াই চলছিল। ২০১১ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার একটি আদালতে দক্ষিণ কোরিয়াভিত্তিক স্যামসাংয়ের বিরুদ্ধে পেটেন্ট লঙ্ঘনের মামলা করেছিল মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যাপল। ওই মামলায় স্যামসাংয়ের বিরুদ্ধে আইফোন ডিভাইসের পাঁচটি পেটেন্ট, নকশা ও ট্রেডমার্ক নীতি লঙ্ঘনের অভিযোগ করা হয়।

২০১২ সালের এক রায়ে আদালত ক্ষতিপূরণ হিসেবে অ্যাপলকে ১০৫ কোটি ডলার পরিশোধের নির্দেশ দেন স্যামসাংকে। ওই রায়ের পর ক্ষতিপূরণের পরিমাণ কমাতে আপিল করে স্যামসাং। পরবর্তী সময়ে আপিলের রায়ে বিচারক লুসি কোহ ক্ষতিপূরণের পরিমাণ কমিয়ে নির্ধারণ করেন। তারপরও নিষ্পত্তি হয়নি মামলাটির। পুনরায় নির্ধারিত জরিমানার পরিমাণ কীভাবে গণনা করা হয়েছে, তা নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। জরিমানার অর্থ কমানো বিষয়ে অ্যাপলের আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত রুল জারি করলে তা নিয়ে আবারও একটি শুনানির প্রয়োজন দেখা দেয়।

স্যামসাং পেটেন্ট লঙ্ঘনের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ২ কোটি ৮০ লাখ ডলার পরিশোধে আগ্রহী ছিল। সপক্ষে উপস্থাপিত যুক্তিতর্কে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, একটি নকশা পেটেন্ট বা পেটেন্ট করা ফাংশন নকল হওয়ার কারণে কোনো একটি পণ্য বিক্রি থেকে মুনাফার পুরো অর্থ জরিমানা করা যেতে পারে না। মোবাইল ডিভাইস, বিশেষ করে স্মার্টফোনে বিভিন্ন ধরনের অনুষঙ্গ থাকে। বিশেষ কোনো একটি অনুষঙ্গের ক্ষেত্রে পেটেন্ট লঙ্ঘন করা হলে জরিমানার অর্থ ওই অনুষঙ্গ থেকে মুনাফার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা যেতে পারে। কিন্তু সে অনুষঙ্গ যে পণ্যে ব্যবহার করা হয়েছে, সে পণ্য বিক্রি থেকে মুনাফার ওপর ভিত্তি করে জরিমানা করা ঠিক নয়।

এর আগে স্যামসাংয়ের এমন দাবির মুখে উচ্চ আদালতের বিচারক চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না করেই মামলাটি ক্যালিফোর্নিয়ার একটি নিম্ন আদালতে স্থানান্তর করেন। অন্যদিকে, অ্যাপল যে বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দাবি করে, তা একটি আইফোন মডেল থেকে আয়ের ওপর ভিত্তি করে গণনা করা হয়।

সমঝোতা বিষয়ে স্যামসাং কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।