ড. আবদুল লতিফ মাসুম:
অবশেষে জনজীবন স্বাভাবিক করতে কোটা বাতিলের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি জাতীয় সংসদে দেয়া ভাষণে কোটাপদ্ধতি সমূলে বাতিলের সিদ্ধান্ত জানান। গোটা দেশে কোটা সংস্কারের আন্দোলন চলছিল। কোটা একেবারে বাতিলের জন্য তারা এ দাবি জানায়নি। অথচ প্রধানমন্ত্রী কোটা সম্পূর্ণ বাতিলের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। এ যেন না চাইতেই এক কাঁদি। বিজ্ঞজনেরা এর দুটো অর্থ করেছেন। একটি সরল, অপরটি গরল। সরলটি হলো এরকম- প্রধানমন্ত্রী আন্তরিকভাবেই উপলব্ধি করেছেন; মেধাই জাতির জীয়নকাঠি। আর গরল অর্থটি এরকম- তিনি সামনে কোটাধারীদের আন্দোলনের আশঙ্কা করছেন। বীজগণিতের ফরমুলাটি এরকম- মাইনাসে মাইনাসে প্লাস। বিরোধীরা বলছেন, এর মধ্যে পলিটিক্স থাকতে পারে। কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার ফন্দি আছে হয়তো। ইতোমধ্যে মুক্তিযুদ্ধের সন্তান নামে আন্দোলনের ঘোষণা এসেছে। এ রকম হয়তো আরো কিছু আসবে। অবশেষে যোগ-বিয়োগ, পূরণ-ভাগে যদি কিছু লাভ হয়। আন্দোলনটি যেভাবে সর্বাত্মক রূপ লাভ করতে যাচ্ছিল, তাতে সরকারের জন্য আশঙ্কার কারণ ছিল। এমনিতেই সরকারবিরোধীরা আন্দোলনের জন্য ওঁৎ পেতে আছে। তৃতীয় বিশ্বের দেশে অতি সামান্য থেকে অসামান্য ঘটনার নজির আছে। সে ক্ষেত্রে সরকারি সিদ্ধান্ত দূরদৃষ্টির পরিচয় দেয়। তবে ক্ষমতাসীন দলের রণকৌশল হলো- হওয়া জিনিস হয়ে যাওয়ার পর কৃতিত্ব দাবি করা। অতীতে এবং সম্প্রতি এর উদাহরণ রয়েছে। এটা কোনো দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সরকারের কাজ নয়।

আমাদের সন্তানেরা কী নিয়ে আন্দোলন করছে, সে বিষয়টি আমাদের জানতে হবে। বর্তমান আন্দোলনের প্রধান কারণ এই- প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর চাকরিতে নিয়োগ হয় বিভিন্ন ধরনের অগ্রাধিকার কোটায়। বাকি ৪৪ শতাংশ নিয়োগ হয় মেধায়। এ ছাড়া তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর চাকরিতে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের কোটা। বিশেষত পোষ্য কোটা। বিদ্যমান এই কোটা ব্যবস্থা বৈষম্যমূলক। তাই বেশ কয়েক বছর ধরে কোটাবিরোধী আন্দোলন চলছে। যতটা মনে পড়ে, বছর দশেক আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্ররা এ আন্দোলনের সূচনা করে। এ প্রবল আন্দোলনের আগে সরকারি দল যেমন একে ‘রাজাকার’ বিশেষণ দিতে চেয়েছে, তেমনি সে সময় সরকারি দলের পেটোয়া বাহিনী শিবির খেদানোর নাম দিয়ে সে আন্দোলন নষ্ট করে দেয়।

এরপর প্রায় প্রতি বছর মেধা সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীরা এবং বেকার যুবকেরা এ আন্দোলন করে আসছে। প্রতিবারই শাসক দলের গালমন্দ এবং ভাড়াটে বাহিনীর নির্যাতন ছাড়া তাদের কপালে কিছুই জোটেনি। গত বছরই আন্দোলনের ব্যাপকতা লক্ষ করা যায়; কিন্তু সেবারে তারা ফসল ঘরে তুলতে ব্যর্থ হলেও সিভিল সোসাইটির সহানুভুতি অর্জন করে। এবার বছরের শুরু থেকেই ধাপে ধাপে আন্দোলনকে তারা পূর্ণতার দিকে পৌঁছে দেন। এ মাসের প্রথম সপ্তাহে আন্দোলনকে শক্তি প্রয়োগ করে দমন করার সরকারি প্রবণতা লক্ষ করা যায়। ৮ এপ্রিল রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নেয়া শিক্ষার্থীদের পুলিশ তুলে দিতে চাইলে দুই পক্ষের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় প্রায় অর্ধশত শিক্ষার্থী আহত হন। পুলিশ আটক করে অন্তত ২৬ জনকে। সংঘর্ষের সময় ১১ পুলিশ সদস্য আহত হয় বলে পুলিশ দাবি করেছে। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ৩০ জন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। রাত দেড়টা পর্যন্ত থেমে থেমে সংঘর্ষ চলছিল। সাঁজোয়া যান আর জলকামান নিয়ে পুলিশ অবস্থান নেয় শাহবাগ থানার সামনে। আর আন্দোলনকারীরা আবস্থান নেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের চারুকলার সামনে।

আন্দোলনকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করলে পুলিশ মুহুর্মুহু কাঁদানে গ্যাসের শেল আর রাবার বুলেট ছুড়ে এর জবাব দেয়। সব মিলিয়ে শাহবাগ মোড় থেকে টিএসসি পর্যন্ত এলাকা সংবাদপত্রের ভাষ্য অনুযায়ী রণক্ষেত্রের পরিস্থিতি বিরাজ করে। এ সময় কবি সুফিয়া কামাল হলের ছাত্রীরাও সামনের রাস্তায় অবরোধে অংশ নেন। আন্দোলনকারী ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার পরিষদ’ হামলার প্রতিবাদে পরদিন সারা দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ক্লাস বর্জনের ঘোষণা দেয়। রাত দেড়টার দিকে ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও সংসদ সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক শাহবাগ মোড়ে এসে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন। এ সময় তিনি বলেন, এই আন্দোলনের কথা প্রধানমন্ত্রী জানেন। তিনি বিষয়টি সমাধানের জন্য আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে দায়িত্ব দিয়েছেন। তিনি পরদিন সকালে শিক্ষার্থীদের সাথে বসে যেটা ভালো হয় সেটা করবেন। আটক শিক্ষার্থীদের ছেড়ে দেয়া হবে বলে আশ্বস্ত করেন। নানকের বক্তব্যের পর আন্দোলনকারীদের একটি বড় অংশ শাহবাগ থেকে সরে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান নেন। সেখানে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। গুজব রটেছিল; শাহবাগের ঘটনায় কেউ নিহত হয়েছেন। পুলিশ নিশ্চিত করে, কেউ নিহত হননি।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, আন্দোলনকারীদের এক অংশ যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে যায়, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতার নেতৃত্বে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করে। ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্ব আন্দোলন প্রতিহত করার জন্য মধুর কেন্টিনে অবস্থান নেয়। আন্দোলনকারীদের সংখ্যা অসম্ভব রকম বেড়ে যাওয়ায় ছাত্রলীগের নেতারা ভোল পাল্টে ফেলেন। রাত ১২টার দিকে আন্দোলনকারীদের সাথে সংহতি প্রকাশ করেন। এরপর দফায় দফায় শিক্ষার্থী ও পুলিশের সংঘর্ষ চলতে থাকে। একপর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ডের সভাপতি আন্দোলনের বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত হন। ছাত্ররা তাকে মারধর করে। কোটা সংস্কারের দাবিতে এ আন্দোলন সারা দেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এমন কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই যেখানে ছাত্ররা নিকটবর্তী মহাসড়ক অবরোধ করেনি। ৯ এপ্রিল সচিবালয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের সাথে আন্দোলনকারীদের বৈঠকের পর কর্মসূচি স্থগিতের ঘোষণা হলেও এর পরপরই তা প্রত্যাখ্যান করে রাতে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ক্যাম্পাসের তিনটি স্থানে শিক্ষার্থীরা অবস্থান নেন। আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে মত ওঠার পাশাপাশি সরকারি ছাত্র সংগঠনের একদল কর্মীর মহড়ার কারণে ৯ এপ্রিল রাতে আন্দোলনকারীরা কর্মসূচি স্থগিত করতে বাধ্য হন বলে জানান তারা। উদাহরণ হিসেবে তারা ওই রাতের ২টা ৩০ মিনিটে ছাত্রলীগের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার কথা উল্লেখ করেন।

ওই রাত ভোর ৪টার দিকে ছাত্রলীগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একসাথে অবস্থান আরকেটি উদাহরণ। সরকার দাবি মানবে না, বরং মারধর করে আন্দোলনকারীদের তাড়িয়ে দেয়া হবে- এটাই ছিল সাধারণ আশঙ্কা। সরকার আন্দোলনের জনপ্রিয়তা, ব্যাপকতা এবং কার্যকারিতা লক্ষ করে কৌশল বদলে দেয়। একরকম বাধ্য হয়ে আন্দোলনের দাবি মেনে নিতে হয়। প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় সংসদে প্রদত্ত ভাষণটি মনযোগসহকারে পড়লে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ বারবার কষ্ট পাবে কেন? জনদুর্ভোগ মোচনের জন্য দাবি মেনে নেয়া হচ্ছে, নীতিগতভাবে নয় অথবা মেধার স্বীকৃতি দিয়ে নয়- এরকম ভাবলে সেটা কি খুব অন্যায় হবে? তিনি ভিসি ভবনে হামলাকারীদের সাথে কোটা আন্দোলনকে গুলিয়ে ফেলেছেন। ভিসি ভবনে হামলা একটি নিকৃষ্ট ঘটনা। এইসময়ে কাদের এত সাহস হলো, যারা পুলিশের সামনে ওই ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটাল?

মানুষ মনে করে, এরা তারাই যারা বারবার অন্যায় করার চিরস্থায়ী লাইসেন্স পেয়ে গেছে। তদন্ত রিপোর্ট যেন জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়। যা হোক, শেষ ভালো যার, সব ভালো তার। সরকার রাগে অথবা বিরাগে শিক্ষার্থীদের প্রাণের দাবি মেনে নিয়েছে এ জন্য তারা ধন্যবাদ পেতে পারে। আমরা সবাই বুঝি, এটি একটি দীর্ঘ আইনগত প্রক্রিয়ার বিষয়। সরকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে যথাযথ কার্যক্রমের মাধ্যমে ঘোষণাকে আইনি বাস্তবতা দেবে সেটাই লাখো শিক্ষার্থীর প্রত্যাশা। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধীদের প্রতি যাতে অন্যায় করা না হয়, তা নিশ্চিত করাও সরকারের দায়িত্ব। সেখানে ‘বিশেষ বিবেচনাকে’ আইনি মর্যাদা দেয়া যেতে পারে। মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়ও অনুরূপ বিবেচনা করা যায়। যাদের রক্তে মুক্ত এ দেশ, তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য আছে। তাদের নামে দুর্নীতি ও ব্যবসায় অমর্যাদাকর।

কোটা আন্দোলনের প্রতি অতীতের সরকারগুলো যথার্থ আচরণ করেনি। আর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার ভুলে হোক আর শুদ্ধে হোক- এই আন্দোলনকে তাদের প্রতি বৈরী হিসেবে বিবেচনা করেছে। আন্দোলনের সূচনা থেকে একে নস্যাত করার জন্য বছরের পর বছর শক্তি প্রয়োগ করেছে। বিশেষ করে বর্তমান আন্দোলনের বিকাশ ও ধাপে ধাপে অগ্রসরমানতাকে তারা প্রতিহত করার চেষ্টা করেছে। এ মাসের প্রথম সপ্তাহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাক্রম দিন-কাল-ক্ষণ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করলে যে নির্মম সত্যটি বেরিয়ে আসবে তা হলো- ক্ষমতাসীন দলের ঠেঙ্গারে বাহিনীর উপর্যুপরি হামলা, নিপীড়ন ও ষড়যন্ত্র; কিন্তু যখন সরকার অ্যাজেন্সিগুলোর মাধ্যমে সাধারণ ছাত্রদের অংশগ্রহণ ও দৃঢ়তার খবর পেয়েছে, তখন তারা এক-পা দু-পা করে-জাহাঙ্গীর কবির নানক, ওবায়দুল কাদের অবশেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। দুর্ভাগ্যের বিষয় এই, কোটা আন্দোলনের তাৎপর্য তারা তখনই অনুধাবনে সক্ষম হলেন, যখন নতুন প্রজন্ম রাস্তায় নেমে এসেছে। শাসক দলের অর্থমন্ত্রী ও কৃষিমন্ত্রী রাজাকার অভিধায় আন্দোলনকারীদের অভিহিত করার মধ্য দিয়ে আন্দোলনকারীদের প্রতি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। শাসকদল সবসময়ই নীতি আদর্শ ও কর্মসূচিকে গুরুত্ব দেয়নি। গুরুত্ব দিয়েছে ক্ষমতা এবং ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার বাসনাকে। অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে ভ্যাট দিতেই হবে। যখন প্রধানমন্ত্রী দেখলেন, বিষয়টি কোটা আন্দোলনের মতো ব্যাপকতা অর্জন করেছে, তখন তারা হার মানলেন।

যে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে তারা মানবতার সবক ধারণ করতে চাইছেন, কে না জানে যে তাদের নির্মমতায় নাফ নদীতে অথবা বঙ্গোপসাগরের লোনা পানিতে হারিয়ে গেছে অনেক রোহিঙ্গার জীবন। তখন তারা জাতিসঙ্ঘ ও বিশ^নেতাদের আহ্বানকে আমল দিতে চায়নি; কিন্তু যখন প্রবল স্রোত তাদের গ্রাস করেছে, তখনই তারা মহানুভব হয়েছে। একটি আড়িয়াল বিল যখন বিদ্রোহ করেছে, তখন তারা বুঝতে পেরেছে কৃষকের চাষের জমিতে বড় বিমানবন্দর করা যায় না। তাহলে এসব থেকে বাংলাদেশের মানুষ কী শিক্ষা পেল? শক্তের ভক্তের উদাহরণ দিলাম। নরমের জমের উদাহরণ লিখতে রাত দীর্ঘ হয়ে যাবে। বাংলাদেশে যারা পরিবর্তন চায়, আগামী দিনের সূর্যের অপেক্ষা করে তাদের জন্য এ সবের মধ্যে শিক্ষা আছে। শিক্ষাকে যারা দীক্ষায় রূপান্তর করতে পারে, তারাই সফল হয়।

লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
Mal55ju@yahoo.com