আলফাজ আনাম:: আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আছে। নির্বাচনের আগে সরকারবিরোধী যেকোনো আন্দোলন থেকে দূরে রাখতে এই তরুণদের কাছে টানা কিংবা নিয়ন্ত্রণে রাখা নিয়ে তাদের মধ্যে আছে নানা ধরনের ভাবনা। সম্প্রতি যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, তারও প্রধান টার্গেট হচ্ছেন এই তরুণরা। যাতে তাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ানো যায়। গত ১০ বছরে দেশে নতুন ভোটারের সংখ্যা বেড়েছে দুই কোটি ২৫ লাখের বেশি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩০-এর মধ্যে। আর ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী ভোটারের সংখ্যা ১৫ শতাংশের মতো। অর্থাৎ প্রতিটি আসনে গড়ে এই বয়সী ভোটারের সংখ্যা ৫০ হাজারের কম-বেশি। এই ভোটাররা হবেন আগামী নির্বাচনের প্রধান নির্ণায়ক শক্তি।

নতুন এই ভোটাররা সবাই ডিজিটাল প্রযুক্তি, বিশেষ করে স্মার্টফোনের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাথে সংযুক্ত। বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) সর্বশেষ হিসাব বলছে, দেশে ৯ কোটি পাঁচ লাখ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। এর মধ্যে আট কোটি ৪৭ লাখ মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। দেশে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৫ কোটি পাঁচ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। একাদশ সংসদ নির্বাচনে ভোট দেবেন ১০ কোটি ৪১ লাখ মানুষ। এই হিসাবে অনুমান করা যায় দেশের প্রতিটি ভোটারের কাছে মোবাইল ফোন রয়েছে। বাংলাদেশের ভোটের রাজনীতিতে প্রচারণার প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে মোবাইল ফোন।

ক্ষমতাসীন দলের নেতারা মনে করে থাকেন, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটের বিজয়ের পেছনে কাজ করেছে তরুণদের ভোট। তারা দাবি করে থাকেন ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতির কারণে এই সাফল্য এসেছিল। ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রীপুত্র ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের নেতৃত্বে ডিজিটাল বাংলাদেশ তারা কায়েম করতে পেরেছেন। যা সরকারের অর্জন হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু এই ডিজিটাল প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার এখন নানা ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করছে। কারণ, ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের মধ্যে এমন ধারণা বদ্ধমূল হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের কর্মকাণ্ড যেভাবে উঠে আসছে তাতে আগামী নির্বাচনে তাদের বিপর্যয়ের প্রধান কারণ হয়ে উঠতে পারে ফেসবুকের মতো মাধ্যমগুলো।

সম্প্রতি কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে যে আন্দোলন গড়ে ওঠে তাতে নেতৃত্ব ছাড়াই সারা দেশের শিক্ষার্থীরা সঙ্ঘবদ্ধ ও সুপরিকল্পিতভাবে মাঠে নেমে পড়ে। এই আন্দোলনের পেছনে শিক্ষার্থীরা যেসব যুক্তি ও দ্রুত প্রচারণার কৌশল গ্রহণ করে তা মোকাবেলার মতো অবস্থা সরকারের ছিল না। এই আন্দোলন যে ভোটের রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে তা সরকারের নীতিনির্ধারকরা বেশ ভালোভাবেই উপলব্ধি করতে পেরেছেন। ১৪ দলীয় জোটের নেতা ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘এ কথা সত্য যে, নিরাপদ সড়ক ও সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা মনের মধ্যে গভীর ক্ষত নিয়ে ফিরে গেছে। এই ক্ষত আগামী নির্বাচনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বিষয়টিকে অবহেলা করা যাবে না। এই ক্ষত নিবারণের জন্য সরকার ও ক্ষমতাসীনদের জোট ১৪ দলের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।’ (প্রতি আসনে কম-বেশি ৫০ হাজার ভোটার শিক্ষার্থী-চাকরিপ্রত্যাশী : প্রথম আলো ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮)

শিক্ষার্থীদের সাম্প্রতিক দু’টি আন্দোলনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়েছে। সরকার এই আন্দোলনের পেছনে গুজব রয়েছে বলে প্রচারণা চালানোর চেষ্টা করেছে। সরকারনিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমে এই আন্দোলন গুজবের ওপর ভিত্তি করে চলছে এমন কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে সরকারের এসব প্রচারণা সাধারণ মানুষের মধ্যে কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা পায়নি। ফেসবুককে মনে হয় সরকার সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক মাধ্যম হিসেবে দেখছে। ফেসবুকের সাথে সরকার এক ধরনের বোঝাপড়ায় আসতে পেরেছে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু পেজ বন্ধ করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে তরুণদের মধ্যে ফেসবুকের ব্যবহার এত বেশি যে, তা খুব কার্যকর ফল আনবে না। পৃথিবীর যেসব শহরে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি তার মধ্যে ঢাকা হচ্ছে দ্বিতীয়। গত বছরে (২০১৭) আন্তর্জাতিক দুটি প্রতিষ্ঠানের যৌথভাবে চালানো এক বৈশ্বিক জরিপে এ চিত্র পাওয়া গেছে। জরিপটি চালিয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘উই আর সোশ্যাল’ আর কানাডাভিত্তিক ডিজিটাল সেবা প্রতিষ্ঠান হুটস্যুইট। অনলাইনে প্রকাশিত ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসের হিসাব অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ফেসবুক ব্যবহারকারী আছেন ব্যাংকক শহরে, তিন কোটি। এর পরই রয়েছে ঢাকা। এখানে সক্রিয় ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২২ মিলিয়ন বা দুই কোটি ২০ লাখ। তৃতীয় স্থানে ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা।

আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে সামাজিক মাধ্যমগুলো যাতে ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের ভীতি তৈরি করা যায় সে লক্ষ্য নিয়ে নতুন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। যাতে স্বাধীন সাংবাদিকতা বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়তে পারে। মোটা দাগে এই আইনে শাস্তির ক্ষেত্রে যে মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে, তাতে ফেসবুকে সরকারের সমালোচনা করলে শাস্তির মুখামুখি হতে হবে। এই আইনের শাস্তি সম্পর্কে যেসব বিবরণ রয়েছে যেমন :

১. ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত কোনো তথ্য-উপাত্ত দেশের সংহতি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ বা জনশৃঙ্খলা ক্ষুণ্ন করলে বা জাতিগত বিদ্বেষ ও ঘৃণা সৃষ্টি করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তা ব্লক বা অপসারণের জন্য টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসিকে অনুরোধ করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে পুলিশ পরোয়ানা বা অনুমোদন ছাড়াই তল্লাশি, জব্দ এবং গ্রেফতার করতে পারবে।

২. আইনে অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট যুক্ত করা হয়েছে। ফলে কোনো সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ সংস্থার অতি গোপনীয় বা গোপনীয় তথ্য-উপাত্ত ধারণ, প্রেরণ বা সংরক্ষণ করা হয়, বা প্রকাশ করে বা কাউকে করতে সহায়তা করে ওই আইন ভঙ্গ করলে এই আইনে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের সাজা হতে পারে, ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
৩. কোনো সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ সংস্থার অতি গোপনীয় বা গোপনীয় তথ্য-উপাত্ত যদি কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ধারণ, প্রেরণ বা সংরক্ষণ করা হয়, তাহলে তা গুপ্তচরবৃত্তি বলে গণ্য হবে এবং এ জন্য পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে।

৪. আইন অনুযায়ী ডিজিটাল মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা জাতির পিতার নামে প্রোপাগান্ডা বা প্রচারণা চালালে বা মদদ দিলে অনধিক ১০ বছরের কারাদণ্ড বা এক কোটি টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।

৫. ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে আক্রমণাত্মক, মিথ্যা, ভীতি প্রদর্শক তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ, মানহানিকর তথ্য প্রকাশ, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো, ঘৃণা প্রকাশ, অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ, প্রকাশ বা ব্যবহার করলে জেল জরিমানার বিধান রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে তিন থেকে সাত বছরের কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে। দ্বিতীয়বার এরকম অপরাধ করলে ১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।

সরকারের এই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মাধ্যমে যেকোনো অভিযোগ তুলে মানুষের বাকস্বাধীনতা হরণ করা এবং শাস্তি দেয়া সম্ভব হবে। সরকারের ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী সংসদে বলেছেন, ভবিষ্যতে ডিজিটাল যুদ্ধ হবে। মোস্তাফা জব্বার বলেছেন, ‘এই যুদ্ধে যদি রাষ্ট্রকে নিরাপত্তা দিতে না পারি, রাষ্ট্র যদি বিপন্ন হয় তাহলে অপরাধটা আমাদেরই হবে।’ অতীতে সব দেশে একনায়কত্ববাদী শাসকরা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার নামে এভাবে মানুষের মুক্তচিন্তা ও কথা বলার স্বাধীনতা হরণ করেছে। সরকারের সমালোচকরা হয়ে পড়ছেন অপরাধী কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী।
এই আইন প্রণয়নের সাথে সাথে বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। জাতীয় সংসদে ২০ সেপ্টেম্বর তথ্যপ্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট তারানা হালিম বলেছেন, ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব, গুগলসহ সব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া, মিথ্যা বানোয়াট তথ্য প্রচারের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সরকার। আগামী অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ থেকেই তথ্য মন্ত্রণালয় গঠিত গুজব মনিটরিং সেল সংবাদমাধ্যমকে জানিয়ে দেবে এই তথ্যটি গুজব, এই সংবাদটি ভুয়া। সেভাবে সংবাদমাধ্যমে প্রচারের ব্যবস্থা নেয়া হবে। অর্থাৎ কোনটা খবর আর কোনটা গুজব, তা সংবাদমাধ্যমকেও নির্ধারণ করে দেবে সরকার। তারানা হালিমের সাথে সুর মিলিয়েছেন গৃহপালিত বিরোধী দলের নেত্রী রওশন এরশাদ। তিনি রাতে ফেসবুক বন্ধ রাখার দাবি তুলেছেন।

মজার ব্যাপার হলো সরকার যখন ফেসবুক, টুইটারসহ ডিজিটাল মাধ্যম নিয়ন্ত্রণের আয়োজন করছে তখন সরকারের জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা দলের নেতাকর্মীদের একাধিক ফেসবুক পেজ খুলে সরকারের পক্ষে প্রচারণা চালানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলছেন, ‘সোশ্যাল মিডিয়ায় মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি বাড়াতে আপনাদের নাতি-নাতনীদের নামে-বেনামে একটার জায়গায় ১০টা কেন, প্রয়োজনে ১০০টা ফেসবুক আইডি খুলতে বলুন। নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সম্পৃক্ত করুন।’ তার এই বক্তব্য ফেক নিউজ বা গুজব ও ভুয়া খবর প্রচারকে উৎসাহিত করতে পারে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। তিনি তার এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন, ‘আমি জেনে শুনে কোনো বেআইনি কাজ করতে বলিনি।’ আসন্ন নির্বাচনে সোশ্যাল মিডিয়ার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মি. ইমাম বলেন, ‘সামনে সোশ্যাল মিডিয়া একটা বিশাল ভূমিকা রাখবে। আমি তরুণদের বলেছি, তোমরা এই হাতিয়ারটাকে ব্যবহার করো। আমি নাতি-নাতনীর কথাটা বলেছি এ কারণে যে, আমার কাছে যারা নাতি-নাতনী তারা এখন সবাই ভোটার।’ (বিবিসি বাংলা ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮)

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, আগামী নির্বাচনে তরুণদের সামাজিক গণমাধ্যম ব্যবহার নিয়ে সরকার কতটা শঙ্কার মধ্যে রয়েছে। ২০০৮ সালে নির্বাচনে ডিজিটাল বাংলাদেশের যে স্বপ্ন তরুণদের দেখানো হয়েছিল তা এখন সরকারের জন্য দুঃস্বপ্নের কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। কিন্তু আইনের ভয় দেখিয়ে মানুষের চিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কি নিয়ন্ত্রণ করা যায়? অতীতে কেউ তা পারেনি, বরং এমন আইনের প্রয়োগ তরুণদের আরো বেশি বিক্ষুব্ধ করে তুলবে। দুর্ভাগ্য হচ্ছে আইন প্রণয়নকারীরা যাদের ওপর আইনের প্রয়োগ হয় তাদের অনুভূতি খুব কমই বুঝতে পারেন।
alfazanambd@yahoo.com
সুত্র-নয়াদিগন্ত