এস.এম.সাঈদুর রহমান, খুলনা ব্যুরো॥

খুলনা শহরতলীর আড়ংঘাটা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মফিজুর রহমান জিবলু’র বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা, ১০ টাকা মূল্যের চাল বিতরণ ও চাল উত্তোলনে অনিয়ম ও জমি দখলসহ নানা অভিযোগ পাওয়া গেছে। তিনি খুলনার তালিকাভূক্ত মাদক ব্যবসায়ী, পাচারকারি, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের অন্যতম। তার বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত বিভিন্ন অভিযোগে মামলা, ৪টি সাধারণ ডায়রি এবং জেলা প্রশাসকের কাছে ৭টি লিখিত অভিযোগের তথ্য অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। সর্বশেষ শালিসের নামে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বরাদ্দকৃত জমি দখলের অভিযোগে মামলাও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

এদিকে, চেয়ারম্যান মফিজুর রহমান জিবলু’র বিরুদ্ধে এতসব গুরুতর অভিযোগ থাকলেও বহাল তবিয়তে রয়েছেন তিনি। ক্ষমতার প্রভাব এবং দাপটে তিনি বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। ইউনিয়নের জনসাধারণ তার কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। কিন্তু আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী বা স্থানীয় সরকার বিভাগের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

তালিকাভূক্ত মাদক ব্যবসায়ী : সম্প্রতি খুলনা মহানগর ও জেলার মাদক ব্যবসায়ী, ডিলার, চোরাকারবারি, পৃষ্ঠপোষক ও আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের তালিকা প্রকাশ করা হয়। ওই তালিকায় আড়ংঘাটা ইউপি চেয়ারম্যান মফিজুর রহমান জিবলু’র নামও রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) থেকে অন্যের নামে বরাদ্দকৃত জমি দখল করে সেখানে ভবন নির্মাণের অভিযোগে আড়ংঘাটা ইউপি চেয়ারম্যান মফিজুর রহমান জিবলু’র বিরুদ্ধে কাজী মাহবুব আলম বাদি হয়ে ২৮ অক্টোবর খুলনার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করেন। মামলার প্রেক্ষিতে আদালত ওই জমিতে স্থিতিবস্থা জারি করেন। এ আদেশ বাস্তবায়নে আড়ংঘাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ইউপি চেয়ারম্যান জিবলুকে সংশ্লিষ্ট জমির প্রকৃত দখল বিষয়ক কাগজপত্র দাখিলের আদেশ দেন আদালত। এজাহারে উল্লেখ করা হয়, আড়ংঘাটা মৌজার পৈত্রিক সম্পত্তি সংলগ্ন পাউবো’র (আরএস দাগ-১১৫৪, ১১৫৫) শূণ্য দশমিক ২৮ একর জমি বরাদ্দ নিয়ে ভোগ দখলে রয়েছেন কাজী মাহবুব আলম। শরীকদের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে বিষয়টি মিমাংসার জন্য তিনি ইউপি চেয়ারম্যান মফিজুর রহমান জিবলুর স্মরণাপন্ন হন। কিন্তু তিনি কোন প্রতিকার না করে তাকে ফিরিয়ে দেন। পরবর্তীতে চেয়ারম্যান জিবলু সেখানে তিনতলা ভবন নির্মান কাজ শুরু করেন। তাকে নিষেধ করা হলে ‘রক্তের বন্যা বইয়ে দেব’ বলে হুমকি দেন।

আড়ংঘাটা থানা সূত্রে জানা গেছে, ইজিবাইকের ওপর অতিরিক্ত ট্যাক্স নির্ধারণ এবং স্থানীয় দু’টি প্রতিবন্ধী পরিবারের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদ করায় ইউপি চেয়ারম্যান জিবলু গাইকুড় গ্রামের শেখ শাহাদাত হোসেনের পুত্র ফরহাদ হোসেনকে জীবন নাশের হুমকি দেন। এ ঘটনায় তিনি আড়ংঘাটা থানায় সাধারণ ডায়রি করেন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমি বরাদ্দ নিয়ে সেখানে দোকান নির্মান করেন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা আব্দুর রশিদ শেখ। কিন্তু তাকেও উচ্ছেদ চেষ্টার অংশ হিসেবে চেয়ারম্যান হুমকি দেওয়ায় তিনি তার বিরুদ্ধে জিডি করেন। পূর্ব শত্রুতার জের ধরে স্থানীয় আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে মো. সোহেল সরদারকে গুলি করে হত্যার হুমকির ঘটনা এবং ক্রয়কৃত জমি থেকে একটি দোকান চেয়ারম্যানকে না দেওয়ায় সেখ সাহেব আলী নামক এক ব্যক্তির জমি দখলের হুমকি দেওয়া হয়। এ ঘটনায়ও তিনি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে থানায় সাধারণ ডায়রি করেন।

এলাকাবাসীর সূত্র জানান, ১০ টাকা মূল্যের চাল বিতরণ, চাল উত্তোলন ও নামের তালিকায় অনিয়ম, গ্রাম্য পারিবারিক আদালতে ২ টাকার ফরমের স্থলে ৫ হাজার টাকা গ্রহণ, গর্ভবতী ভাতার কার্ড বাবদ ৫শ’ টাকা থেকে ২ হাজার টাকা ও ভিজিবি কার্ড বাবদ ২শ’ টাকা থেকে ২ হাজার টাকা গ্রহণ এবং সরকারি জমির পজেশন বিক্রিসহ নানা দুর্নীতির প্রতিকার চেয়ে জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন গাইকুড় গ্রামের রাসেল হোসেন। পৈত্রিক সূত্রে প্রাপ্ত জমি নিয়ে বিরোধ মিমাংসার নামে শরীকদের কাছ থেকে মোটা অংকের অর্থ নিয়ে চা বিক্রেতা শেখ শাহাজানের যাতায়াতের পথ বন্ধ করে চেয়ারম্যান সেখানে দোকান নির্মান করেন। এ ঘটনায় তিনি জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। একইভাবে ১শ’ টাকা হোল্ডিং ট্যাক্সের স্থলে ৫ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রতিবাদে মহর সরদারের স্ত্রী নূরুন্নেসা, স্থানীয় ব্যবসায়ীদের একটি অংশকে সরকারি বরাদ্দকৃত জমি থেকে দোকান পাট ভাংচুর করে উচ্ছেদের হুমকির প্রতিবাদে এলাকাবাসী এবং সেনা বাহিনীর কর্পোরাল (অব.) আব্দুর রশিদকে হত্যার হুমকির ঘটনায় তিনিও প্রতিকার চেয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন।

অভিযোগ অস্বীকার করে আড়ংঘাটা ইউপি চেয়ারম্যান মফিজুর রহমান জিবলু এ প্রতিবেদককে বলেন, তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হয়েছে- সেগুলো তদন্ত করলে মিথ্যা প্রমাণিত হবে। চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি শালিস করায় যার বিপক্ষে যাবে- তারা অভিযোগ করতে পারে। তবে, বাইপাস সড়কের পাশে একটি জমি জনৈক ব্যক্তি তাকে স্বেচ্ছায় দিয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। সেখানে দোকান করতে গেলেই তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। এছাড়া ইউপি সদস্য সোহেল সরদারকে গুলি করে হত্যার হুমকির ঘটনা মিথ্যা প্রমাণ হয়েছে বলেও দাবি তার।

এ বিষয়ে খুলনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক ইশরাত জাহান বলেন, ইউপি চেয়ারম্যানদের বিরুদ্ধে এ ধরণের অসংখ্য অভিযোগ তার দপ্তরে রয়েছে। তবে, কারও বিরুদ্ধে সু-নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলেও তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।