ই-কণ্ঠ ডেস্ক রিপোর্ট:: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আব্দুল কাইয়ুম ও মিজানুর রহমান খান

প্রথম আলো: আপনারা কি ক্ষমতার মূল প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে আটকে রেখেই নির্বাচনে যাবেন?

মোহাম্মদ নাসিম: আমরা সর্বদা মনে করি, নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হওয়া উচিত। একটা বিশাল জনগোষ্ঠী বিভিন্ন দলের সমর্থক। আমি আশা করি, খালেদা জিয়া নির্বাচনের সময়ে বাইরে থাকবেন।

প্রথম আলো: বিএনপি কত আসন পেতে পারে?

মোহাম্মদ নাসিম: এটা বিএনপির নেতৃত্ব বলতে পারবেন। তবে যেহেতু বিএনপি একটি বড় রাজনৈতিক দল, তারা নির্বাচনে এলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের একটি ভালো প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। গত ১০ বছরে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশে অনেক উন্নয়ন ঘটেছে। একটি
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এসেছে। বিদ্যুৎ–সংকট অনেকটাই কেটে গেছে। অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে জঙ্গি উত্থান দমন করা হয়েছে। দারিদ্র্যের হার কমেছে। খাবারের কষ্ট কমে গেছে। এভাবে নানা ক্ষেত্রে আমাদের সাফল্যগুলো মানুষ ইতিবাচকভাবে নিয়েছে। সার্বিক বিচারে মানুষের ভেতরে একটা স্বস্তি এসেছে।

প্রথম আলো: গণতন্ত্রের চেয়ে উন্নয়নকেই আওয়ামী লীগ বড় করে দেখছে….

মোহাম্মদ নাসিম: আওয়ামী লীগ তা মনে করে না। আমরা মনে করি, গণতন্ত্র ও উন্নয়ন পাশাপাশি চলবে। উন্নয়ন ও শান্তি মানুষ কিন্তু চাইবেই, আপনি গ্রামে-গঞ্জে যেখানে যাবেন, মানুষ রাস্তাঘাট, অবকাঠামো দেখতে চাইবে। গত ১০ বছরে সেটা হয়েছে। আপনি দেখবেন, আজকে যে গণতন্ত্রের কথা আমরা বলি, তার অন্যতম উপাদান হলো অর্থনৈতিক সাশ্রয়। ১০ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে একটি সরকার থাকায়, সেটা কিন্তু অর্জিত হয়েছে। কিন্তু তাই বলে গণতন্ত্রকে বাদ দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগ পরাজিত হলেও আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনাই কিন্তু সংসদীয় গণতন্ত্রের বিলটি এনেছিলেন।

প্রথম আলো: তখন যতটা জোর গলায় আপনারা বিরোধী দলকে সংসদীয় গণতন্ত্রের মুকুট হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছেন, ১০ বছরে বিশেষ করে ২০১৪ সালের নির্বাচনের পরে প্রায় হারিয়ে গেছে।

মোহাম্মদ নাসিম: এটা হারিয়ে যায়নি। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিন্তু খালেদা জিয়াকে অনুরোধ করেছিলেন। আমাদের নেত্রীর লক্ষ্য ছিল আলোচনার
মাধ্যমে নির্বাচনকে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করা। তিনি প্রথা ভেঙে নির্বাচনকালীন সরকারে যোগ দিতে খালেদা জিয়াকে অনুরোধ করেছিলেন।

প্রথম আলো: কিন্তু সেটা কতটা কৌশলগত আর কতটা আন্তরিক ছিল, সে প্রশ্ন রয়ে গেছে। গণতন্ত্র একটি ধারাবাহিকতা, কিন্তু আপনারাই এখন বলছেন, সেই আমন্ত্রণ সামনের নির্বাচনে আর নেই।

মোহাম্মদ নাসিম: এটা কোনোভাবেই কৌশলগত হতে পারে না। খালেদা জিয়া তো এগিয়ে আসেননি। প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ্যে একাধিকবার অফার দিয়েছেন, খালেদা জিয়া যদি তা গ্রহণ করতেন, তাহলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ অনেক দায়িত্বে তিনি থাকতেন। অথচ তিনি নির্বাচনে এলেন না, উপরন্তু সেই নির্বাচন ঠেকাতে উদ্যোগী হলেন। দেখুন, আমাদের মতো দেশে নির্বাচন ঠেকানো কিন্তু একটি গণবিরোধী কাজ। সেই কাজটি বিএনপি-জামায়াত করেছিল। আর যেভাবেই হোক, জামায়াতের উসকানিতে জ্বালাও–পোড়াও ঘটেছিল। তখন তো বিকল্প ছিল না। যদি ওই নির্বাচন তখন আমরা না করতাম, তাহলে কী হতো বলুন? একটি অগণতান্ত্রিক সরকার আসত, একটা অরাজকতা তৈরি হতো।

প্রথম আলো: কিন্তু প্রশ্ন হলো গণতান্ত্রিক-প্রক্রিয়া চলমান বিষয় এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত। ওই ফর্মুলার মেয়াদ তো ফুরিয়ে যাওয়ার কথা নয়।

মোহাম্মদ নাসিম: বিএনপি তখন কিন্তু জাতীয় সংসদে ছিল।

প্রথম আলো: এটা টেকনিক্যাল বিষয়। বিএনপিকে নির্বাচনকালীন সরকারে দেখতে চাইলে সংবিধান বাধা দেবে না।

মোহাম্মদ নাসিম: না, তাহলে সংসদের বাইরে নিবন্ধিত আরও অনেক রাজনৈতিক দল আছে, তারাও তো আসতে চাইবে। এমনকি সেটা তো আদালতে চ্যালেঞ্জও হতে পারে। আপনি সংসদের অংশ হলে আপনাকে সরিয়ে রাখা সম্ভব হতো না।

প্রথম আলো: ব্রিটেন ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশ, যারা দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করে, তারাও কিন্তু কেয়ারটেকার কনভেনশনস মানে নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভা কী পারবে, কী পারবে না, তা লিখে নিয়েছে। আপনারা তা কিন্তু করছেন না।

মোহাম্মদ নাসিম: নির্বাচনকালীন সরকারের আমলে জনপ্রশাসন তো নির্বাচন কমিশনের কাছে ন্যস্ত থাকবে। আপনি যেটা বলছেন, সেসব তো সংবিধানেই বলে দেওয়া আছে। সুতরাং নির্বাচন কমিশন নির্বাচনকালে তার সেই ক্ষমতা কতটা ব্যবহার করবে বা করতে পারবে, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে।

প্রথম আলো: বিরোধী দল-বর্ণিত খুলনার নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের মডেলই কি গাজীপুরসহ চারটি সিটি এবং পরে জাতীয় নির্বাচনে দেখা যাবে?

মোহাম্মদ নাসিম: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক হিসেবে আপনারা বলুন, এই সময়ে কি নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন করা সম্ভব? শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন হয়েছে। অনিয়মের কারণে কয়েকটি স্থানে নির্বাচন স্থগিতও করা হয়েছে। বিএনপি কোনো যুক্তিতর্ক দিয়ে বলতে পারেনি যে খুলনায় কারচুপি হয়েছে। অনেক সময় ৮০ থেকে ৯০ ভাগ ভোট হয়ে থাকে। বিএনপি কিন্তু অনেক ভোট পেয়েছে।

প্রথম আলো: বিএনপির মেয়র পদপ্রার্থীর এক লাখের বেশি ভোট পাওয়া নিশ্চিত করে যে ক্ষমতায় যেতে তারা একটি শক্তিশালী প্রতিপক্ষ।

মোহাম্মদ নাসিম: হ্যাঁ, নিশ্চয়।

প্রথম আলো: এখন আপনিই বলুন, আপনারা যে হারে জনসভা বা মিছিল করেন, সেই অনুপাতে কি বিরোধী দলকে তা করতে দিচ্ছেন?

মোহাম্মদ নাসিম: এটা সম্পূর্ণ প্রশাসনের ওপর নির্ভর করে। ২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দেশে যা ঘটেছে, জঙ্গিবাদের যেভাবে উত্থান ঘটেছে, সেসব ঘটনাকে কিন্তু আপনাকে একসঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে। তারা যখনই কোনো মিটিং-মিছিল করতে গেছে, তখনই একটা সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। আর সে জন্য তারাই দায়ী। আপনি দেখবেন, বিএনপি এর আগে বড় সভা-সমাবেশ করেছে। ২০১৪-১৫ সালে তাদের জ্বালাও–পোড়াওয়ের কারণে পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে কেউ আর কোনো ঝুঁকি নিতে চায় না। আবার এটাও সত্য যে অধিকতর সভা-সমাবেশ করতে পারাটা কিন্তু সাংগঠনিক দক্ষতার ওপরও অনেকটা নির্ভর করে।

প্রথম আলো: ইদানীং বিশেষ করে মাদকবিরোধী যুদ্ধের আড়ালে রাজনৈতিক হত্যাযজ্ঞ চলছে বলে দেশি-বিদেশি অধিকার গ্রুপগুলোর অনেকে দাবি করছেন।

মোহাম্মদ নাসিম: আমি আপনাকে বলতে পারি, একটি রাজনৈতিক হত্যাও ঘটেনি। এটা কথার কথা হিসেবে বলা হচ্ছে। আমি বলব, মাদকের বিরুদ্ধে যে অভিযান তার প্রতি শহর-গ্রামের সর্বস্তরের মানুষের সমর্থন আছে। আমার নিজের এলাকাতেও বাড়ি থেকে বেরিয়ে ছেলেমেয়েদের মাদক নেওয়ার দৃশ্য চোখে পড়েছে। সমাজকে কুরে কুরে খাচ্ছে মাদক।

প্রথম আলো: এসবই ঠিক, কারও দ্বিমত নেই। কিন্তু আপনি কি নিশ্চয়তা দিতে পারছেন যে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালানোর পরে এই সমস্যা মিটে যাবে?

মোহাম্মদ নাসিম: না, আমি তো (বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড) সমর্থন করি না। কিন্তু সারা শরীর যখন ঘা হয়ে যাবে, তখন একটা ধাক্কা আপনাকে দিতেই হবে। এই অভিযানের ফলে অনেক স্থানে মাদকসেবীরা পালিয়ে গেছে। কেউ আত্মগোপন করেছে। এই অ্যাকশনটার আসলে দরকার ছিল। আমরা যা-ই বলি, সামাজিক আন্দোলনের কথাও বলা হয়, ওয়াজ-নসিহত করে এখানে গত কয়েক বছর ধরে চেষ্টা করেও সফল হওয়া যায়নি। তরুণসমাজ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। হ্যাঁ, একটি বড় ঝড়ে হয়তো ছোটখাটো গাছ উপড়ে পড়তে পারে। এই যুদ্ধে মানুষের সমর্থন আছে। কক্সবাজারের ঘটনার কিন্তু তদন্ত হচ্ছে।

প্রথম আলো: ড. আনিসুজ্জামান প্রমুখের বিবৃতি বলেছে, এটা সমস্যা সমাধানের পথ নয়।

মোহাম্মদ নাসিম: তাঁরা শ্রদ্ধেয় ও সম্মানিত লোক। বিবৃতি দেওয়ার অধিকার তাঁদের আছে। তাঁদের বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়, তা বলি না। এ ধরনের ঘটনা কীভাবে কমিয়ে আনা যায়, সে বিষয়ে আমরা চিন্তাভাবনা করছি। কিন্তু এটাও বলি, এর বিকল্প কী, সেটা কি কেউ এখনো পর্যন্ত বলতে পেরেছেন? মাদকের অন্যতম উৎস ভারত ও মিয়ানমার, তাই উৎস ধ্বংস করা তো অন্য দেশের বিষয়।

প্রথম আলো: কিন্তু প্রচলিত বিচারব্যবস্থা কার্যকারিতা হারাচ্ছে। মাদক অপরাধীদের বিচার সম্ভব হচ্ছিল না। একইভাবে আমরা এক গবেষণায় দেখলাম, নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় সাজার হার ৩ শতাংশেরও কম।

মোহাম্মদ নাসিম: আপনার সঙ্গে আমি একমত। বিচার বিভাগকে এটা বিবেচনায় নিতে হবে। দ্রুত বিচার করে এদের চরম শাস্তি দেওয়া উচিত। এটা সবাই চায়।

প্রথম আলো: ১৪ দলের ঐক্য টিকবে? তারা কটি আসন পাবে? তাদের ভেতরে নানামুখী টানাপোড়েন আছে।

মোহাম্মদ নাসিম: টিকবে। আসন প্রশ্নে এখনই বলা যাবে না। তবে যৌথ নির্বাচনের পরিকল্পনা এখন স্থির আছে। আমার বিশ্বাস থেকে বলতে চাই যে বিএনপি নির্বাচন করবে। তখন আমরা যৌথভাবে নির্বাচন করবই। আর কোনো কারণে যদি বিএনপি নির্বাচনে না আসে তাহলে একটি পরিস্থিতি হবে। সেখানে একটা জটিলতা হবে।

প্রথম আলো: আপনাদের দলের অভ্যন্তরে অন্তর্দ্বন্দ্ব?

মোহাম্মদ নাসিম: একটি বৃহৎ দল হিসেবে ছোটখাটো অন্তর্দ্বন্দ্ব থাকতেই পারে, এটা অস্বীকার করা একটা বোকামি। ৩০০ আসনে ধরে নিন আমাদের ৩০০ প্রার্থী আছেন, তাঁদের চাওয়া-পাওয়ায় ভিন্নতা থাকবে। এ রকম দ্বন্দ্ব নিরসন করেই তো আমরা নির্বাচন করি।

প্রথম আলো: ক্ষমতাসীন দলকে গণতন্ত্রে একটা অভিভাবকত্বের ভূমিকা পালন করতে হয়। আপনি মানেন?

মোহাম্মদ নাসিম: অবশ্যই। তবে আমাদের মতো দেশে অতীত-বর্তমান ভেবে কথা বলতে হবে। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট থেকে শুরু করে প্রতিটি সরকারি দল থেকে আওয়ামী লীগ যে আচরণ পেয়েছে, তা বর্ণনা করা যাবে না। তাদের তরফে কোনো সাহায্য-সহানুভূতি পাইনি। বাংলাদেশের রাজনীতির সঙ্গে অন্য দেশের কোনো তুলনা পাবেন না।

প্রথম আলো: পঁচাত্তরের আগে বঙ্গবন্ধু কিন্তু বিরোধী দলের কাছ থেকে বেশ নেতিবাচক আচরণই পেয়েছিলেন। কিন্তু বিরোধীদলীয় নেতাদের প্রতি তাঁর সদাচরণ আপনার অজানা নয়, সেই ধারা থেকে আওয়ামী লীগ কি সরে আসছে?

মোহাম্মদ নাসিম: বঙ্গবন্ধুর মতো মহান নেতা সাড়ে তিন বছর বিরোধী দলের সঙ্গে যেভাবে সদাচরণ করেছিলেন, বিরোধী দল তার কী প্রতিদান দিয়েছিল? তাঁর মৃত্যুর পরে বিরোধী দল কী আচরণ করেছিল? জাতির জনক ও চার নেতা তো তা দেখে যাননি। তাঁরা যদি দেখতেন, তাহলে তাঁরা কষ্ট পেতেন। এমনকি আমরা যাঁকে শ্রদ্ধা করি, সেই মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানী জিয়াউর রহমানের আমলে কী মন্তব্য করেছিলেন? আজকে অনেকে রং বদলে ফেলেছেন। অনেক কথা বলছেন। আমরা কিন্তু তা ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবিলা করেছি। আপনি একবার ভাবুন, এত বড় ঘটনার পরও জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসার পর আমাদের তৎকালীন নেতা আসাদুজ্জামান খানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিহত জিয়াউর রহমানের কফিনের প্রতি সম্মান দেখিয়েছিল। ফুল দিয়েছিল। আমি তখন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। দলের সিদ্ধান্তে আমরা তা করেছিলাম। ভাবুন তো, যেখানে জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রথম বেনিফিশিয়ারি। ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডে যেখানে তাঁর জড়িত থাকার বিষয়ে আমাদের মনে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। ক্ষমতায় থাকতে আওয়ামী লীগের প্রতি তাঁর আচরণও আমরা দেখেছিলাম। পঁচাত্তরের খুনিদের জিয়া, এরশাদ, খালেদা জিয়া আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছেন।

প্রথম আলো: এরশাদই কিন্তু প্রথম, যিনি প্রকাশ্যে খুনি চক্রের নায়ক ফারুক রহমানকে রানিংমেট করে রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত করার চেষ্টা করেছিলেন।

মোহাম্মদ নাসিম: হ্যাঁ, অবশ্যই।

প্রথম আলো: এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এরশাদকে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত করা হয়েছে, তাঁর সঙ্গে রিকনসিলিয়েশন সম্ভব হলে বিএনপির সঙ্গে নয় কেন?

মোহাম্মদ নাসিম: আমি তো সে কথাই বললাম। আমরা জিয়াউর রহমানের স্ত্রী বলে খালেদাকে অসম্মান করিনি। বিএনপির সঙ্গে সংসদে একত্রে বসে দ্বাদশ সংশোধনী বিল পাস করেছি। আরেকটি ঘটনা বলি, সম্ভবত ১৯৯২ সাল হবে। খালেদা জিয়া তখন প্রধানমন্ত্রী, শেখ হাসিনা বিরোধী দলের নেতা। ১৪ আগস্টের এক রাতে খালেদা জিয়া এক নৈশভোজে বিরোধী দলের নেতাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। ১৫ আগস্টের কালো রাতের পূর্ব রাত হওয়া সত্ত্বেও জননেত্রী সেদিন কিন্তু নৈশভোজে গিয়েছিলেন, ভদ্রতা রক্ষা করেছিলেন। যদিও তিনি খাওয়া থেকে বিরত ছিলেন। আমরাও তাঁকে মানা করেছিলেন, এমন রাতে আপনি অন্তত ডিনার করবেন না। কিন্তু তার প্রতিদানে আওয়ামী লীগ কী পেল? খালেদা জিয়া ১৯৯৬ সালের প্রহসনের নির্বাচনে খুনি আবদুর রশীদকে সংসদে নির্বাচিত করে এনে বসালেন। তাহলে আপনি দেখবেন, আমাদের কেউ ছাড় দেয়নি। আমরাই সর্বদা ছাড় দেওয়ার চেষ্টা করেছি। আপনি এরশাদের কথা বলছেন। তিনি নিজে স্বৈরাচার হয়ে আজকে আমাদের সঙ্গে বসেছেন। কিন্তু তাঁকে কোনোভাবে রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসন করা হয়নি।

প্রথম আলো: বিএনপি আগামী নির্বাচনে তাঁর দলের সঙ্গে জোট বাঁধার সম্ভাবনা নাকচ করে না। তারা বলে রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই।

মোহাম্মদ নাসিম: হতে পারে। চাইলে যাবেন। তাঁর (এরশাদ) তো কোনো রাজনৈতিক স্থিরতা নেই।

প্রথম আলো: ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই প্রশ্ন করতে চাই বৃহত্তর স্বার্থে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির সঙ্গে নতুন করে একটা রিকনসিলিয়েশনের প্রয়োজনীয়তাকে কি নাকচ করেন?

মোহাম্মদ নাসিম: খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় সেদিন সুচিন্তিতভাবে শেখ হাসিনাসহ আমাদের সবাইকে হত্যার পরিকল্পনা ছিল। সেটা ১৫ আগস্টের চেয়ে কম কিছু নয়। তারপরও শেখ হাসিনা ধৈর্যের সঙ্গে অগ্রসর হয়েছেন। বিএনপি নিধনের কথা কোনো দিন চিন্তা পর্যন্ত করেননি।

প্রথম আলো: এখন বিএনপিকে ভাঙার কি চেষ্টা চলছে?

মোহাম্মদ নাসিম: না, প্রশ্নই আসে না। এই তামাশা আমরা কেন করতে যাব? ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার পর নেত্রী কী করেছেন, সেটাও দেখুন। খালেদা জিয়ার ছেলের (আরাফাত রহমান কোকো) মৃত্যুর পর আমাদের নেত্রী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সমবেদনা জানাতে ছুটে গেছেন। কিন্তু গেটই তালাবদ্ধ করে রাখা হলো। এটা কি কোনো কথা হলো? আবার না গেলে তো সমালোচনা হতো। ড. ওয়াজেদ মিয়া মারা যাওয়ার পরে খালেদা জিয়া সমবেদনা জানাতে এসেছিলেন। তখন শেখ হাসিনা তাঁর কক্ষে নিয়ে গিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছিলেন। এভাবে আমাদের দিক থেকে সব সময় শিষ্টাচার, ওদের দিক থেকে শিষ্টাচারবহির্ভূত আচরণ লক্ষ করবেন। আপনি তো অভিভাবকত্বের কথা তুললেন, আমিও তাই এসব বললাম।

প্রথম আলো: বিএনপি অবশ্য বলে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসেই টুঙ্গিপাড়ায় গিয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলেন।

মোহাম্মদ নাসিম: সেটা তো আমরা অস্বীকার করি না। আমরা খালেদা জিয়াকে সমবেদনা জানাতে গিয়েছি, তাদের কাছ থেকে তেমন আচরণই আশা করেছি। এক-এগারোর কথা ভাবুন। নেত্রীকে স্বাগত জানাতে হাজার হাজার কর্মী এক-এগারো সরকারের বাধা অতিক্রম করে এয়ারপোর্টে ছুটে গেছেন। আর বিএনপির নেত্রী তিন মাস জেলে, এখন আপনি কী বলবেন, আমরা কি তাঁর জন্য ফুল দিয়ে মিছিল-মিটিং সাজিয়ে দেব। তাঁর জন্য ১০ হাজার লোক ঢাকার রাস্তায় নেমেছে, তা তিনি দেখাতে পারলেন না। রাজনৈতিক দল তো বাধার মধ্যে পড়বেই, কিন্তু আপনার সঙ্গী-সাথিরা আজ কোথায়?

প্রথম আলো: বিএনপি বলে তাদের বিরুদ্ধে ভূরি ভূরি মামলা। তারা এক হাজারের বেশি নেতা-কর্মীকে হত্যার দাবি করে।

মোহাম্মদ নাসিম: মামলা থাকেই। পাঁচটা বছর আওয়ামী লীগের অফিসের সামনে তারা কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে রেখেছিল। আমরা মার না খেয়ে রাজনীতি করতে পারিনি। আর আমার মনে হয় না, নিহতের পরিসংখ্যানের কোনো সত্যতা আছে। এত লোক বাংলাদেশে মারা গেলে, দল বসে থাকত? এটা সম্ভব? এগুলো হলো দুর্বলতা ঢাকার অজুহাত।

প্রথম আলো: বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে কোনো বিশেষ পদক্ষেপ? নাকি আসলে আসবে—

মোহাম্মদ নাসিম: না, আমি তা বলি না। পানি ছাড়া মাছ ও ভোট ছাড়া দল বাঁচে না। দু-একটা বাদে সামরিক শাসনেও আমরা ভোট করেছি। ধ্বংসস্তূপ থেকে নতুন করে গড়ে তুলতে ১৯৭৯ সালে পাওয়া ৩৮টি আসন আমাদের দলের উপকারেই এসেছিল। আমি আশা করি, বিএনপি নির্বাচনে আসবে এবং সে সময়ে খালেদা জিয়াও জেলের বাইরে থাকবেন।

প্রথম আলো: আপনার এমন আশাবাদটা ব্যক্তিগত কি না?

মোহাম্মদ নাসিম: আমার ব্যক্তিগত এবং ১৪ দলের মুখপাত্র হিসেবেও। সব সময় আশা করি, তিনি কারাগারের বাইরে থেকেই নির্বাচনে অংশ নেবেন।

প্রথম আলো: তাহলে এত অনিশ্চয়তার মধ্যে এটাই বড় হরফের শিরোনাম হতে পারে?

মোহাম্মদ নাসিম: আশা করি, খালেদা জিয়া কারাগারের বাইরে আসবেন এবং নির্বাচনে অংশ নেবেন।

প্রথম আলো: গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আওয়ামী লীগ নিয়ন্ত্রণ করছে। কক্সবাজারের অডিও প্রকাশের পরে ডেইলি স্টার-এর ওয়েবসাইট ব্লক ও খুলনার নির্বাচনের খবর সম্প্রচারের পরে সাংবাদিকদের চাপে থাকার মতো খবরাখবর রাখেন কি না?

মোহাম্মদ নাসিম: বাংলাদেশের মিডিয়া অনেক বেশি স্বাধীনতা ভোগ করছে। প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত সাংবাদিক-বান্ধব। নিয়মিত তিনি প্রেস ব্রিফিং করেন। মিডিয়ায় অনেক সময় অসত্য খবর দেওয়া ও চরিত্র হনন করা হয়। প্রেস কাউন্সিল কার্যকর কি না আমি জানি না। প্রতিবাদ দিলে কাটছাঁট হয়, কখনো ছাপাই হয় না। আপনি কি অস্বীকার করবেন যে কিছু সাংবাদিক ব্ল্যাকমেল রিপোর্ট করে? তবে আমি বিশ্বাস করি, মিথ্যা অজুহাত দিয়ে কোনো সাংবাদিককে গ্রেপ্তার না করা, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত। আমরা সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করব না কেন? কারণ, সাংবাদিকেরা একটা আয়নার মতো। আমাদের আলোচনা-সমালোচনা সবটাই সাংবাদিকদের মাধ্যমে আসবে, এটা আমরা বিশ্বাস করি।

প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।

মোহাম্মদ নাসিম: ধন্যবাদ।