জিয়াউদ্দিন চৌধুরী:
১৫ আগস্ট দিনটি বা পুরো আগস্ট মাস আমরা শোক পালন করি। জাতির পিতার প্রতি আমাদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা জানাই। প্রয়োজন ১৫ আগস্টের প্রকৃত বিশ্লেষণ। কেন ও কীভাবে এই রক্তাক্ত ঘটনায় দেশের রাজনীতির মোড় ঘুরে গেছে। এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি এড়ানোর জন্য আমরা রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দেশকে প্রস্তুত করতে পেরেছি কি না।

বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর যে রাজনৈতিক পরিবর্তন হয়, তার নেতৃত্ব দেন বঙ্গবন্ধুরই সহকর্মী ও বহু বছরের রাজনৈতিক অনুগামী খন্দকার মোশতাক আহমদ। তারপর অভ্যুত্থান ও পাল্টা-অভ্যুত্থানে খন্দকার মোশতাক চোখের আড়ালে চলে যান। কিন্তু তিনি যে আদর্শে বিশ্বাস করতেন তার বীজ রেখে যান তাঁর অনুগামীদের কাছে।

বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার ছয় মাস আগে দেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। স্বাধীন হওয়ার মাত্র তিন বছরের মাথায় তিনি এই আমূল পরিবর্তন আনেন দেশকে ক্রমবর্ধমান নৈরাজ্য থেকে উদ্ধার করার পরিকল্পনায়। তাঁর ধারণা ছিল, ওই পরিস্থিতিতে সবাইকে এক রাজনীতির আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে এক নেতৃত্ব ও এক দলের সঙ্গে থাকতে হবে। ১৯৭৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি গঠন করেন বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল)। আওয়ামী লীগ ছাড়া আরও তিনটি রাজনৈতিক দল এতে যোগ দেয়। এই নতুন একদলীয় ব্যবস্থা তেমন কোনো বিরুদ্ধতার মুখে পড়েনি। বরং বিভিন্ন শ্রেণির পেশাজীবী, কর্মজীবী, এমনকি সাধারণ মানুষও শোভাযাত্রা বের করে বঙ্গবন্ধুর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায় এবং বাকশালে যোগদানের ঘোষণা দেন।

বঙ্গবন্ধু নিহত হন সেনাবাহিনীর কিছু ব্যক্তির হাতে। কিন্তু এর পেছনে ছিল অনেক গভীর ষড়যন্ত্র এবং আমাদের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা। এই ব্যর্থতার প্রধান কারণ দলীয় আত্মতুষ্টি, রাজনৈতিক সমালোচনার অনুপস্থিতি এবং তোষামোদকারীদের উত্থান। এর প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই যখন অভ্যুত্থানকারী কিছু ব্যক্তি বিনা বাধায় রাষ্ট্রীয় কর্মভার কেড়ে নিয়ে তাঁদের পছন্দ অনুযায়ী লোককে শাসকের স্থানে বসান; রাষ্ট্রের প্রধান শাখাগুলো ও তাদের প্রধানেরা বিনা প্রতিবাদে ওই ব্যক্তিদের আদেশ মেনে তাঁদের সহযোগিতা করেন।

১৫ আগস্টের এই ভয়াবহ পরিবর্তনের সময় আমি ছিলাম শিল্পমন্ত্রী কামারুজ্জামান সাহেবের একান্ত সচিব। ঘটনার এক মাস আগে আমি তাঁর সঙ্গে ট্রেনে চট্টগ্রামে সরকারি সফরে গিয়েছিলাম। সারা দেশে তখন নবগঠিত বাকশাল নিয়ে তুমুল হইচই। শিল্পমন্ত্রী কামারুজ্জামান চট্টগ্রাম গিয়েছিলেন শিল্পকারখানা পরিদর্শন করতে। রাজনৈতিক সভা-সমিতি অল্প ছিল। বাকশালের দলীয় কিছু নেতা মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তাঁদের অধিকাংশ ছিলেন পুরোনো আওয়ামী লীগের লোক।
দুই দিনের সফর শেষে আমরা ঢাকা ফেরার জন্য রাতের ট্রেনে রওয়ানা হলাম। মন্ত্রী উঠলেন তাঁর সেলুনে, আমি আমার কামরায়। ট্রেন সীতাকুণ্ড স্টেশনে পৌঁছালে মন্ত্রীর খাস বেয়ারা আমার কামরায় এসে বলল, মন্ত্রী সাহেব তাঁর সেলুনে আমাকে ডেকেছেন। তখন রাত প্রায় ১০টা। এত রাতে কোনো জরুরি দরকার ভেবে আমি তাড়াতাড়ি তাঁর সেলুনে গেলাম। তখনকার দিনে রেলওয়ের সেলুন ছিল বড় একটি কম্পার্টমেন্ট, যাতে একটি শোয়ার কামরা, বসার জায়গা ও পাশে খাবার আলাদা জায়গা। ঠিক সঙ্গে ছিল একটি ছোট রান্নার জায়গা।

আমি গিয়ে দেখলাম মন্ত্রী সাহেব তাঁর চিরাচরিত রাতের পোশাক, অর্থাৎ সাদা পাঞ্জাবি আর সাদা লুঙ্গি পরে সোফায় বসে আছেন। আমাকে বসতে বললেন। তাঁর হাতব্যাগ থেকে বের করলেন বেশ কিছু কাগজ। আমার হাতে দিলে দেখলাম, নানা মানুষের আরজি। মন্ত্রী যখন দলীয় অফিসে গিয়েছিলেন, তখন লোকজন এসব তাঁর হাতে ধরিয়ে দিয়েছেন। মন্ত্রী স্বভাবসুলভ হেসে বললেন, ‘বোঝো তো, দলের লোকের আবদার, তুমি অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিয়ো।’ আমি ভাবলাম, কাগজগুলো তিনি আমাকে ঢাকা গিয়েও দিতে পারতেন।

কাগজ দেওয়ার জন্যই আমাকে ডাকা নয়। বুঝলাম একটু পরে যখন আমি উঠে যাচ্ছিলাম এর পরের স্টেশনে। কামারুজ্জামান সাহেব আমাকে বললেন আরও একটু বসতে। আমি বসে রইলাম। একটু পরে খাবার এলে তিনি বললেন তাঁর সঙ্গে খাবার খেতে। আমি যদিও আগেই খেয়েছিলাম, তবু তাঁর সঙ্গে আবার খেতে বসলাম। দেখলাম, কামারুজ্জামান সাহেব বেশ চিন্তিত। খেতে খেতে জানতে চাইলেন, আমার সহকর্মীরা সাম্প্রতিক পরিবর্তন নিয়ে কিছু ভাবছেন কি না?

আমি তার আগের চার বছর তাঁকে দেখেছি আর তাঁর সঙ্গে কাজ করেছি তিন বছর। আমার সঙ্গে রাজনৈতিক কোনো আলাপ মন্ত্রী করেননি। আমি একটি অস্পষ্ট উত্তর দিলে মন্ত্রী বললেন, ‘দেখো, তোমাকে কিছু বলতে হবে না। সরকারি কর্মচারীরা মনের কথা পরিষ্কারভাবে বলে না, তারা সবাই যে পাত্রে থাকে তার আকার ধরে।’

তাঁকে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে খুবই চিন্তিত মনে হলো। কথায় কথায় বললেন স্বাধীনতাযুদ্ধের কথা, তাঁদের কষ্টের কথা, আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা। আমি বুঝতে পারলাম না তিনি কী বোঝাতে চাইছেন। আমি জানি তিনি নতুন গঠিত বাকশালের নির্বাহী কমিটির অন্যতম সদস্য এবং বঙ্গবন্ধুর খুব কাছের লোক। তাঁরা একজন অন্যজনকে তুমি বলে ডাকতেন। তাই কামারুজ্জামানকে এ রকম হতাশভাবে কথা বলতে দেখে আমার বিস্ময় বোধ হলো। বঙ্গবন্ধুর চারপাশের মোসাহেবদের ব্যাপারে তিনি চিন্তিত ছিলেন। বলেছিলেন, বিপদে মোসাহেবেরা বঙ্গবন্ধুর পাশে থাকবে না।

মন্ত্রীর সঙ্গে এই কথোপকথন হওয়ার প্রায় দেড় মাস পরে ঘটল ১৫ আগস্টের ভয়াবহ ঘটনা। সকালে গোলাগুলির আওয়াজ শেষ হলে বেরিয়ে পড়েছিলাম আমার মন্ত্রী কামারুজ্জামান সাহেবের ফোন পেয়ে। তিনি তখন থাকতেন ধানমন্ডির ২ নম্বর সড়কের ওপর একটি দোতলা বাড়িতে। সেখানে পৌঁছে দেখি, পাহারারত পুলিশ ছাড়া বাড়ি শূন্য।

বাসায় ফিরে ফোন পেলাম তাঁর এক রাজনৈতিক সহকর্মীর জামাইয়ের বাড়ি থেকে। কামারুজ্জামান সাহেব সপরিবার তাঁর বাড়িতে আছেন ধানমন্ডিতেই। সেখানে গিয়ে দেখি মন্ত্রী শোকাচ্ছন্ন ও ভীত। আমাকে দেখে বললেন, ‘আমি জানতাম আমরা একটা চরম সংকটে পড়ব, কিন্তু এই পরিণতির কথা কল্পনা করিনি। মোশতাক আমাদের কাউকে রেহাই দেবে না।’ কামারুজ্জামানসহ আওয়ামী লীগের যে শীর্ষ নেতারা সত্যিকার অর্থে বঙ্গবন্ধুর নির্ভরযোগ্য সহচর ছিলেন, খন্দকার মোশতাক সত্যিই তাঁদেরকে কারাগারের ভেতরে নির্মমভাবে হত্যা করার হুকুম দেন এবং তাঁদেরকে হত্যা করা হয়।

১৫ আগস্টের ঘটনার পর মন্ত্রী কামারুজ্জামানের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল তিন দিন; তাঁর সেই আত্মীয়ের বাড়িতে। তিনি ঢাকা ছেড়ে কোথাও যেতে রাজি হননি; বরং তাঁর সরকারি বাড়িতেই ফিরে গিয়েছিলেন একরকম সরকারি প্রতিশ্রুতি পেয়ে যে, সেই বাড়ি নিরাপদ। কিন্তু সেই ‘নিরাপদ’ বাড়িতে তিনি ফিরে যাওয়ার পর তাঁর সঙ্গে কেউ দেখা করতে পারতেন না। এমনকি আমিও পারিনি। প্রায় এক সপ্তাহ তিনি ওই বাড়িতে একরকম গৃহবন্দী ছিলেন। তারপর মোশতাক সরকার তাঁকে কারাগারে নিয়ে যায়। একইভাবে কারারুদ্ধ করে তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম আর মনসুর আলীকে। আগস্টের শেষে আমি জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব নিয়ে নোয়াখালী চলে যাই।

কামারুজ্জামান সাহেবের ট্রেনের কথাগুলো আমার কাছে ভবিষ্যদ্বাণীর মতো লেগেছিল। একসময় যাঁরা মৌমাছির মতো বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে রেখেছিলেন, তাঁর নির্মম হত্যার প্রতিবাদে তাঁদের কেউই রাস্তায় নামেননি। নোয়াখালীতে দেখেছি, সেখানে যেসব নেতা বঙ্গবন্ধুর জন্যই নানা পদে ছিলেন, তাঁরাও চুপ করে রইলেন। তাঁরা হয়তো নিজেদের জীবনের আশঙ্কা করেছিলেন। কিন্তু তাঁদের মধ্যে অনেকে পরে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও তাঁর দল ত্যাগ করে ক্ষমতার লোভে অন্য দলে যোগ দেন।

আমার চোখে দেখা সেসব ঘটনা আমাকে শুধু মনে করিয়ে দিত মরহুম কামারুজ্জামান সাহেবের সেই কথা: ‘তুমি দেখে নিয়ো, এই মোসাহেবরা বিপদে তাঁর (বঙ্গবন্ধুর) সঙ্গে থাকবে না।’

জিয়াউদ্দিন চৌধুরী: বঙ্গবন্ধু সরকারের শিল্পমন্ত্রী এ এইচ এম কামারুজ্জামান সাবেক একান্ত সচিব।
সুত্র-প্রথম আলো