এ রকম নির্বাচনই কাম্য

স্থানীয় সরকার নির্বাচন সরকার পরিবর্তনের নির্বাচন নয়, তথাপি এটা একটা পূর্বাভাস দেয় জাতীয় নির্বাচনের গতি-প্রকৃতি অনুধাবন করার। সবাই আশাবাদী আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিতব্য ঢাকা উত্তর সিটি কাপোরেশনের নির্বাচনও ‘রসিক’ নির্বাচনের মতো হবে এবং সবাই নিরাপদে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে।
গত ২১ ডিসেম্বর রংপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। রাজনৈতিক দলের প্রতীকে এখানে এটাই প্রথম নির্বাচন এবং দেশের প্রধান তিনটি রাজনৈতিক দল ছাড়াও নিজস্ব প্রতীকে অনেকেই মেয়দ পদে প্রার্থী হয়েছিলেন। রংপুর সিটি করপোরেশন হওয়ার পর প্রথম নির্বাচনটি স্থানীয়ভাবে সংগঠিত হয়েছিল যদিও অনেকেই সেটাকে রাজনৈতিকভাবেই মনে করেছিল। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে একটা চমক দেখিয়েছিল বিশেষত জাতীয় পাটির দুর্গ বলে পরিচিত রংপুরে।

কিন্তু এবারকার চিত্র ভিন্ন বলে প্রতীয়মান হয়েছে যদিও নির্বাচনের আগে শোনা গিয়েছিল যে, রংপুরে জাতীর পার্টির সমর্থকরা নৌকা প্রতীকের দিকে ঝুঁকছে যা পরবর্তী সময়ে ফলাফলে আর প্রতিফলিত হয়নি। দেখা গেল জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী বিপুল ভোটের ব্যবধানে তাদের দুই নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী (আওয়ামী লীগের নৌকা ও বিএনপির ধানের শীষ মার্কা) প্রার্থীকে পরাজিত করে এক চমক সৃষ্টি করে দিয়েছে।

এখানে উল্লেখ্য যে, রসিক এলাকায় ১৯৩টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে এবং ৭৪.৩ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়ে তাদের উপস্থিতি প্রমাণ করেছে যা এই নির্বাচনের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য, যেখানে ভোটারদের নিরাপত্তা, নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন, যোগ্য প্রার্থী মনোনয়ন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, ভ্রাম্যমাণ আদালতের ব্যাপক উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। বর্তমান নির্বাচন কমিশন গঠিত হওয়ার পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনের অংশ হিসেবে এই সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা তাদের প্রথম প্রয়াস, যাকে তারা বলছেন ‘মডেল নির্বাচন’। এই ধরনের মডেল নির্বাচন যদি আগামী দিনগুলোতেও নির্বাচন কমিশন উপহার দিতে পারে তা হলে এটি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়। এরই মধ্যে নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক সংস্থা কিংবা রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ কিছু দল আলোচনায় মুখর রয়েছে।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের পরাজিত প্রার্থী সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, নির্বাচন অবাধ কিংবা নিরপেক্ষা না হওয়ায় এই দলের প্রার্থী নির্বাচনের ফলাফল বয়কট করেছেন। আবার ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ বলছে, রংপুরে নৌকায় ভোট কমে যাওয়ার কারণ খতিয়ে দেখবে। আবার রসিক নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে ২৮টি সংগঠন সমন্বয়ে গঠিত ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপ (ইডব্লিউজি) মন্তব্য করেছে যে, রসিক নির্বাচন দেশের স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোর মধ্যে অন্যতম সেরা। এই সংস্থাটির ফলাফলের ভিত্তি হলো নির্বাচনী এলাকার ১৯৩টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৫টি ওয়ার্ডের ২৬টি ভোটকেন্দ্র পর্যবেক্ষণের ফলাফল। এতে বলা হয় ‘রসিক’ নির্বাচন ছিল সামগ্রিকভাবে শান্তিপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য, যেখানে ভোটাররা ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে থেকে সুশৃঙ্খলভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছেন। এখন বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে হঠাৎ করে নৌকার পালে ভাটা পড়েছে কেন? কেনই বা ভোটারদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেল নির্বাচনী মাঠ থেকে? এর একটা কারণ হতে পারে যে, প্রমাণ করা একটি দলীয় নির্বাচিত সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব যা আগামী ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার একটি আগাম বার্তা। এতে ক্ষতাসীন দলের ভিত্তি আরো শক্ত হয়েছে বলে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন। আর বিজয়ী দলের নেতারা মনে করছেন, তারা তাদের আগেকার ঐতিহ্যকে পুনরুদ্ধার করেছেন।

এখানে উল্লেখ্য, নির্বাচনের দুইদিন আগ থেকেই জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এবং একই দলের প্রতিমন্ত্রী রংপুর শহরে অবস্থান করছিলেন এই কারণে যে, তারা উভয়েই রংপুরের ভোটার। এরই অন্তরালে তারা তাদের প্রভাব খাটিয়েছেন ভোটারদের ওপর কারণ ঐতিহ্যগতভাবে জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠার পর এখানকার স্থানীয় বা আঞ্চলিক রাজনীতিতে এই দলের প্রভাব মজবুত বলে ধরা হয় যদিও সময় সময় এর ব্যতিক্রমও দেখা গিয়েছে কিন্তু এই নির্বাচনে তা হয়নি। রংপুরবাসী তাদের দলের নেতার মনোনীত প্রার্থীকেই বেছে নিয়েছেন তাদের নগর পিতা হিসেবে কোনো সহিংসতা ছাড়াই। অথচ কিছুদিন আগেই রংপুরের পাগলাপীর এলাকায় গঠিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা অনেককে ভাবিয়েছিল। এই নির্বাচনে তার প্রভাব পড়ার কথা কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।

আবার বিশ্লেষকরা বলছেন, এই নির্বাচনে সারাদেশের মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল বিশেষ কিছু যেমন ২০১৯ সালের জাতীয় নির্বাচন, নির্বাচন নিয়ে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন, নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থা ও প্রান্তিক পর্যায়ে দলের কার্যক্রম সুসংগঠিতকরণ ইত্যাদি। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সরকার পরিবর্তনের নির্বাচন নয়, তথাপি এটা একটা পূর্বাভাস দেয় জাতীয় নির্বাচনের গতি-প্রকৃতি অনুধাবন করার। সবাই আশাবাদী আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিতব্য ঢাকা উত্তর সিটি কাপোরেশনের নির্বাচনও ‘রসিক’ নির্বাচনের মতো হবে এবং সবাই নিরাপদে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে। অনির্বাচিত তত্ত্ববধায়ক সরকারের ধারণার বিলুপ্তি ঘটবে এই প্রত্যাশা রইল।

ড. মিহির কুমার রায় : ডিন, সিটি ইউনির্ভাসিটি, ঢাকা।