ড. এম এ মাননান:
৯ মে বৃষ্টিভেজা রাতটি শুধু মালয়েশিয়ানদের কাছেই নয়, বিশ্ববাসীর কাছেও স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এ রাতে তারা দেখেছে, অবাক বিস্ময়ে অবলোকন করেছে, একটার পর একটা পার্লামেন্টারি আসনের পতন হচ্ছে। টিভির পর্দা থেকে কেউ চোখ সরাচ্ছে না। একটার পর একটা প্রদেশের (স্টেট) পতনের খবর প্রচার হচ্ছে আর জনগণ অনুভব করছে মালয়েশিয়ান রাজনীতিতে হঠাৎ নেমে আসা রাজনৈতিক ভূমিকম্প। এ ভূমিকম্প মালয় রাজনীতির ল্যান্ডস্কেপটাকেই বদলে দিয়েছে। কুয়ালালামপুরের একটি হোটেলে বসে আমিও শরিক হলাম সেই ভূমিকম্প অনুভবের জগতে। ঠিক রাত ১১টার কিছুক্ষণ পর ড. মাহাথির মোহাম্মদ দাবি করলেন, পুত্রজায়া তার কোয়ালিশনের কাছে হেরেছে। ভোরের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে গেল, সুনামি থামেনি, ক্ষমতাসীন বিএন দলের ভরাডুবি ঘটিয়ে অভাবিত চমক দেখিয়ে বিরোধী জোট পাকাতান হারাতান (পিএইচ) ড. মাহাথির মোহাম্মদের নেতৃত্বে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন দখল করে নিয়েছে। ১৫ বছর আগে স্বাপ্নিক নেতা হিসেবে পরিচিত সফল বর্ণিল রাজনীতির মহারথী ড. মাহাথির যে জায়গাটি স্বেচ্ছায় ছেড়ে চলে গিয়েছেলেন, সে জায়গাটি আবার দখল করে নিতে হলো তাকে জীবনের প্রায় শেষ ভাগে এসে ৯২ বছর বয়সে তার প্রজ্ঞা দিয়ে, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে, অকল্পনীয় রাজনৈতিক কৌশল খাটিয়ে, শুধু তার কঠিন হাতে গড়া অল্প সময়ে অনেক ওপরে উঠে যাওয়া দেশটিকে দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসন আর জনধিক্কৃত কিছু পলিসির হাত থেকে বাঁচাতে। আজ জনহাসিতে উদ্ভাসিত মেঘলা রজনীতে বিশেষ মর্যাদায় আসীন হলেন তিনি। নিজের হাতে বিকশিত করা, নিজের হাতে পরিপকস্ফ করে তোলা বারাসান ন্যাশনাল দলকে তিনি নিজেই হারিয়ে দিলেন। হয়তো এ পরাজয়ের মধ্য দিয়েই দলটির দুর্নীতির কলঙ্কমোচন হবে।

তার একসময়ের প্রিয় দলটি ৬১ বছরের রাজত্ব হারাল সে দলেরই প্রাক্তন কিন্তু বর্তমানে দলের দুর্নীতির কারণে ক্ষুব্ধ একজন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর কাছে, যিনি মালয়েশিয়াকে নিজের হাতে টেনে উন্নয়নের তুঙ্গে তুলে এনেছিলেন। রাজনীতির ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে এ ঘটনাটি এবং ২০১৮ সালের ৯ মে তারিখটি। ক্ষমতাসীনরা অনেক চাতুরী করেও বাঁচতে পারেনি। ধারালো কাঁচি হাতে অনেক বিরোধী অধ্যুষিত নির্বাচনী এলাকার সীমানা কেটেছে নির্মমভাবে আর নির্বাচনী প্রচারের জন্য দেওয়া হয় মাত্র ১১ দিনের সময়।

মে মাসের ৬ তারিখে পেনাং শহরের একটি হোটেলে অবস্থান করছিলাম। এসেছি কমনওয়েলথ অব লার্নিং আয়োজিত বিশ্বের কয়েকটি দেশের উপাচার্যদের নিয়ে উচ্চশিক্ষার ওপর গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠানসহ সংস্থাটির গভর্নিং বর্ডির সভায় যোগ দিতে। বাংলাদেশ এ সংস্থাটির সদস্য। এখানে এসে শুনলাম, ৯ মে জাতীয় নির্বাচন। অথচ কোথাও কোনো প্রচার দেখছি না। নির্বাচনী হৈ-হল্লা নেই। রাস্তায় রাস্তায় শোরগোল-মিছিল-অমুক ভাই জিন্দাবাদ, তমুক ভাই নিপাত যাক- কিছুই নেই। বাংলাদেশি হিসেবে আমার কাছে বিষয়টা অবাক করে দেওয়ার মতো। ৯ মে ১০টায় কুয়ালালামপুর যাওয়ার পথে দেখলাম, শত শত মানুষ প্রচণ্ড গরমে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ভোট দিচ্ছে, শোরগোল বা উচ্চস্বরে কথাবার্তা পর্যন্ত নেই। ভোট দিচ্ছে আর চলে যাচ্ছে। কুয়ালালামপুর গিয়েও দেখি একই রকম চিত্র। মিডিয়ার কল্যাণে জানতে পারলাম, জনগণের একটা বড় অংশ কাকে ভোট দেবে, সে ব্যাপারে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছিল। তবে চাইনিজ ভোটাররা সিদ্ধান্তে স্থির, তারা কোনো অবস্থাতেই প্রধানমন্ত্রী দাতুক সেরি নাজিব রাজাকের নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন বিএনকে সমর্থন দেবে না। একটি চাইনিজ সুনামি সৃষ্টির জন্য তারা তৈরি ছিল। মূল কারণ ৬ শতাংশ জিএসটির (গুডস অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্যাক্স) কারণে অর্থনৈতিক দুর্দশা বৃদ্ধি, পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জীবনধারণের মানের অধোগতি। এদিকে মাহাথিরের পাকাতান প্রতিশ্রুতি দিয়ে বসল যে, ক্ষমতায় গেলে তারা জিএসটি বাতিল করে দেবে। আর নাজিবরা নিশ্চিত ছিলেন এই ভেবে যে, ২০১৫ সালে আরোপিত জিএসটি বিষয়টি জনগণ এ কয়েক বছরে মেনে নিয়েছে এবং এ নিয়ে এখন তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। নির্বাচন সামনে রেখে মাহাথির জিএসটি বিষয়টিকে জনগণের জীবনমানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া একটি বিষপোকা হিসেবে তুলে ধরে জনগণের পুরনো ঘায়ের ওপর লবণ ছিটিয়ে দেন। জনগণ এটিকে তাদের মনের কথা হিসেবে গ্রহণ করে। ফলে পাকাতানের প্রতিশ্রুতি সাধারণ নাগরিকরা খুশি মনে গ্রহণ করে। তাদের পুরোপুরি বিশ্বাস ছিল যে, মাহাথির অবশ্যই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন। এর আগে তিনি ক্ষমতায় থাকাকালে কাজকর্মে সততা আর স্বচ্ছতার পরিচয় দিয়ে জনগণের হৃদয়ে একটি বিশ্বস্ততার আসন তৈরি করতে পেরেছিলেন। বিশ্বাসযোগ্যতার এই পুঁজিই তার ঘরে বিশাল লভ্যাংশ এনে দেয়। ফলে ২০১৮ সালের ১৪তম জাতীয় নির্বাচন মিডিয়ার বদৌলতে ‘মালয়েশীয় সুনামি’ নামে জগদ্বাসীর কাছে উপস্থাপিত হয়।

কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপকের সঙ্গে কথা বলে এবং বিশেষজ্ঞদের আলোচনা শুনে সরকারি দলের পরাজয়ের মূল কারণগুলো বুঝতে পারলাম। প্রথমত. রাজনৈতিক ব্যক্তিদের দুর্নীতি, বিশেষত প্রধানমন্ত্রীর নিজের এবং তার দলের নেতাদের। বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে নাজিব রাজাক একটি তহবিল গঠন করেছেন; কিন্তু তহবিলের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট ব্যক্তিরা নিজদের স্বার্থে তহবিলের অর্থ ব্যবহার করেছেন। ৭০ কোটি ডলার নিজে আত্মসাৎ করার অভিযোগে অভিযুক্ত নাজিব। ওই তহবিলের ব্যাপারে আমেরিকাসহ কয়েকটি দেশে অনুসন্ধান চলতে থাকায় দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে, যা জনগণ সহ্য করতে পারছে না। এ বিষয়টি জনগণের কাছে সাধারণভাবে জটিল প্রতীয়মান হলেও ড. মাহাথির জনগণের বোঝার মতো শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে সহজবোধ্য করে জনগণের ভাষায় বিষয়টিকে তুলে ধরেছিলেন। তার ভাষা আর জনগণের ভাষার ঐক্য হওয়ায় তিনি তাদের কাছে হয়ে উঠলেন ঋষিতুল্য; দ্বিতীয়ত, সবকিছুর ওপর জিএসটির প্রভাব। নিম্ন আয়ের লোকেরা এ ট্যাক্সের ব্যাপারে ফুঁসছিল। করনীতিতে পরিবর্তন এনে সরকার বিভিন্ন দ্রব্য-সেবার ওপর ৬ শতাংশ কর আরোপ করেছে, যা লোকজন পছন্দ করেনি; তৃতীয়ত, ড. মাহাথির মোহাম্মদকে নাজিব সরকারের প্রথম দিন থেকেই হেয় করার অপচেষ্টা। জনগণের মানসপটে প্রোথিত হয়ে থাকা এ মানুষটির প্রতি সরকারি লোকদের অবমাননাকর আচরণ জনগণকে রুষ্ট করে বিপুলভাবে। আর তার প্রভাব পড়ে নির্বাচনে; চতুর্থত, আইন পরিবর্তন করে জনগণের অধিকার ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা। বাকস্বাধীনতা থেকে শুরু করে আরও অনেক কিছুর ওপর সরকারি প্রভাব খাটানোর প্রয়াস চালানো হয়েছে, যা জনগণকে আতঙ্কিত করেছে; পঞ্চমত, নিজেদের সুবিধামতো সুযোগ নেওয়ার জন্য কিছু নির্বাচনী এলাকার সীমানা পরিবর্তন, যা সংশ্নিষ্ট এলাকার জনগণকে ক্ষুব্ধ করেছে। যারা সরকারের সমর্থক ছিল তারাও বিরূপ হয়েছে।

বিভিন্নজনের সঙ্গে কথা বলে কিছু জনস্ট্র্যাটেজি সম্পর্কে জানতে পেরেছি, যা বুঝতে পারলে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক দেশের ‘নির্বাচনী রাজনীতির’ নাজুকতা (ভালনারেবিলিটি) বুঝতে সুবিধা হতে পারে-

হোয়াটঅ্যাপস ব্যবহার করে সচেতন নাগরিকরা দ্রুত মেসেজ একে অপরের কাছে পাঠিয়েছে। সবাই সজাগ ছিল। ভোটকেন্দ্রের এজেন্টরা হোয়াটঅ্যাপস দিয়ে কেন্দ্রের ফলাফল সার্বক্ষণিক নিজের লোকদের কাছে পাঠাত, তারা প্রাপ্ত মেসেজ ভাইরাল করে দিত। এজেন্টরা ভোটবাক্স গণনা কেন্দ্রে নেওয়ার সময় সঙ্গে সঙ্গে থেকেছে এবং মোবাইলে লাইভ দিয়েছে। ফলে সব ট্রান্সপারেন্ট ছিল।

সরকার ভোটের দিন বুধবার সরকারি ছুটি ঘোষণা করে আর মাহাথির ঘোষণা করেন যে, তার দল জয়লাভ করলে বৃহস্পতিসহ শুক্রবারও ছুটি থাকবে। ফলে গ্রামে ছুটিতে যাওয়া শ্রমিকরা মহাখুশিতে নিজ নিজ এলাকায় মাহাথিরের জোটের পক্ষে ভোট দিয়েছে, যাতে শুক্রবারের ছুটিসহ শনি ও রোববার ছুটি পেয়ে গ্রামে থাকতে পারে। সহজে বিশ্বাসযোগ্য মনে না হলেও এরূপ ঘটেছে বলে অনেকে মত দিয়েছেন। আমরাও বিশ্বাস করতে পারব, যখন মেনে নেব যে, মানবচরিত্র অনেক জটিল এবং তা পাঠ করা অত সহজ নয়।

মাহাথির জনসভায় প্রকাশ্যে বলেছেন, তিনি ক্ষমতায় থাকাকালে যা ভুল করেছেন তার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী এবং তাকে শেষ বয়সে নির্বাচিত করা হলে তিনি সে ভুলগুলো শোধরে নেওয়ার সুযোগ পাবেন। আরও বলেছেন, ভালো কিছু করতে গেলে ভুল হতেই পারে। ব্যর্থতা থাকাও স্বাভাবিক। সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে কখনও না কখনও ব্যর্থ হয়ে থাকেন। সফলতা কখনও সরলরেখা ধরে চলে না।

টানা বুধবার থেকে রোববার পর্যন্ত সরকারি অফিস বন্ধ থাকায় গোপনীয় কোনো কাগজপত্র সরকারি লোকেরা সরাতে পারেনি। চেষ্টা নাকি হয়েছে। অফিস থেকে কেউ যাতে কিছু সরাতে না পারে তার ব্যাপারে জনগণ সজাগ ছিল।

জনগণ একটা পরিস্কার মেসেজ দিয়েছে যে, দুর্নীতি করলে আর জনগণের চাওয়া-পাওয়ার সঙ্গে মিল করে দেশ না চালালে তারা যে কোনো শক্তিশালী দলকেও ক্ষমতা থেকে সরাতে পারে ঐক্যবদ্ধভাবে। জনগণ সজাগ থাকলে এবং ক্ষোভকে সংবরণ করে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করলে দুর্নীতিবাজরা ছাড়া পাবে না। শনিবার তারা সাবাং এয়ারপোর্ট পাহারা দিয়েছে, যাতে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এবং তার স্ত্রী বা সরকারি চিহ্নিত লোকেরা দেশ ছেড়ে পালাতে না পারে। খবর রটে গিয়েছিল যে, তারা ইন্দোনেশিয়া যাওয়ার পরিকল্পনা করছে।

সুপ্রিয় পাঠক, আমরা কি কিছু শিখতে পারি মালয়েশিয়ার এ অভূতপূর্ব নির্বাচন থেকে?

উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।
সুত্র-সমকাল