রাণীশংকৈল (ঠাকুরগাঁও) থেকে মোঃ বিপ্লব::

ঠাকুরগাঁও জেলার রাণীশংকৈল উপজেলার রামরায় দিঘি। রঙ-বেরঙের অতিথি পাখির কলতানে মুখরিত হয়ে উঠেছে রামরায় দিঘি। প্রতি বছরের মতো এ বছরও হাজার হাজার অতিথি পাখির আগমন ঘটেছে ঐতিহাসিক এ দিঘিতে। এতে দৃষ্টিনন্দন পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়রাও এই পাখিগুলোর প্রতি অতিথির মতো দৃষ্টি রাখছে।

প্রচন্ড শীত থেকে বাঁচতে সুদূর সাইবেরিয়া থেকে হাজারো পাখি এসে আশ্রয় নিয়েছে রামরায় দিঘিতে। বিশাল এ দিঘি জুড়ে অতিথি পাখির বিচরণ আর কলকাকলীতে মুখরিত হয়ে উঠেছে রামরায় দিঘির পরিবেশ। একসঙ্গে এত পাখি দেখলে যে কারো মন জুড়িয়ে যায়। রামরায় দিঘি যেন পাখির রাজ্যে পরিণত হয়েছে। এসব পাখি দেখতে প্রতিদিনই ভিড় জমাচ্ছে শত শত নারী-পুরুষ ও শিশু। বিশেষ করে স্কুল কলেজের শিক্ষার্থী ও মহিলাদের সংখ্যাই বেশি। দর্শনার্থীরা এসেই মোবাইল ফোনে পাখির ছবি আর সেলফি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন।

সারাদিন দিঘির পানিতে সাঁতার কাটলেও সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গেই দিঘির পাড়ে থাকা লিচু গাছে আশ্রয় নেয় অতিথি পাখিরা। ভোর হলে আবার খাবারের সন্ধানে দিঘির পানিতে নেমে পড়ে ঝাঁক বেঁধে। এ যেন অতিথি পাখির মিলনমেলা। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে রামরায় দিঘিতে ছুটে আসছেন পাখিপ্রেমীরা। দিনাজপুর হতে অতিথি পাখি দেখতে আসা সাইফুল ইসলাম ও তার সহধর্মিনী জানান, শুনেছিলাম এই দিঘিতে নাকি অনেক পাখি আসে। কিন্তু এর আগে তা দেখিনি। তাই নিজ চোখে দেখতে আসা। এত পাখি একসঙ্গে কোনদিন দেখিনি। একবার দেখলেই মন জুড়িয়ে যায়।

স্থানীয় বাসিন্দা ঠাকুরগাঁও বার কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট শেখ ফরিদ বলেন, সারাদিন অনেক মানুষ আসে অতিথি পাখি দেখার জন্য। এদের কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে আছে দিঘি এলাকা। এলাকাবাসী সজাগ থাকেন কেউ যেন এদের শিকার করতে না পারে। উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান সইদুল হক বলেন, পাখির আগমনে ওই এলাকার সৌন্দর্য যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে তেমনি প্রকৃতির ভারসাম্যও রক্ষা হচ্ছে। এই পাখিগুলো যাতে কেউ শিকার করতে না পারে সেজন্য আমরা এলাকাবাসী সকলে আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছি।

ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক কে এম কামরুজ্জামান সেলিম জানান- এই পাখিগুলো আমাদের ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার রামরায় দিঘির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। প্রতি শীতকালেই পাখিগুলো আসে। এদের শিকার করা দন্ডনীয় অপরাধ। তাই সবাইকে অতিথি পাখি শিকার না করার আহবান জানান। তিনি আরো বলেন যে, সেখানে যেন কেউ অতিথি পাখি শিকার করতে না পারে সেদিকে লক্ষ রাখার জন্য রাণীশংকৈল উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। রামরায় দিঘি বরেন্দ্র ভূমিতে প্রাচীন জলাশয়গুলোর মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম দিঘি। ৯০০ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ৫৫০ মিটার আয়তনের এ প্রাচীন দিঘির গভীরতা ৮৯ মিটার। ৫২ দশমিক ২০ একর জমিজুড়ে এই রামরায় দিঘি। পুকুরের জলভাগের আয়তন ৩৩ দশমিক ৮৬ একর এবং পাড় ১৮ দশমিক ৩৪ একর। দিনাজপুর গ্যাজেটেরিয়া এবং ড. সেনের দিনাজপুরের ইতিহাস বই থেকে জানা যায়, আঠার’শ শতাব্দীর শেষের দিকে এ অঞ্চল ছিল মালদুয়ার পরগনার অন্তর্গত। সে সময় এ এলাকার জমিদারি ছিল নাথপন্থি দুই চিরকুমারী সহোদর রানীর হাতে। বড় রানী ও ছোট রানী বলে পরিচিত এ দুই রানী ছিল অত্যন্ত প্রজাবৎসল। প্রজাদের পানীয় জলের কষ্ট নিবারণের জন্য তারা ৩৬০ পুকুর খনন করেন। রামরায় দিঘি তাদের অন্যতম। দিঘির চারপাশের পাড়ের উচ্চতা প্রায় ২২ ফুট। এ দিঘিতে ১ হাজার ২৬০টি লিচু গাছ এবং পাড়গুলোর শীর্ষে ও পিছনে প্রায় ১০ হাজার বনজ ও ঔষধি বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে।