সুমন্ত আসলাম::
ক্লাস সিক্সে ওঠার পর, ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রে যে ইংরেজি রচনাটির প্রতি আমরা গভীর নজর দিতাম, সেটি হলো- দি কাউ। এক বছর পরপর রুটিনমাফিক এ রচনাটি বার্ষিক পরীক্ষায় আসত। কোনো কোনো সময় প্রতি বছরই আসত। তাই প্রাথমিক বিদ্যালয় শেষ করে উচ্চ বিদ্যালয়ে পা দিয়েই নতুন বইগুলোর অনেক প্রথম পড়ার মধ্যে ওই ‘দি কাউ’ রচনাটি মুখস্থ করে ফেলতাম আমরা। বুঝে হোক, না বুঝে হোক, প্রায় হাজার শব্দ সংবলিত ইংরেজি ওই রচনাটি নিউরনে গেঁথে ফেলতাম। স্যার জিজ্ঞেস করতেই গড়গড় করে উগরে দিতাম; পরীক্ষার খাতায় লিখে ফেলতাম অ-তে অজগর, আ-তে আমের মতো। আর ওই দি কাউ ইংরেজি রচনাটির প্রথম বাক্যটি ছিল- দি কাউ ইজ এ ডমেস্টিক অ্যানিম্যাল। বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায়- গরু একটি গৃহপালিত জন্তু।

পণ্ডিত নগেন মুন্সী স্যার বাংলা দ্বিতীয় পত্র পড়াতেন আমাদের। সিরাজগঞ্জের জ্ঞানদায়িনী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন তিনি। ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের স্যার একদিন স্কুলে না আসায় তার ওপর দায়িত্ব পড়ল সেদিনের ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের ক্লাসটা নেওয়ার।

স্যার ক্লাসে এলেন এবং কী একটা অজানা কারণে দি কাউ রচনাটি পড়াতে শুরু করলেন। গৃহপালিত ব্যাপারটা তিনি বোঝাতে লাগলেন; মুগ্ধ হয়ে আমরা তা শুনতে লাগলাম। সারা ক্লাস তথা সারা স্কুলের সবচেয়ে দুষ্টু ছাত্র ছিল ক্ষুুদিরাম; সংক্ষেপে যাকে আমরা ডাকতাম ক্ষুদু। ওই প্রতিভাধর দুষ্টুটি পড়ত আবার আমাদের ক্লাসেই। বেঞ্চ থেকে হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে ও বলল, ‘স্যার, আপনি বললেন- গৃহে যাদের পালা হয়, তারা গৃহপালিত। কিন্তু একটা প্রাণীকে আমরা কেউ গৃহে পালি না, অথচ নিয়মিত আমাদের গৃহেই থাকে। আমরা কি তাকে গৃহপালিত বলব?’

স্বভাবসুলভ ব্যক্তিত্ব ছড়ানো হাসি দিয়ে স্যার বললেন, ‘প্রাণীটির নাম কী?’
ক্ষুদু বিন্দুমাত্র সময় না নিয়ে বলে ফেলল, ‘টিকটিকি।’
স্যার জুতসই একটা উত্তর দেওয়ার জন্য ভাবছিলেন, তার আগেই ক্ষুদু ওর মাথার পেছনটা এমনি চুলকাতে চুলকাতে বলল, ‘স্যার, গৃহপালিত শব্দটা শুনলেই কেমন যেন মনে হয়- ওটি একটি অবহেলিত ব্যাপার, কিন্তু তা আবার উপকারীও।’

স্যার না বোঝার ভান করে বললেন, ‘একটু খুলে বলো তো?’

‘গৃহপালিত শব্দটা বললে প্রথমেই মনে আসে গরুর কথা। নিরীহ শ্রেণির এই প্রাণীটিকে আমরা সারাজীবন অবজ্ঞা করি, অবহেলার চোখে দেখি। অথচ ওটা মানুষের চেয়ে মহান, মানব জাতির চেয়ে শ্রেষ্ঠ।’

‘কীভাবে?’ বেশ আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন স্যার।

‘আমরা মানুষরা একটা সময় গরুর দুধ খেয়ে বড় হই, কিন্তু গরুর বাচ্চার জন্য মানুষের ও রকম কিছু প্রয়োজন হয় না।’

‘ঠিক।’

‘আবার এই যে আমি-আপনি সুন্দর সুন্দর জুতো পায়ে দিই, তা কিন্তু ওই গরুর চামড়া দিয়ে তৈরি। মানুষ গরুর চামড়া ব্যবহার করে, কিন্তু গরু মানুষের চামড়া ব্যবহার করে না কখনও।’
‘এটাও ঠিক।’

‘পুষ্টির জন্য আমরা গরুকে যখন-তখন জবাই করি, কিন্তু গরুর পুষ্টির জন্য তাজা ঘাসই যথেষ্ট। মানুষের মাংস তো দূরের কথা, মানুষের কোনো কিছুই লাগে না তাদের।’
‘যথার্থ বলেছো তুমি।’

‘আরও একটা খারাপ ব্যাপার আছে- মানুষকে গালি দেওয়ার সময় আমরা অনেক ক্ষেত্রে গরু শব্দটি ব্যবহার করি; গরু কখনও গালি দেয় না। আর স্লিপ অব টাংয়ের মতো দিলেও তখন মানুষ শব্দটা মুখে আনে না।’
‘এসব কথা বলে তুমি কী বুঝাতে চাচ্ছো?’

‘গৃহপালিত শব্দটা আমরা যতই তাচ্ছিল্যভাবে নিই না কেন, যতই গরুর ছবি ভেসে উঠুক না কেন, ওটার প্রতিশব্দ আসলে- উপকারী।’
‘ঠিক, ঠিক।’ স্যার আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ক্লাস শেষ হওয়ার ঘণ্টা পড়ে যাওয়ায় আর কিছু বলতে পারেন না। ক্ষুদুর দিকে তাকিয়ে মোলায়েম একটা হাসি দেন তিনি।

আমরা সেদিনই স্যারের মুখে প্রথম ও রকম হাসি দেখেছিলাম।

অবশ্য আমেরিকান বিপ্লবী আল জেন পু অন্য রকম একটা কথা বলেছেন- ‘গৃহপালিত চাকুরিজীবীরা বড়ই অসহায়। তারা তাদের বসদের খামখেয়ালির শিকার হয় সব সময়।’

লেখক এবং কবিরা মনের কথা লেখেন। মাঝে মাঝে বলেও ফেলেন। আর তাই তো জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদও বলেছেন, ‘আমরা আর গৃহপালিত বিরোধী দল হতে চাই না।’

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে- যারা গৃহপালিত, সারাজীবন তাদের গৃহপালিত হয়েই থাকতে হয়। সেটা গরু-ভেড়া-ছাগলই হোক, মোরগ-মুরগিই হোক, কুকুর-বিড়াল-খরগোশই হোক। এক ধরনের অভ্যস্ততা তৈরি হয়ে যায় তাদের মধ্যে। হু.মু. এরশাদ যেহেতু তার পুরো বাক্যটার মধ্যে বলেছেন- ‘আর গৃহপালিত বিরোধী দল হতে চাই না’ এবং এটা দ্বারা পক্ষান্তরে দ্ব্যর্থহীন স্বীকার করেছেন- তিনি গৃহপালিত বিরোধী দলে পরিণত হয়েছিলেন, ছিলেন। সুতরাং তিনি সেটা থেকে বের হয়ে আসতে পারবেন কি-না, সেটা সময়ের ব্যাপার। কারণই ওই যে- গৃহপালিত ব্যাপারটা অভ্যস্তের। তাই তো রূঢ় রসগল্পের কথাটা মনে পড়ে যায় আমাদের- সংসারে আমরা সবাই কমবেশি গৃহপালিত। নানা যন্ত্রণা সয়েও আমাদের অধিকাংশ মেয়ে সারাদিনের সংসার-ধর্ম পালন করেন ওই গৃহপালিত হয়েই। এ ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় নেই- এটা ঠিক না; বরং আপনজনদের ভালোবেসেই তারা গৃহছাড়া হতে চান না কখনোই।

আর আমরা ছেলেরা? যতই ঠাট-বাট করে সময় কাটাই না কেন, দিন শেষে, কখনও মাঝ রাত্রিতে ঘরের দরজায় এসে মিনতির স্বরে বলি, ‘এই, দরজাটা একটু খোলো না।’ তারপর আপনজনের হাতের ঠাণ্ডা পানি সেবন করতে করতে গৃহপালিত প্রাণীর মতো গা-টা এলিয়ে দিই বিছানায়। জাবর কাটতে থাকি সারা দিনের সুখ-দুঃখের। ব্রিটিশ অভিনেত্রী সিয়েনা মিলার অবশ্য অনেক আগেই ঘোষণা করছেন, ‘আমি সত্যিকার অর্থেই একজন গৃহপালিত।’ আর আমেরিকান অভিনেত্রী মে ওয়েস্ট বলেছেন, ‘মানুষ সাধারণত দু’ধরনের মানুষকে পছন্দ করে- এক, আমদানিকৃত, দুই. গৃহপালিত।’

আসুন, এখন থেকে আত্মস্বীকৃত গৃহপালিত নেতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে পছন্দ করতে শুরু করি আমরা। কারণ গৃহপালিত ব্যাপারটা খারাপ না; উপকারী!