রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন

গুণগত মানের উত্তরণ জরুরি

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন সরগরম হতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন পেতে অর্ধশত নতুন রাজনৈতিক দল তৎপর। এসব দলের মধ্যে কয়েকটির পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনে আবেদনপত্র জমা দেয়া হয়েছে বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছে। নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত আবেদনপত্র জমা দেয়া যাবে। আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই করে আগামী মার্চে নিবন্ধিত নতুন দলের তালিকা প্রকাশ করবে ইসি। অন্যদিকে নিবন্ধিত দলের তথ্যও হালনাগাদ করা হচ্ছে। কেননা, শুধু নিবন্ধিত দলগুলোরই সুযোগ থাকবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়ার। রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবেই বিবেচিত হয়ে আসছে।

বিধান মতে, নিবন্ধন প্রত্যাশী দলকে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যে কোনো নির্বাচনে অন্তত একটি সংসদীয় আসন পেতে হবে। তা না হলে যে কোনো একটি জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে ওই আসনে প্রদত্ত মোট ভোটের ৫ শতাংশ পেতে হবে। অথবা দলের একটি সক্রিয় কেন্দ্রীয় কার্যালয় থাকতে হবে, দেশের অন্তত ২১টি প্রশাসনিক জেলায় কার্যকর কমিটি থাকতে হবে এবং অন্তত ১০০ উপজেলা/ মেট্রোপলিটন থানায় কমপক্ষে ২০০ ভোটারের সমর্থনের প্রামাণিক দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। ইতোমধ্যে নাগরিক ঐক্য, কাজী জাফর আহমেদের জাপা, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন, বাংলাদেশ ইসলামিক পার্টি, বাংলাদেশ জনতা পার্টি, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, বাংলাদেশ জালালী পার্টি, সোনার বাংলা উন্নয়ন লীগ এবং এনডিএম আবেদন জমা দিয়েছে বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছে। আমরা মনে করি, বিধি মোতাবেক নিবন্ধন প্রত্যাশী দলগুলো প্রদত্ত তথ্য সঠিকভাবে যাচাই হওয়া আবশ্যক। পাশাপাশি, নিবন্ধিত দলগুলো শর্ত প্রতি পালন করছে কিনা তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাও অত্যন্ত যৌক্তিক।

বলাই বাহুল্য, ইসির এই নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু থেকেই বেশ সাড়া ফেলেছে। দেশের রাজনৈতিক দলগুলো শর্ত পালন করলে নিবন্ধন পাবে এ কথা যেমন ঠিক, তেমনি সাংগঠনিক ভিত্তির পাশাপাশি রাজনীতির গুণগত মানের উত্তরণের বিষয়টিও ভাবা দরকার বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। নিবন্ধনের কোনো বিধান লঙ্ঘিত হলে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বাতিল বলে গণ্য করার কথা বিধিতে উল্লেখ আছে। ২০১০ সালে ‘ঐক্যবদ্ধ নাগরিক আন্দোলন’ নামের রাজনৈতিক দলকে খুঁজে না পেয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছিল ইসি। পরে দলটি ইসির সঙ্গে যোগাযোগ করে। এখনো অনেক দলকে মাঝে মাঝে ইসি কর্মকর্তারা খুঁজে পান না বলেও গণমাধ্যমে খবর আসে। নিবন্ধন আছে অথচ কার্যক্রম নেই, এমন পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে উদ্বেগের।

২০০৮ সালে নিবন্ধন প্রথা চালুর পর এ পর্যন্ত ৪২টি দল নিবন্ধিত হয়েছে। এর মধ্যে স্থায়ী সংশোধিত গঠনতন্ত্র দিতে না পারায় ২০০৯ সালে ফ্রিডম পার্টির নিবন্ধন বাতিল করে ইসি এবং আদালতের রায়ে ২০১৩ সালে জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করা হয়। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, দলের কেন্দ্রীয়সহ সব স্তরের কমিটি নির্বাচিত হওয়া, ২০২০ সালের মধ্যে সব কমিটিতে ৩৩% নারী প্রতিনিধিত্ব রাখা, ছাত্র-শিক্ষকসহ পেশাজীবী কোনো সহযোগী সংগঠন রাখায় নিষেধাজ্ঞা এবং ওয়ার্ড-থানা-উপজেলা ও জেলা কমিটির মতামত নিয়ে কেন্দ্রীয় বোর্ড সংসদে প্রার্থী বাছাই করবে। তথ্যমতে, অনেক ইসলামী দলে ১ ভাগও নারী নেই। নিবন্ধিত দলের মধ্যে ইসলামী ও ধর্মভিত্তিক দল রয়েছে ১১টি। এর মধ্যে এমন দলও আছে, যাদেও কেন্দ্রীয় বা তৃণমূলের কোনো কমিটিতেই কোনো নারী সদস্য নেই। ‘শর্ত পূরণসাপেক্ষে নিবন্ধন পাওয়ার পরও এই জটিলতা অত্যন্ত পরিতাপের। আমরা মনে করি, নিবন্ধন টিকিয়ে রাখার দায় যেমন সংশ্লিষ্ট দলের তেমনি ভাবে এ ব্যাপারে খতিয়ে দেখার আইনানুগ দায় সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ইসি অস্বীকার করতে পারে না।

সর্বোপরি বলতে চাই, শর্তপূরণ কাগজ-কলমে না হয়ে যেমন বাস্তবসম্মত হওয়া বাঞ্ছনীয়, তেমনি ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থের বাইওে দেশ ও জনগণের কল্যাণে রাজনীতির গুণগত মানের পরিবর্তনেও দলগুলোকে নিতে হবে যথাযথ উদ্যোগ। জনগণের মঙ্গল চাইলে দলগুলোকেও আরও জনকল্যাণে নিবেদিত হওয়ার বিকল্প থাকতে পারে না। যথাযথ নিরীক্ষার মধ্যদিয়ে দলগুলো নিবন্ধনের ব্যাপারে ইসির কঠোর ভূমিকা আমরা প্রত্যাশা করি।