নিজস্ব প্রতিবেদক::

বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের শূন্য পদ লাখ ছাড়িয়েছে। শিক্ষকের এই সঙ্কট নিয়েই চলছে দেশের হাজারো প্রতিষ্ঠান। ফলে মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম পুরো শিক্ষাকার্যক্রমে। যদিও নিয়োগের জন্য শূন্য পদের এই শিক্ষকদের তালিকা হালনাগাদ করছে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)।

গতকাল সোমবার ছিল তালিকা সংগ্রহ ও সংশোধনের শেষ দিন। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী শূন্য পদের শিক্ষকের সংখ্যা এখন লাখের ওপরে।

গতকাল পর্যন্ত এনটিআরসিএর কাছে শূন্য শিক্ষক পদের যে খসড়া তালিকা এসেছে সেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয় বাদেই মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ এবং মাদরাসার দাখিল আলিমসহ বিভিন্ন পর্যায়ে শূন্য শিক্ষকের সংখ্যা ৬০ হাজারের ওপরে। তবে সারা দেশ থেকে আসা শূন্য শিক্ষকের এনটিআরসিএর চূড়ান্ত তালিকায় এই সংখ্যা আরো বাড়বে। অন্যদিকে গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রীর দেয়া তথ্য অনুযায়ী প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকের শূন্য পদের সংখ্যা ২৮ হাজার ৮৩২টি। সব মিলিয়ে স্কুল কলেজ এবং মাদরাসার বিভিন্ন পর্যায়ে শূন্য শিক্ষক পদের সংখ্যা দাঁড়াবে লাখেরও ওপরে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১৪ জানুয়ারি আগে থেকে শুরু হয়ে গত ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত এনটিআরসিএ সারা দেশ থেকে শূন্য শিক্ষকের তালিকা সংগ্রহ করে। সরকারি মোবাইল অপারেটর কোম্পানি টেলিটকের সহায়তায় স্বতন্ত্র একটি সফট্ওয়ারের মাধ্যমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের শূন্য শিক্ষকের তালিকা প্রেরণ করে। তবে সেই তালিকায় ভুলত্রুটি থাকায় পূর্বের তালিকা সংশোধন করে আবার তালিকা পাঠাতে ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় বর্ধিত করা হয়। এরপরও অনেক প্রতিষ্ঠান তালিকা সংশোধন করে পাঠাতে পারেননি। ফলে বিশেষ অনুরোধে সময় আরো চার দিন বাড়িয়ে গতকাল ১৭ ফেব্রুয়ারি সোমবার পর্যন্ত তালিকা প্রেরণের তারিখ আবারো বর্ধিত করা হয়।

রাজধানীর ইস্কাটনের এনটিআরসিএর কার্যালয়ে গতকাল সোমবার সরেজমিন গিয়ে দেখা গেল অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক ও প্রতিনিধিরা তাদের আগের তালিকার ভুলত্রুটি সংশোধনের জন্য হাতে লেখা আবেদন নিয়ে এসেছেন। কয়েকজন শিক্ষকের সাথে কথা বলে জানা গেল তারা অনলাইনে সফট্ওয়ারের মাধ্যমে সঠিক পন্থায় তালিকা প্রেরণ করতে পারেননি। সেখানে অনেক ভুলভ্রান্তি হয়েছে। তাই নতুন করে তালিকা সংশোধনের আবেদন করছেন তারা। নড়াইল থেকে আসা একটি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক (নাম প্রকাশ করতে চাননি) জানান, আমরা আগেই তালিকা প্রেরণ করেছি। কিন্তু সেখানে হাইস্কুলের স্থলে ভুলে কলেজ লেখা হয়েছে। তাই আজ সেটি সংশোধনের জন্য একটি আবেদন নিয়ে এসেছি। একই ধরনের ভুল সংশোধনের জন্য এসেছেন নরসিংদীর দুটি মাদরাসার শিক্ষক। তারা জানান, যদিও ভুল সংশোধনের জন্য অনলাইনেই আবেদন করতে হয় তারপরও আজ যেহেতু শেষ তারিখ তাই আমরা নিজেরাই এসেছি। অনলাইনে একটি ফরম পূরণ করতে হয়। আমরা সেখানে গিয়েও সংশোধন করতে পারছি না।

এনটিআরসিএ সূত্র জানায়, সরকারের নির্দেশনা মোতাবেক বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাদের শিক্ষকের শূন্যপদের তালিকা পাঠিয়েছেন। তবে এই তালিকায় সংখ্যাগত ভুল বেশি হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে হয়তো একজন শিক্ষক লাগবে কিন্তু সেখানে তারা তিনজন শিক্ষকের চাহিদা দিয়েছেন। এসব ভুল সংশোধনের জন্যই মূলত দুই দফায় সময় বাড়িয়ে সুযোগ দেয়া হয়েছে।

সূত্র আরো জানায়, কোনো প্রতিষ্ঠান শূন্যপদের ভুল তথ্য দিলে সেসব পদে সুপারিশ করা প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে হবে। প্যাটার্নের অতিরিক্ত শূন্যপদের চাহিদা দিলে শিক্ষকের শতভাগ বেতন প্রতিষ্ঠান থেকে দিতে হবে। তা না হলে প্রতিষ্ঠান প্রধানের এমপিও বন্ধ করা হবে। আর ওই স্কুল কমিটির বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে। এমপিও নীতিমালায়ও এমনটিই বলা আছে। এদিকে গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন জানিয়েছেন, ২০১৯ সালের বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের ২৮ হাজার ৮৩২টি পদ শূন্য আছে। এর মধ্যে প্রধান শিক্ষকের ৭ হাজার ১৮টি এবং সহকারী শিক্ষকের ২১ হাজার ৮১৪টি পদ শূন্য আছে।

তালিকা হালনাগাদ করার কাজে নিয়োজিত এনটিআরসিএর এক কর্মকর্তা জানান, অনলাইনেই সব ভুল তথ্যের সংশোধন করা যাচ্ছে। যেসব প্রতিষ্ঠান শূন্যপদে তথ্য দিতে ভুল করেছে তারা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করে যেসব ভুল সংশোধন করতে পারবেন। জেলার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শূন্যপদের তথ্য যাচাই করবেন জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা। তথ্য সঠিক থাকে তা সঠিক বলে সাবমিট দিবেন তিনি। আর তথ্যে কোনো ভুল থাকলে তা সংশোধন করে এনটিআরসিএতে সাবমিট করবেন জেলা শিক্ষা কর্মকর্তারা।

এনটিআরসিএর উপ-পরিচালক (শিক্ষাতত্ত্ব ও শিক্ষামান) মো: শাহীন আলম চৌধুরী গতকাল জানান, সারা দেশ থেকে আমরা যে তালিকা পেয়েছি সেটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। যেহেতু তালিকা আসছে অনলাইনে আর এটি নিয়ে কাজ করছে টেলিটক তাই সব তথ্য সমন্বয় করে এটি চূড়ান্তভাবে তালিকা প্রস্তুত করতে একটু সময় লাগবে। তবে এখন পর্যন্ত আমরা খসড়াভাবে যে সংখ্যাটি পেয়েছি সেটি ৫৮ হাজারের মতো হবে। তবে এটিই চূড়ান্ত নয়। কম বেশি হতে পারে।

উল্লেখ্য, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এন্ট্রি লেভেলে শিক্ষক নিয়োগের লক্ষ্যে প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ করে এনটিআরসিএ। বাছাই করা প্রার্থীদের আর কোনো পরীক্ষা দিতে হয় না। ইতোমধ্যে দু’টি চক্রে ২০১৬ এবং ও ২০১৯ সালে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এন্ট্রি লেভেলের শিক্ষক নিয়োগে প্রার্থী সুপারিশ করেছে এনটিআরসিএ। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তৃতীয় চক্রে শিক্ষক নিয়োগ দিতে কার্যক্রম শুরু করেছে এনটিআরসিএ।