নিজস্ব প্রতিবেদক॥

বুড়িগঙ্গায় এক সময় নানা জাতের মাছ পাওয়া গেলেও এখন আর তা মিলছে না। তবে প্রায়ই মিলছে লাশ। এর কোনোটি অজ্ঞাত, আর কোনোটির পরিচয় রয়েছে। এত লাশ কোত্থেকে বুড়িগঙ্গায় আসছে সে সম্পর্কে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও জ্ঞাত নন।

থানা ও হাসপাতাল সূত্র জানায়, গত এক বছরে বুড়িগঙ্গা থেকে উদ্ধার হয়েছে ৪২টি লাশ। এর মধ্যে ১৭টির পরিচয় মিলেছে আর অজ্ঞাত রয়ে গেছে ২৫টি। বেওয়ারিশ হিসেবেই এগুলো দাফন হয়েছে। গতকাল পর্যন্ত একটি লাশ হাসপাতাল মর্গে পড়ে ছিল।

হাসপাতাল মর্গ ও পুলিশ সূত্র জানায়, বুড়িগঙ্গা থেকে উদ্ধারকৃত লাশের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। এই লাশ নিয়ে অনেকেরই অনেক সন্দেহ-সংশয় রয়েছে। একের পর এক এভাবে লাশ উদ্ধারের ঘটনায় অনেকে আতঙ্কিতও। ওয়াইজঘাটের এক শ্রমিক সিরাজ উদ্দিন বলেন, আগে গোসল বুড়িগঙ্গা নদীতেই সারতেন। এখন পানিও যেমন নষ্ট হয়ে গেছে; আর প্রায়ই লাশ উদ্ধারের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্কও রয়েছে। ফলে এখন আর কেউ বুড়িগঙ্গায় গোসল করেন না। স্থানীয়দের ধারণা, অন্য কোনো এলাকায় মানুষ হত্যার পর লাশগুলো নিরাপদ স্থান বুড়িগঙ্গায় ফেলে রেখে যায়। নৌকা ডুবে কিংবা লঞ্চে উঠতে গিয়ে পড়ে নিহত হয়েও কিছু লোক লাশ হয়েছেন।

থানা সূত্র জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারিতে বুড়িগঙ্গা থেকে উদ্ধার হয়েছে ২টি লাশ। ফেব্রুয়ারিতে ৩টি, মার্চে ৩টি, এপ্রিলে ৫টি, মে মাসে ৩টি, জুনে ৩টি, জুলাইয়ে ৫টি, আগস্টে ৫টি, সেপ্টেম্বরে ৭টি, অক্টোবরে ৫টি এবং নভেম্বরের ২৭ তারিখ পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে ৫টি লাশ। যাদের লাশ উদ্ধার হয়েছে এবং পরিচয় জানা গেছে তার মধ্যে যশোরের কেশবপুর থানা বিএনপির নেতা আবু বকর সিদ্দিকও রয়েছেন। গত ১৯ নভেম্বর দুপুরে তার লাশ উদ্ধার হয়। স্থানীয়রা লাশটি ভাসতে দেখে পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ লাশটি উদ্ধার করে মিটফোর্ড হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করে। পরে তার পরিবারের সদস্যরা লাশটি মর্গে গিয়ে শনাক্ত করেন। তিনি ঢাকায় এসেছিলেন দলীয় মনোনয়নের জন্য। ঢাকায় এসে একটি আবাসিক হোটেলে উঠেছিলেন। ১৮ নভেম্বর তিনি হোটেল থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হন। ওই রাতে তার পরিবারের কাছ থেকে অপহরণকারীরা এক লাখ ৭০ হাজার টাকাও হাতিয়ে নেয়। এর ৩ দিন পরে ২২ নভেম্বর অজ্ঞাত এক যুবকের লাশ উদ্ধার হয়। কেরানীগঞ্জ দক্ষিণ থানা পুলিশ লাশটি উদ্ধার করে। নিহতের শরীরে অসংখ্য আঘাতের দাগ রয়েছে। তার হাত এবং পা ভাঙা। ধারণা করা হচ্ছে হাত-পা ভেঙে নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করে লাশটি বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেয় দুর্বৃত্তরা। মাঝে মধ্যে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে অনেকে মারা যান। গত ১২ সেপ্টেম্বর একই পরিবারের তিনজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। পটুয়াখালী যাওয়ার জন্য তারা লঞ্চে উঠতে গিয়েছিলেন। নৌকা দিয়ে লঞ্চে উঠতে গিয়ে দু’টি নৌযানের মধ্যে পড়ে তাদের নৌকাটি ডুবে যায়। ঘটনার পরপরই দু’টি লাশ এবং পরদিন একটি লাশ উদ্ধার হয়।

কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ওসি শাকের মোহাম্মদ যুবায়ের বলেন, স্থানীয় ছাড়াও বিভিন্ন লোকের তথ্যের ভিত্তিতে বুড়িগঙ্গার বিভিন্ন স্পট থেকে লাশগুলো উদ্ধার করা হয়েছে। প্রথম ধাপে ইউডি মামলা নিলেও পরে অভিযোগের ভিত্তিতে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। আবার কোনো কোনোটির ক্ষেত্রে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের পর পুলিশই হত্যা মামলা দায়ের করে। অনেক মামলায় আসামিও গ্রেফতার হয়েছে।

মিটফোর্ড হাসপাতাল মর্গ ইনচার্জ শ্যামল গতকাল বলেন, বুড়িগঙ্গা থেকে উদ্ধারকৃত লাশের বেশির ভাগই আসে অজ্ঞাত হিসেবে। গত ২২ নভেম্বর উদ্ধারকৃত লাশটি এখনো মর্গে পড়ে আছে অজ্ঞাত হিসেবে। শ্যামল বলেন, অজ্ঞাত লাশগুলো বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার হাতে তুলে দেয়া হয় দাফন বা সৎকারের জন্য। সূত্র : নয়া দিগন্ত