কোথাও অসহায়ত্ব, কোথাও দাম্ভিকতা, কোথাও হতাশা; অধিকন্তু সব কিছু ছাড়িয়ে আমলা ও তাদের ‘প্রভু’দের আধিপত্য এখন সর্বত্র। আমলারা হয়ে উঠেছেন অপ্রতিরোধ্য। এর পেছনের বড় কারণ, বর্তমান সরকার এখন আমলানির্ভর। এ ছাড়া কোনো উপায় নেই। কারণ সরকার জানে, তারা অনির্বাচিত। জনগণের ভোটে যখন সরকার নির্বাচিত নয়, সেহেতু আস্থার প্রশ্নে সরকার ও জনগণ পরস্পরবিরোধী অবস্থানে যেমন থাকার কথা তেমনি রয়েছে। গণতন্ত্রের পথ নিয়ন্ত্রণ বা রুদ্ধ করার জন্য আমলাদের বর্তমান কর্মকাণ্ডই যথেষ্ট; এর বেশি কিছু প্রয়োজন হয় না। তারাও ‘গণতন্ত্র’বিহীন সমাজব্যবস্থা পছন্দ করেন। কারণ গণতন্ত্র থাকলে মানুষের মত প্রকাশসহ প্রজাতন্ত্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জবাবদিহি করতে হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী-কর্মকর্তাদের দ্বারা গুরুতর অপরাধ সংক্রমিত হওয়ার একমাত্র কারণ, তারা বাস্তবে জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে।

২৯-১২-২০১৭ ইং জাতীয় পত্রিকার খবর- ‘গত ১১ আগস্ট দুপুর ১২টায় ধুরাইল বাজারে সিরাজুল ইসলামের দোকানের সামনে থেকে ঝর্ণা বেগমকে ধরে নিয়ে যায় ওসি কামরুল ইসলাম মিয়া। থানায় নিয়ে তার কাছে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করেন। টাকা না দিলে তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ওইদিন রাত ৩টায় ওই নারীকে ওসির রুমে নিয়ে আসা হয়। এ সময় ধুরাইল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুমন এবং ওসি তাকে উলঙ্গ করে শারীরিক নির্যাতন করেন।’

পত্রিকান্তরে প্রকাশ- চেয়ারম্যান ঘটনা অস্বীকার করে বলেন, তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। হালুয়াঘাট থানার ওসি বলেছেন, চুরির মামলায় ঝর্ণা বেগমকে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছিল। তবে তাকে থানায় রেখে নির্যাতনের বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন।’

ঝর্ণা বেগম ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে যদি আমরা এ মুহূর্তে কোনটা সত্য, কোনটা মিথ্যা তা নির্ধারণে দ্বিধাগ্রস্ত হই; তবে যুক্তির খাতিরে যে কথাটি প্রকাশ্যেই উপস্থাপিত হয়, তা হলো- (১) প্রথমত, পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ নতুন নয়, যা বারবার সংঘটিত হচ্ছে; (২) দ্বিতীয়ত, একজন সাধারণ মাদরাসাশিক্ষকের কন্যা, যাদের নুন আনতে পান্থা ফুরায় সে কেন প্রভাবশালী একজন পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে তাকে বর্বরোচিত নির্যাতনের অভিযোগ আনবে? এর পেছনে স্বার্থ কী? এত সাহস মেয়েটি পেতে পারে কি? বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান বলেছিলেন, ‘মাছের রাজা ইলিশ ও দেশের রাজা পুলিশ।’

যা হোক, পুলিশ হেফাজতে নির্যাতন বন্ধ করার জন্য ২০১৩ সালে একটি আইন প্রণীত হয়েছে। কিন্তু আইনের তোয়াক্কা করা হয় না, কারণ তারা মনে করেন, টিকে থাকার জন্য জনগণের চেয়ে পুলিশকেই সরকারের বেশি প্রয়োজন। সে কারণেই পুলিশ বর্তমানে কার্যত জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে। এ অবস্থায় পুলিশের চেইন অব কমান্ড ভেঙে গেছে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে নারায়ণগঞ্জে একজন অ্যাডিশনাল পুলিশ সুপারের সাথে বেয়াদবি বা নির্দেশ অমান্য করা হয়েছে। এ ধরনের অনেক ঘটনাই ঘটেছে, যেখানে পুলিশের নিম্নপদস্থ কর্মকর্তারা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ডিঙিয়ে চলছেন। এর মূল কারণ পোস্ট কিংবা পজিশনের চেয়ে সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলে কার কতটুকু সখ্য রয়েছে, তার পরিমাণের ওপর নির্ভর করছে ক্ষমতার মাপকাঠি। আমলারা প্রজাতন্ত্র বা রাষ্ট্রের কর্মচারী। তারা কর্তব্য পালনে নিরপেক্ষ থাকার কথা, সেখানে তারা প্রকাশ্যে দলবাজি করে নিজেরা অবৈধ বিত্তবৈভবের মালিক বনে যাচ্ছেন; অন্য দিকে জনগণকে তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করছেন। প্রতারিত ও ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তারাই, যারা সরকারের ব্র্যান্ডেড সমর্থক নয়।

শিক্ষামন্ত্রীর অসহায় ‘আত্মসমর্পণে’র বিষয়টি পর্যালোচনা করলেই অনির্বাচিত সরকারের আমলাতন্ত্র কতটুকু বেপরোয়া তা উপলব্ধি করা যায়। তিনি বলেছেন- ‘আপনারা ঘুষ খাবেন, তবে তা সহনীয় পর্যায়ে।’ একজন মন্ত্রী নিজেকে কতটুক অসহায় মনে করলে তার অধীনস্থ আমলাদের উদ্দেশে এটা বলতে পারেন। প্রাথমিক শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, আমরা লুটপাট করেছি, তবে কাজও করেছি। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, আমাদের এমপিরা টাকার বিনিময়ে কাজ করে। তবে এটাকে আমি ঘুষ বলব।

স্বভাবগতভাবেই ‘রাবিশ’ বা ‘ইডিয়ট’ বলা তার মজ্জাগত অভ্যাস। কোনো কোনো মন্ত্রীর বক্তব্যের মধ্যে দাম্ভিকতা ও মূর্খতা খুঁজে পাওয়া গেলেও শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য অত্যন্ত সরল সমীকরণ, যা আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি নগ্ন প্রতিচ্ছবি। আমলারা দুর্নীতির মধ্যমণি, অথচ দুর্নীতিবাজ ধরার দায়িত্বও তাদের ওপর। আমলাদের বিষয়সম্পত্তি, অর্থবিত্ত সব কিছুই ধরাছোঁয়ার বাইরে। নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রতি তারা যতটুকু না সচেতন, তার চেয়ে বেশি বাকপটু এবং পাকা পাকা কথা বলে জনগণকে জ্ঞান দিতে বেশি অভ্যস্ত।

আরো একটি ভোটবিহীন একতরফা জাতীয় নির্বাচন করার জন্য সরকারের প্রয়োজন আমলাদের। কারণ তারা একতরফা নির্বাচনের প্রধান হাতিয়ার। ভোটার উপস্থিত থাকবে না, অথচ মিডিয়ায় ভোটের বাক্স ভর্তি হওয়ার প্রচার হতে থাকবে, এটা তো আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার কারসাজি; যাতে সত্যের সাথে কোনো সম্পর্ক থাকে না।

সরকার মুখে যাই বলুক না কেন, তারা আরো একতরফা নির্বাচন চান। কারণ তাদের ভিশন পুর্ণ হওয়ার জন্য ২০৪১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকতে তারা বদ্ধপরিকর। এ জন্যই প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে মন্ত্রীরা লাগাতার বিএনপিবিদ্বেষী কথা বলে বেড়াচ্ছেন। কোথাও কোথাও কথা বলতে যেয়ে তাদের যেন হিতাহিত জ্ঞান লোপ পেয়ে যায়।

দেশের প্রবীণ ব্যক্তি অর্থমন্ত্রী ৩১ ডিসেম্বর সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সাথে আলোচনা কালে বিএনপিকে একটি ইডিয়ট পার্টি এবং বিএনপি নেতাদের ইডিয়ট বলেছেন। ইডিয়ট (Idiot) একটি ইংরেজি শব্দ, Medical Dictionary পৃষ্ঠা-১৪৮ এবং বাংলা একাডেমি প্রণিত English to Bengali Dictionary-তে ৩৭৮ পৃষ্ঠায় ইডিয়ট শব্দের যে অর্থ করা হয়েছে, তা ছাড়াও লেখাপড়া জানা-অজানা সবাই ইডিয়ট শব্দার্থটি বোঝেন। Law Dictionary (পৃষ্ঠা-২৭৪) Idiot বলতে বুঝানো হয়েছে- ‘জড় বুদ্ধি। হিন্দু আইন অনুসারে জন্মসূত্রে জড় বুদ্ধিসম্পন্ন কোনো ব্যক্তি উত্তরাধিকারী নিযুক্ত হন না। চুক্তি আইন অনুসারে জন্মসূত্রে জড় বুদ্ধিসম্পন্ন কোনো ব্যক্তি চুক্তি সম্পাদন করতে পারে না।’ কোনো মন্ত্রী একটি রাজনৈতিক দল বা দলের নেতাদের ‘ইডিয়ট’ বলে সম্বোধন করতে পারেন কি? অর্থমন্ত্রীর বিভিন্ন বক্তব্যের কারণে তার ভারসাম্যহীনতার বিষয়ে এমনকি জাতীয় সংসদে আলোচনা হয়েছে। তার তীব্র সমালোচনার পরও তিনি সংশোধিত হননি, বরং কাণ্ডজ্ঞানহীন বক্তব্যের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী নিজেও বিএনপি বা জিয়া পরিবারের সমালোচনার সময় শব্দচয়নে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েন। বিএনপির প্রতি ব্যক্তি হিসেবে দুঃখ ও ক্ষোভ থাকা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দেয়ার সময় যেন নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েন। মন্ত্রীদের দায়িত্ব হয়ে পড়ে আরেকটু বাড়িয়ে বলা। শ্লোক রয়েছে- ‘রাজা যা বলেন, পারিষদ বলে তার শতগুণ।’ বাংলাদেশের পারিষদরা সে নীতি অনুসরণ থেকে পিছিয়ে নেই। ফলে কলাকৌশল ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে, পরিস্থিতি ঘোলাটে করার জন্য যা সহায়ক হিসেবে কাজ করবে। আবারো একতরফা নির্বাচনের জন্য পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে সরকারের চেষ্টা থাকবে এবং এতে যদি ভিশন সফল হয়(!), এই আশা। কিন্তু সমালোচনার জন্য রাজনৈতিক অঙ্গনে সিনিয়র মন্ত্রীরা যে দৃষ্টান্ত রেখে যাচ্ছেন, তার যদি পাল্টা জবাব আসে তার ব্যাখ্যা তারা কী দেবেন? অন্যের গায়ে থু থু ফেললে নিজের গায়ে এসে পড়ে প্রাকৃতিক নিয়মে। সাধারণ মানুষ মনে করে, অন্যকে ইডিয়ট বলার আগে নিজের দিকে তাকানো উচিত। প্রশাসনের চেইন অব কমান্ড ভেঙে গণতন্ত্রের ফানুস উড়িয়ে এখন তারা জাতির ঐক্য, সম্প্রীতি ও জাতিসত্তার চেইন অব কমান্ড ভাঙতে ব্যস্ত। এর মূল কারণ তাদের দাম্ভিকতা ও মূর্খতা। একাডেমিক ডিগ্রি থাকলেই কেউ সুশিক্ষিত হয় না, যদি তার মন-মগজ থেকে মুর্খতা দূর না হয়।

লেখক : তৈমূর আলম খন্দকার, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা
E-mail: taimuralamkhandaker@gmail.com