জিন্নাতুল ইসলাম জিন্না, লালমনিরহাট প্রতিনিধি::

কাগজ কলমে ৭৭ জন শিক্ষার্থী থাকলেও বাস্তবে লালমনিরহাটের নারিকেল বাড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে লাকড়ি (জ্বালানী) ঘরে পরিনত হয়েছে। বিদ্যালয়ের সাইনবোর্ড সাটিয়ে জমি দখল করাই মুল উদ্দেশ্য। বিনামুল্যের বইসহ সরকারী সকল সুবিধা নিয়ে প্রতারনা করার দায়ে বিদ্যালয়টির কর্তৃপক্ষকে শোকজ করেছে প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ।

বুধবার (৬ মার্চ) বিকেলে প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার রমজান আলী বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বরাবর শোকজ পত্রটি পাঠান।

প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ ও স্থানীয়রা জানান, লালমনিরহাট সদর উপজেলার বড়বাড়ি ইউনিয়নের বলিরাম গ্রামে ১৯৯০ সালে নারিকেল বাড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। কিছু দিন ভাল ভাবে পাঠদান চললেও পাশে আরো তিনটি বিদ্যালয় থাকায় বিগত এক যুগ ধরে পাঠদান বন্ধ হয়ে পড়ে। এরপর প্রতিষ্ঠাতাকালিন সহকারী শিক্ষক স্থানীয় বিএনপি নেতা সেকেন্দার আলী কৌশলে বিদ্যালয়ের নামে দান করা ৩৪ শতাংশ জমি বিক্রি করেন। যার মুল উদ্দেশ্যই ছিল বিদ্যালয়ের নাম ভাঙগিয়ে জমি দখল করা। পরবর্তিতে আবারও একটি জখলের জন্য ২০০৮ সালের দিকে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা মোজাম্মেল হকের ৩০ শতাংশ জমি জবর দখল করে সেখানে বিদ্যালয়টি প্রতিস্থাপন করে নিজেই সভাপতির পদ দখলে নেন। প্রধান শিক্ষকসহ দুই ছেলে ও এক পুত্রবধুকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেন। শুরু থেকে কাগজ কলমে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থীর অবস্থান ও পাঠদান দেখানো হলেও বর্তমানে বিদ্যালয়টি বাস্তবে গুদাম ঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

এ দিকে নিজের জমি ফিরে পেতে জমির প্রকৃত মালিক মুক্তিযোদ্ধা মোজাম্মেল হকের দায়ের করা মামলায় আদালতে রায় পেলেও তাকে জমি ফিরে দেননি এ ভুমি দস্যু সেকেন্দার আলী। বিদ্যালয়টির বারান্দা থেকে পুরো মাঠে সবজি চাষাবাদ করে নিজের দখলে রেখেছেন বিদ্যালয়ের সভাপতি সেকেন্দার আলী। স্থানীয়দের অভিযোগে সম্প্রতি বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করে সেখানে পাঠদানের কোন আলামত না পেয়ে সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারকে বিদ্যালয়টির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন জেলা প্রশাসক মো. শফিউল আরিফ। যার ফলশ্রুতিতে বিদ্যালয়টির সভাপতি ও প্রধান শিক্ষককে শোকজ করে পত্র পাঠান সদর উপজেলা প্রাথমিক অফিসার রমজান আলী।

সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সুত্রে জানা গেছে, সদর উপজেলায় সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ১৪৮টি। জাতীয় করনের প্রক্রিয়াধিন রয়েছে ২৭টি। যার মধ্যে একটি নারিকেল বাড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সরকারী হিসেব মতে এ বিদ্যালয়টি ৭৭ জন শিক্ষার্থী পাঠদান করছে। গত বছর সমাপনি পরীক্ষায়ও ২জন শিক্ষার্থী পাশ করেছে ওই বিদ্যালয় থেকে। বাস্তবে দীর্ঘ এক যুগ ধরে পাঠদান বন্ধ রয়েছে বলে স্বীকার করেছেন বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, উপবৃত্তির ব্যবস্থা না থাকায় ১০ বছর ধরে শিক্ষার্থীর অভাবে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। বিদ্যালয়টি বন্ধ থাকায় কর্তমানে ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। ওই গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল খালেক জানান, সেকেন্দার আলীর কাজই জমি জবর দখল করা। এর আগেও ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড দিয়ে দুইজন কৃষকের জমি জবর দখল করে নিজে ভোগ করছেন। শিক্ষার্থী না থাকলেও কাগজ কলমে তার পুরো পরিবার এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক বনে গেছেন। এ ব্যাপারে সুষ্ঠ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান তিনি।

আদালতের তিনটি রায় পেয়েও জমি উদ্ধারে ব্যর্থ মুক্তিযোদ্ধা মোজাম্মেল হক আরও বলেন, ওই জমির কারনেই বিগত বিএনপি জামায়াত জোট সরকারের আমলে তাকে গাছের সাথে বেঁধে মারপিট করে জমিটি দখলে নিয়ে বিদ্যালয়ের সাইন বোর্ড সাটিয়ে সেটি প্রতিস্থাপন করেছে বিএনপি নেতা ভুমি দস্যু সেকেন্দার আলী। এজন্য তিনি প্রশাসনের উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

বিদ্যালয়টির সভাপতি সেকেন্দার আলী জানান, জবর দখল নয়, জমিটি তিনি ক্রয় করে নিয়ে বিদ্যালয় স্থাপন করেছেন। তবে এ ব্যাপারে জমির কাগজপত্র দেখতে চাইলে জমি ক্রয়ের বৈধ কোন কাগজ দেখাতে পারেননি তিনি। পাঠদান বন্ধ কেন? এমন এক প্রশ্নেরও কোন সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।

লালমনিরহাট সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার রমজান আলী জানান, জাতীয় করনের জন্য প্রক্রিয়াধিন এ বিদ্যালয়টি পরিদর্শনে পাঠদানের কোন পরিবেশ পাওয়া যায়নি। তাই নতুন বইসহ সরকারী বিভিন্ন সুযোগ নিয়ে প্রতারনা করার ব্যাখ্যা জানতে চেয়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে একটি পত্র পাঠানো হয়েছে। জবাব এলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান তিনি।