ইকতেদার আহমেদ:

যেসব বিমানবন্দর থেকে বিমানে চড়ে এক দেশ থেকে অপর দেশে যাওয়া যায়, সেসব বিমানবন্দরকে বলা হয় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। অপর দিকে দেশের অভ্যন্তরে যেসব বিমানবন্দর থেকে দেশের এক স্থান থেকে অপর স্থানে যাওয়া যায়, সেসব বিমানবন্দরকে বলা হয় অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মাধ্যমে ভ্রমণের ক্ষেত্রে একজন যাত্রীর পাসপোর্ট থাকা অত্যাবশ্যক। এরূপ ভ্রমণে আগমন ও বহির্গমন উভয় ক্ষেত্রে একজন যাত্রীকে তার পাসপোর্টে আগমন ও বহির্গমনের তারিখ সংবলিত সিল গ্রহণ করতে হয়। আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ভ্রমণের ক্ষেত্রে যাত্রীদের মানভেদে একজন যাত্রী কী পরিমাণ মালামাল বহন করতে পারবেন তা বিভিন্ন বিমান সংস্থা কর্তৃক নির্ধারিত করে দেয়া থাকলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে ছাড় পরিলক্ষিত হয়।

আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে বিমান উড্ডয়নের নির্ধারিত সময়ের তিন ঘণ্টা আগ থেকে চেকইনের কাজ শুরু হয়। চেকইনের সময় একজন যাত্রীর কাছ থেকে তার মালামাল গ্রহণ করা হয় এবং তার জন্য নির্ধারিত আসনে বসার অনুমতিপত্র (বোর্ডিং কার্ড) দেয়া হয়। চেকইন-পরবর্তী ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ থেকে পাসপোর্টে প্রস্থান (ডিপারচার) সিল গ্রহণ করতে হয়।

পৃথিবীর প্রতিটি দেশের রাজধানী শহরে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রয়েছে। তবে এসব বিমানবন্দরের অবস্থান দেশভেদে রাজধানী শহরের কেন্দ্রস্থল থেকে ২০-১০০ কিলোমিটার অবধি দূরে হয়ে থাকে। যেকোনো দেশের রাজধানী শহর ছাড়া অপরাপর শহরের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলো শহরের কেন্দ্রস্থল থেকে কিছুটা দূরে অবস্থিত হয়ে থাকে। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোর অবস্থান শহর থেকে দূরে হওয়ার কারণে দূরত্বের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে একজন যাত্রীকে তার গৃহ বা হোটেল থেকে যাত্রা শুরু করতে হয়। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে আমাদের দেশের মতো যানজট না থাকার কারণে গৃহ বা হোটেল থেকে নির্ধারিত সময়ে যাত্রা করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিমানবন্দরে পৌঁছাতে একজন যাত্রীকে কোনো ধরনের অসুবিধায় পড়তে হয় না। কিন্তু আমাদের দেশের ক্ষেত্রে যানজট ও ভিভিআইপিদের চলাচল সুবিধায় সড়ক অবরোধের কারণে প্রায়ই যাত্রীদের যথাসময়ে বিমানবন্দরে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বিপত্তি ঘটে।

যেসব যাত্রী উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা থেকে আমাদের রাজধানী শহর হজরত শাহজালাল রহ: আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন, তাদেরকে ট্রানজিটসহ ১৬ থেকে ২৪ ঘণ্টা অবধি বিমান ও ট্রানজিট সংশ্লিষ্ট বিমানবন্দরে অবস্থান করতে হয়। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, চীন প্রভৃতি দেশ থেকে ভ্রমণের ক্ষেত্রে বিমানে অবস্থান উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার তুলনায় স্বল্পতর হলেও ট্রানজিটের ক্ষেত্রে যাত্রাকাল দীর্ঘায়িত হয়।

আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে যাত্রার সময় একজন যাত্রীকে বাইরে যাওয়ার সময় চেকইন-পরবর্তী তার পাসপোর্টে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ থেকে প্রস্থান সিল নিতে হয়। অপর দিকে আসার ক্ষেত্রে একজন যাত্রীকে তার পাসপোর্টে আগমন-পরবর্তী ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ থেকে আগমনের (অ্যারাইভাল) সিল গ্রহণ করে মালামালের জন্য নির্ধারিত কনভেয়ার বেল্টের সামনে অপেক্ষা করতে হয়। অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রে দেখা যায়, একজন যাত্রীর বিমান থেকে অবতরণের পর ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক তার পাসপোর্টে আগমনসংক্রান্ত সিল গ্রহণ-পরবর্তী কনভেয়ার বেল্টের সামনে উপস্থিত হওয়া মাত্রই তার মালামালের সন্ধান পেয়ে থাকেন। যেকোনো দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কত দ্রুত একজন যাত্রীর আগমনবিষয়ক কার্য সমাধা-পরবর্তী তার মালামাল কনভেয়ার বেল্টের মাধ্যমে তার সামনে উপস্থাপনের ব্যবস্থা করতে পারে, এর ওপর বিমানবন্দরটির সক্ষমতা এবং দেশটির সামগ্রিক সামর্থ্য নির্ভর করে।

আমাদের রাজধানী শহরের হজরত শাহজালাল রহ: আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সবচেয়ে নিকটস্থ বিদেশী বিমানবন্দর হলো ভারতের কলকাতার নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। ঢাকা থেকে কলকাতা ভ্রমণের ক্ষেত্রে যাত্রাসময় এক ঘণ্টার কম হলেও একজন যাত্রীকে বিমান উড্ডয়নের চার বা পাঁচ ঘণ্টা আগে তার গৃহ বা হোটেল ত্যাগ করতে হয়। অন্যান্য দেশ থেকে আমাদের ঢাকায় ভ্রমণের ক্ষেত্রেও বিমান উড্ডয়নের নির্ধারিত সময়ের চার-পাঁচ ঘণ্টা আগে একজন যাত্রীকে ঘর বা হোটেল ত্যাগ করতে হয়। বিমানে যাওয়ার সময় যত বেশি দীর্ঘতর হয়, যাত্রীদের তত বেশি অসুবিধা ও অস্বস্তির মধ্যে পড়তে হয়। যেকোনো যাত্রীর বিমান থেকে অবতরণের পর প্রত্যাশা, দ্রুত ইমিগ্রেশনের কাজ সমাধা-পরবর্তী তার মালামাল গ্রহণ করে ঘরে বা হোটেলে পৌঁছানো। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রে একজন যাত্রীর এমন প্রত্যাশা পূরণ হলেও আমাদের দেশের ক্ষেত্রে এটি সহজে পূরণ হওয়ার নয়।

সচরাচর সাধারণ যাত্রী হিসেবে যারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে ঢাকা হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন, অবতরণ-পরবর্তী স্বল্প সময়ের মধ্যে তাদের ইমিগ্রেশন-বিষয়ক কার্যাবলি সমাধা হলেও মালামাল পাওয়ার ক্ষেত্রে যে বিড়ম্বনা, তা প্রত্যেক যাত্রীর জন্য অসহনীয় দুর্ভোগ ও ভোগান্তির কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। আমাদের ডিজিটালাইজেশন ও উন্নয়নের মহাসড়কে অবস্থানের কথা বললেও বিমানবন্দরে একজন যাত্রীর মালামাল পাওয়ার ক্ষেত্রে যে দুর্ভোগ ও ভোগান্তি, তা ডিজিটালাইজেশন ও উন্নয়নের মহাসড়ক উভয়কে ম্লান করে দেয়। একজন সাধারণ যাত্রীর বিমানভ্রমণ সময় যা-ই হোক না কেন, হজরত শাহজালাল র: আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মালামাল পাওয়ার জন্য তাকে কনভেয়ার বেল্টের সামনে দুই থেকে চার ঘণ্টা পর্যন্ত দণ্ডায়মান অবস্থায় অপেক্ষা করতে হয়। স্বল্পতর যাত্রাপথের যাত্রীদের জন্য এটি কিছুটা সহনীয় হলেও দীর্ঘতর যাত্রাপথের ট্রানজিট সংশ্লিষ্ট যাত্রীদের জন্য এটি যে অসহনীয় ও অবর্ণনীয় দুর্ভোগ ও ভোগান্তি হিসেবে দেখা দেয়, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

হজরত শাহজালাল রহ: আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যেসব বিমান সংস্থা তাদের বিমান পরিচালনা করে, এগুলোর মালামাল যাত্রীদের কাছে পৌঁছানোর দায়িত্ব বাংলাদেশ বিমান পালন করে থাকে। বাংলাদেশ বিমান তার নিজস্ব যাত্রীসহ অপরাপর বিমান সংস্থার যাত্রীদের কাছে তাদের মালামাল যে নির্ধারিত সময়ে পৌঁছে দিতে পারে না, এর দায় সম্পূর্ণরূপে এ সংস্থাটির ওপর বর্তায়। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের বিমান সংস্থা নিজ নিজ দেশের বিমানবন্দরগুলোতে যাত্রীদের মালামাল পৌঁছে দেয়ার দায়িত্বে ন্যস্ত। এসব বিমান সংস্থা খুব দ্রুতই যাত্রীদের মালামাল তাদের কাছে পৌঁছে দিয়ে নিজেদের ও বিমানবন্দরের সুনাম অক্ষুণ্ন রাখতে সমর্থ হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আমাদের ব্যর্থতার মূলে রয়েছে অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা, কর্মে অবহেলা ও সর্বোপরি দায়িত্বজ্ঞানের অভাব।

আমাদের দেশের বিমানযাত্রীদের যে অংশটি ভিআইপি নামধারী, তারা একজন সাধারণ যাত্রীর মতো নিজে তার চেকইন, ইমিগ্রেশন-বিষয়ক কার্যাবলি ও মালামাল গ্রহণের কার্য সমাধা করেন না। তারা বিমানবন্দরে আগমন-পরবর্তী ভিআইপি লাউঞ্জে অবস্থান করেন এবং তাদের সাথে আসা তাদের সহকারী তাদের বহির্গমন ও আগমনের সময় চেকইন, ইমিগ্রেশন ও মালামাল গ্রহণের কার্য সমাধা করে থাকেন। এসব ভিআইপি দেশের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ব্যক্তি। ভিআইপিদের মালামালের ট্যাগে প্রায়োরিটির কথা উল্লেখ থাকায় একজন সাধারণ যাত্রীর মতো তাদের মালামালপ্রাপ্তিতে সচরাচর বিলম্ব ঘটে না। একজন সাধারণ যাত্রী দীর্ঘ বিমান ভ্রমণের পর মালামালপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে যে দুর্ভোগ ও ভোগান্তির শিকার হন, আমাদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ভিআইপিদের অনুরূপ দুর্ভোগ ও ভোগান্তির মুখোমুখি না হওয়ার কারণে তাদের পক্ষে সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগ ও ভোগান্তি অনুধাবন কখনো সম্ভব নয়।

আমাদের যেসব ভিআইপি বিমানবন্দরে ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহারসহ বিশেষ সুবিধা ভোগ করে থাকেন, তারা কেউ বিদেশের কোনো বিমানবন্দরে অনুরূপ সুবিধা ভোগ না করলেও সেখানকার ব্যবস্থাপনা উন্নত ও সমৃদ্ধ হওয়ায় তাদেরকে কখনো ইমিগ্রেশনের কার্য সমাধা ও মালামাল পেতে বিড়ম্বনার মুখোমুখি হতে হয় না।

আমাদের দেশ ছাড়া পৃথিবীর সব দেশেই ভিআইপি লাউঞ্জগুলো পরিচালনার দায়িত্ব বেসরকারি সংস্থার ওপর ন্যস্ত এবং যেকোনো ব্যক্তি চাইলে নির্ধারিত অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এসব ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহারের সুযোগ নিতে পারেন। আমাদের ভিআইপিদের আগমন ও প্রস্থানের সময় এক থেকে ২০ জন অবধি ব্যক্তি তাদের সাথে ভিআইপি লাউঞ্জে অবস্থান করেন। এ জন্য ভিআইপি ও তাদের সাথে অবস্থানরত ব্যক্তিদের কোনো অর্থ প্রদান করতে হয় না। অথচ একজন সাধারণ যাত্রীর আগমন ও প্রস্থানকালে তার কোনো আত্মীয় বা বন্ধু বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে চাইলে তাকে ৩০০ টাকা প্রদান করতে হয়। এ রকম ৩০০ টাকা প্রদানের পর জনৈক ব্যক্তি আগমন এলাকায় অপেক্ষমাণ থাকাবস্থায় টয়লেট ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলে তথায় গিয়ে টয়লেটের দুরবস্থা দেখে সেটি ব্যবহার হতে নিজেকে নিবৃত্ত রাখেন। এ ব্যক্তির ইতঃপূর্বে ভিআইপিদের আগমন ও প্রস্থানের সময় একাধিকবার তথায় অবস্থানের সুযোগ ও তথাকার টয়লেট ব্যবহারের সুযোগ হয়েছিল। তাই আক্ষেপ করে ওই ব্যক্তিকে বলতে শোনা গেল, যারা কোনো ধরনের অর্থ প্রদান ছাড়াই ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহার করছে, তাদের জন্য পরিচ্ছন্ন ও ব্যবহার উপযোগী টয়লেট আর যারা অর্থ দিয়ে আগমন ও বহির্গমন এলাকায় প্রবেশ করছে তাদের জন্য অপরিচ্ছন্ন ও ব্যবহার অনুপযোগী টয়লেট।

একজন বিদেশী যখন আমাদের বিমানবন্দর ব্যবহার করে আমাদের দেশের ভেতরে ঢোকেন, তখন বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনা দেখেই তিনি দেশটির সক্ষমতা ও সামর্থ্য বিষয়ে ধারণা লাভ করেন। আমাদের বিমানবন্দর বিষয়ে আমাদের দেশের সাধারণ ভ্রমণকারীদের ধারণা যেমন সুখকর নয়, অনুরূপ বিদেশীদের ধারণাও সুখকর নয়। আমাদের বিমানবন্দরে যে সংস্থাটি যাত্রীদের মালামাল বিমান থেকে নামিয়ে কনভেয়ার বেল্টে তুলে দেয়ার দায়িত্বে নিয়োজিত, এদের অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা, কর্মে অবহেলা এবং সর্বোপরি দায়িত্বজ্ঞানের অভাবের কারণেই যে মালামালপ্রাপ্তিতে যাত্রীদের অযথা সময়ক্ষেপণ ও বিড়ম্বনা- এটি সবার জানা থাকলেও কেন এ সমস্যাটির সুরাহা হচ্ছে না, এ প্রশ্নটি দেশের সাধারণ যাত্রীদের- যারা প্রতিনিয়ত মালামাল পেতে বিমানবন্দরে দুর্ভোগ ও ভোগান্তির শিকার।

লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান,
রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
E-mail: iktederahmed@yahoo.com

সুত্র-নয়াদিগন্ত