বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ডেস্ক:: রাজধানীর ফার্মগেটের ব্যস্ত রাস্তা। সাঁ-সাঁ করে ছুটে চলেছে গাড়ি। পাশের ফুটপাত ধরে ব্যস্ত নগরবাসীর হেঁটে চলা। আর সেই ফুটপাতের পাশেই একটি অস্থায়ী বইয়ের দোকান, যেখানে থরে থরে সাজানো বিভিন্ন ধরনের বই। আছেন বিক্রেতাও, কিন্তু সেখানে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়েও তেমন একটা ক্রেতার উপস্থিতি চোখে পড়ল না।

বইয়ের দোকানটির দিকে আরেকটু এগিয়ে যেতেই চোখে পড়ল অন্য স্বাভাবিক বইয়ের দোকানের চেয়ে কিছুটা আলাদা ধরনের এই দোকান। বিশেষ ধরনের বইগুলো পাওয়া যায় এই দোকানে। দোকানটিতে থরে থরে সাজানো বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘কথায় কথায় ইংরেজি শিখুন, ভালো ছাত্র হওয়ার সহজ উপায়, ডায়াবেটিস রোগীরা কী খাবেন, গণিতের সূত্রাবলি, ধাঁধাঁর আসর, ওজন কমানোর জন্য আপনাকে যা করতে হবে, ৩০ দিনে সিঙ্গাপুরের ভাষা শিখুন, মোটর ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং প্রাপ্তি, ৩০ দিনে ফ্রান্স, সৌদি আরব, কুয়েত, ওমানের ভাষা শিখুন, বক্তৃতা ও বিতর্ক শিখবেন কিভাবে, এমন নানা বই সাজানো আছে ফুটপাতের এই অস্থায়ী দোকানটিতে।

দীর্ঘদিন ধরে এইসব বই বিক্রির সঙ্গে জড়িত মোবারক মিয়ার সঙ্গে আলাপ হয় এই ব্যবসার বর্তমান অবস্থা নিয়ে। আলাপকালে তিনি বলেন, এক সময় ব্যাপক ব্যবসা করেছি কিন্তু বর্তমানে একেবারে দুরবস্থা। সারাদিনে অল্প সংখ্যক বই-ও বিক্রি হয় না। প্রায় হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম এই ধরনের বইয়ের ব্যবসা। তিনি জানালেন, এ ব্যবসার এমন খারাপ অবস্থা দেখে টিকে থাকার জন্য এসব বইয়ের পাশাপাশি মোবাইলে রিচার্জ, পান, সিগারেট নানা কিছু ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত করেছি। অনেক আগে থেকে বইয়ের ব্যবসা করায় মায়ায় ছাড়তে পারিনি এ পেশা। তাই প্রতিদিন এসে দোকানে এসব বই সাজিয়ে রাখি, কিন্তু বিক্রি আর আগের মতো হয় না। তাই নতুন করে আর এমন বই না কিনে, দোকানে ভিন্ন মাল তুলে ব্যবসা করে টিকে আছি বর্তমানে।

ব্যবসায় মন্দাভাবের কারণ সম্পর্কে মোবারক মিয়া বলেন, এসব বিশেষ ধরনের বইয়ের সব কিছু এখন ইন্টারনেট বা অ্যাপসের মাধ্যমেই পাওয়া যায়। বর্তমানে সবার কাছে স্মার্ট ফোন আছে, তারা সবাই ইন্টারনেট-অ্যাপস ব্যবহার করে। যে কারণে বাজার থেকে টাকা খরচ করে মানুষ আর বিশেষ ধরনের এসব বই কিনে না। তারা ইন্টারনেটে অথবা অ্যাপসেই এসব পেয়ে যায়।

রাজধানীর নীলক্ষেত, পল্টন, মিরপুর ১০ নম্বরে অবস্থিত এসব বিশেষ ধরনের বই বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলেও মোবারক মিয়ার কথার মিল পাওয়া গেল। তারাও বলছেন, ইন্টারনেটে অথবা অ্যাপসেই এসব বই বর্তমানে পর্যাপ্ত পাওয়া যায়। এ কারণে তাদের ব্যবসা আর আগের মতো নেই। অনেকেই ব্যবসা ছেড়েছেন নতুবা দীর্ঘদিনের ব্যবসা একেবারে ছেড়ে না দিয়ে পাশাপাশি অন্য কিছু করছেন। তারা বলেন, বর্তমানে যে অবস্থা তাতে ব্যবসা ছেড়ে দেয়া ছাড়া উপায় নেই।

মোবারক মিয়ার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে বইগুলো দেখছিলেন পথচারী তোফাজ্জল হোসেন। তিনি রংপুরের একটি কলেজ থেকে পড়ালেখা শেষ করে ঢাকায় এসেছেন চাকরির আশায়, থাকছেন মেসে। ফুটপাত দিয়ে যাওয়ার সময় দাঁড়িয়ে বইগুলো দেখছেন। আলাপ হয় তার সঙ্গে। তিনিও বললেন একই কথা। তিনি জানান, আমরা আগে এ ধরনের বই কিনে পড়তাম। ৩০ দিনেই ইংরেজি শিখুন, একাই শিখুন কম্পিউটার, ওজন কমাবেন যেভাবে এই ধরনের অনেক বই আগে কিনেছি। কিন্তু বর্তমানে বেশির ভাগ মানুষই ইন্টারনেট ব্যবহার করে। যে কারণে এই ধরনের বিশেষ বই বিক্রি আগের চেয়ে কমে যাবে এটাই স্বাভাবিক। আমিই যেমন আগে এসব বই কিনতাম কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে তো আর কিনব না। কারণ ইন্টারনেটেই পেয়ে যাব এসব।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) প্রকাশিত গত নভেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সক্রিয় মোবাইল ফোন সংযোগের সংখ্যা ১৪ কোটি ছাড়িয়েছে। মোবাইল ফোনের সক্রিয় সংযোগ বা সিমের সংখ্যা ১৪ কোটি সাত লাখ। এ সময়ে মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা সাত কোটি ৯২ লাখ। সচেতনরা বলছেন, প্রযুক্তির ব্যবহার এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। প্রযুক্তিকে মানুষ গ্রহণ করবে এটাই স্বাভাবিক। প্রযুক্তির কারণে পুরাতন অনেক কিছু হারিয়ে যাবে আবার নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে এটাই নিয়ম।