মো. মইনুল ইসলাম: অর্থনৈতিক উন্নয়ন আমরা অবশ্যই চাই; কিন্তু সামাজিক উন্নয়নও কম কাম্য নয়। সামাজিক উন্নয়নের একটি বড় পরিচয় হল উন্নত সংস্কৃতি। আমাদের সামাজিক উন্নয়নের পথে বড় বাধা হল শাসকশ্রেণী।

রাজনীতিক, আমলা ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠী নিয়ে গঠিত এ শ্রেণীটিই বর্তমানে দেশ শাসন করে। জাতীয় জীবনের যে কোনো দিকে দৃষ্টিপাত করলেই দেখা যাবে, দেশে বিরাজমান নানা অন্যায়-অবৈধ কাজের সঙ্গে উপরিউক্ত তিন গোষ্ঠীর যে কোনো একটির নেতাকর্মীরা জড়িত।

বর্তমানে দেশে যে মাদকবিরোধী অভিমান চলছে, সেটাকে দৃষ্টান্ত হিসেবে ধরলেই দেখা যাবে- কোনো না কোনো রাজনীতিক, আমলা বা ব্যবসায়ী অবৈধ এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।

কিছুদিন আগে একটি দৈনিকের শীর্ষ শিরোনাম ছিল- সাংসদ ও নেতাদের প্রশ্রয়ে খুলনায় মাদকের ব্যবসা। প্রতিবেদনটিতে সরকারদলীয় স্থানীয় সংসদ সদস্য, মহানগর ছাত্রলীগ নেতা ও সাবেক প্রতিমন্ত্রীর দুই ভাইয়ের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে শহরে মাদকের রমরমা ব্যবসার অভিযোগের কথা বলা হয়েছে।

সম্প্রতি পুলিশের সহায়তায় কারাগারে বসে ‘বাবা আরিফ’ নামে এক কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ীর ঘটনাটি নারায়ণগঞ্জে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এ ঘটনায় পুলিশ কর্মকর্তাসহ ৯ জন গ্রেফতার হয়েছে। শুধু রাজনীতিক ও পুলিশ নয়, খোদ মাদক নিয়ন্ত্রণ দফতরের কর্মকর্তারাও যে এ ধরনের জঘন্য ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, তা-ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

দেশব্যাপী হরেক রকমের অন্যায়, অবৈধ ও অপরাধমূলক কাজের মদদদানকারীদের মধ্যে এমন মানুষ খুব কমই পাওয়া যাবে, যারা রাজনীতিক, ব্যবসায়ী বা আমলা নয়। এটাও দেখা যায়, ব্যবসায়ীই রাজনীতিকে পরিণত হয়েছে এবং রাজনীতিকে ধনী হওয়ার প্রধান উপায় হিসেবে বেছে নিয়েছে।

দু’একজন ধনী ব্যবসায়ীকে জানি, যারা নিজেরাই বলেছেন- রাজনৈতিক ক্ষমতা থাকলে ব্যবসায় ভালো সুবিধা হয়। সব সরকারের আমলেই দেখা যায়, কিছুসংখ্যক সংসদ সদস্য নানা ধরনের তদবির ও প্রভাব প্রয়োগ করে ৫ বছরেই প্রচুর ধন-সম্পদের মালিক হয়ে যান। এর একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বগুড়ার সংসদ সদস্য হাবিবুরের নাম গণমাধ্যমে দেখা গেল।

এরকম এমপিদের দৃষ্টান্ত সব সরকারের আমলেই দেখা যায়, যাদের কাজ হল, নিজের আখের গোছানো। অথচ সংসদ সদস্য বা এমপির কাজ আইন প্রণয়ন ও জাতীয় নীতিনির্ধারণ।

গত বছর সংসদে সংসদ সদস্যদের কাজকর্ম মূল্যায়ন করে টিআইবি যে গবেষণা প্রতিবেদন দিয়েছে, তাতে দেখা যায়- আইন প্রণয়ন কাজে সংসদ সদস্যদের আগ্রহ কম। মাত্র ৯ জন আইনের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। আর একই বছরে কোনো ধরনের আলোচনায় অংশ নেননি ৩৬ জন সংসদ সদস্য। অভিজ্ঞতা থেকে অনুমান করতে অসুবিধা হয় না- তাদের আসল আগ্রহ আখের গোছানোয়, আইন প্রণয়নে নয়।

ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ বা চট্টগ্রাম শহরে এবং সীমান্ত এলাকার থানাগুলোয় পুলিশ কর্মকর্তাদের পদায়ন বা বদলির কাজে সহায়তার বিনিময়ে মোটা অঙ্কের আয়-রোজগার যে কিছুসংখ্যক রাজনীতিকের ধনী হওয়ার একটি বড় উৎস, এ খবরও বাজারে চালু আছে।একই কাজ সাবরেজিস্ট্রারদেরও করতে শোনা যায়।

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকরি বা এমপিওভুক্তির ব্যাপারে রাজনীতিকদের মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়ার গল্পও নতুন নয়। বস্তুত বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতার অভাব এবং এর ফলে শিক্ষার নিুমানের কারণ হচ্ছে কিছুসংখ্যক এমপির নিয়োগ বাণিজ্য।

মোটকথা, রাজনীতিক ও আমলাদের এক অংশ বিভিন্নভাবে নতুন নতুন ফন্দি এঁটে টাকা রোজগারের কাহিনী কারও অজানা নয়। দেশবাসী উপায়হীনভাবে এটা মেনে নিতে বাধ্য হয়। কবিগুরুর ভাষায় বলতে হয়, ‘প্রতিকারহীন শক্তির অপরাধে বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।’

রাজনীতি দেশের ছাত্রসমাজের একটি অংশকেও সন্ত্রাসী ও দুর্নীতিবাজ করার ব্যাপারে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। বিএনপি ক্ষমতায় এলে ছাত্রদল এবং আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে ছাত্রলীগ উচ্চশিক্ষার বিদ্যাপীঠগুলোয় সন্ত্রাস এবং চাঁদাবাজির নায়ক হয়ে দাঁড়ায়।

দলের শীর্ষ নেতৃত্ব একদিকে জাতীয় উন্নয়নে শিক্ষার ক্রান্তিকালীন ভূমিকার কথা উচ্চারণ করেন, অন্যদিকে ছাত্রদের একটি গোষ্ঠীকে দলের লাঠিয়াল বাহিনীতে পরিণত করার প্রয়াসেরও অভাব দেখা যায় না। এ দ্বিচারিতা শিক্ষা ও জাতির সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা বললে কি ভুল হবে?

কিছুদিন আগে টিভিতে শিক্ষার ওপর এক আলোচনায় দেখলাম- বিএনপি আমলের ডাকসুর এক ছাত্রনেতা শিক্ষার সমস্যা ও সমাধানের ব্যাপারে বেশকিছু ভালো ভালো কথা বলছেন। বিএনপির কোনো এক আমলে এ নেতার নেতৃত্বে পরিচালিত চার থেকে পাঁচ ছাত্রনেতার অত্যাচারের বেশকিছু ঘটনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বচক্ষে দেখেছি।

ডাকসু ভবনে মাইক লাগিয়ে বিএনপির সমর্থনে অহেতুক অর্থহীন গলাবাজির কারণে কলাভবনের তিনতলার পূর্বদিকে ক্লাস নিতে পারতাম না। তাদেরই এক সাথী ইলিয়াস আলীকে মাঝে মাঝে দেখা যেত মধুর ক্যান্টিনের সামনে হামাগুড়ি দিয়ে কাটা বন্দুক থেকে গুলি ছুড়তে।

ইদানীং তাদেরই একজনকে দেখা গেছে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনী মিলনমেলায় জাতীয়তাবাদীদের প্রচার-প্রচারণায়। এদের প্রশংসা করেই তাদের ‘দেশনেত্রী’ বলেছিলেন- বিরোধী দলকে ঠেকাতে আমার ছাত্রদলের কর্মীরাই যথেষ্ট। অর্থাৎ জনগণের দরকার পড়ে না।

ব্যবসায়ীদের দুর্নীতির একটা বড় দৃষ্টান্ত হচ্ছে, ব্যাপক হারে ব্যাংক লুটপাট। হরেক রকমের দুর্নীতিতে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো যে জর্জরিত, তা গত এক বছরে গণমাধ্যমের খবরগুলো পর্যালোচনা করলেই পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠবে।

বিশেষ করে সরকারি ব্যাংকগুলো এ ব্যাপারে শীর্ষে আছে। হলমার্কের তানভীর ও বেসিক ব্যাংকের বাচ্চুদের মতো মানুষ এবং ভুয়া প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যাংক লুটপাটের অভিযোগ সবার কাছে পরিচিত। সরকারি ব্যাংকগুলোর ঋণ কেলেঙ্কারির ফলে তহবিল ও মূলধন ঘাটতির খবর হরহামেশাই গণমাধ্যমে আসে।

আর এর মাশুল দিতে হয় সাধারণ আমানতকারী ও করদাতাদের। জনগণের ট্যাক্সের টাকা থেকে এদের ঘাটতি পূরণ করে সরকার। এ নিয়ে সংসদে কিংবা সরকারি মহলে কোনো উদ্বেগ আছে বলে মনে হয় না।

তবে সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী ব্যাংকিং খাতের সমস্যা নিরূপণ এবং সমাধানের ব্যাপারে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করার কথা বলেছেন। এটা অবশ্য অনেক আগেই করা দরকার ছিল। যা হোক, বিলম্বে হলেও এটা হবে একটি শুভ উদ্যোগ।

আলোচিত শাসকশ্রেণীর কাজকর্ম এবং জীবনাচার দেশে একটি অশুভ, অন্যায় এবং অসৎ সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে। ফলে সমাজের শুভ, সত্য, সততা, ন্যায় এবং কল্যাণের মন্ত্রটি শুধু বহুলাংশে উপেক্ষিত নয়, এমনকি বর্জনীয় এবং হাস্যকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শুধু বোকারাই এসব ভালো ভালো কথা বলে, বিশ্বাস করে এবং সে মতে কাজ করে। বুদ্ধিমান ও চালাক-চতুর ব্যক্তিদের কাজ হল এর বিপরীত এবং তারাই সমাজে সফল মানুষ। তাদেরই ধন-সম্পদ হয় এবং তারাই সমাজে বিত্তবান এবং ক্ষমতাবান বলে পরিচিতি পায়।

ধন-সম্পদই আজকের সমাজে বড়লোক হওয়ার মাপকাঠি। তবে ক্ষমতা এবং সম্পদ অর্জনেই এ শ্রেণী সন্তুষ্ট থাকে না। এসবের প্রদর্শনেও তারা তৃপ্তি পায়। নম্রতা, ভদ্রতা এবং বিনয়ের মতো সৎ গুণাবলি তাদের জীবনাচারে খুব কমই দেখা যায়। উদ্বেগের বিষয় হল, তাদের এ শিক্ষা বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে।

বর্তমান আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় জ্ঞান এবং গুণের জন্য অতি স্বল্পসংখ্যক মানুষই প্রশংসিত এবং আদর্শায়িত হয়। কয়েক মাস আগে শিক্ষার্থীদের ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেল- ছাত্রদের একটি বড় অংশই শিক্ষকদের অনুকরণীয় আদর্শ বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বলে মনে করে না বরং তারা মনে করে, জীবনে সাফল্য লাভের জন্য অন্যায় কর্ম করাটাও তেমন দোষণীয় নয়।

জরিপে অংশগ্রহণকারী ছাত্ররা তেমন কোনো ভুল করেনি। দেশের প্রচলিত মূল্যবোধে এসব বহুলাংশে সত্য। মার্কস তাই যথার্থই বলেছেন, Ideology of a country or society is the ideology of the ruling class। অর্থাৎ একটি দেশ বা সমাজের মাতাদর্শ হচ্ছে শাসকশ্রেণীর মতাদর্শ।

তবে জনসাধারণের মন থেকে ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়, পাপ-পুণ্য এবং শুভ-অশুভবোধ লোপ পেয়েছে বলা যাবে না। কবিগুরুর ভাষায়, ‘মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ।’ অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে এ দেশের মানুষ বারবার জেগে উঠেছে এবং শোষণ ও বঞ্চনার হোতাদের ‘তখতে তাউস’ গুঁড়িয়ে দিয়েছে।

এখন সময় এসেছে দেশে একটি শক্তিশালী সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের, ফলে দেশে অপসংস্কৃতির বিপরীতে সুস্থ ও শুভ সংস্কৃতির লড়াইটি জোরদার হবে। আমাদের প্রত্যাশা, দেশের শিক্ষিত ও সচেতন মানুষ এ লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত হবেন এবং একে এগিয়ে নিয়ে যাবেন।

মো. মইনুল ইসলাম : সাবেক অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।সুত্র-যুগান্তর