আব্দুল হানিফ মিঞা, বাঘা (রাজশাহী) প্রতিনিধি॥ অগ্রহায়ণ এলেই সর্বত্র ধ্বনিত হয়, ‘আজ নতুন ধানে হবে রে নবান্ন সবার ঘরে ঘরে।’ সোনালি ধানের প্রাচুর্য আর বাঙালি সংস্কৃতির বিশেষ অংশ নবান্নকে প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতায় ধরা পড়েছে দারুণভাবে। তিনি লিখেছেন, ‘চারিদিকে নুয়ে পড়ে ফলেছে ফসল/ তাদের স্তনের থেকে ফোঁটা ফোঁটা পড়িতেছে শিশিরের জল/ প্রচুর শস্যের গন্ধ থেকে-থেকে আসিতেছে ভেসে/ পেঁচা আর ইঁদুরের ঘ্রাণে ভরা আমাদের ভাড়ারের দেশে।’ পুনর্বার ফিরে আসার আকুতি ধ্বনিত হয়েছে জীবনানন্দ দাশের একটি কবিতায়, ‘আবার আসিব ফিরে ধান সিঁড়িটির তীরে এই বাংলায়/ হয়তো মানুষ নয় হয়তো শঙ্খচিল শালিখের বেশে;/ হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে’। প্রকৃতির বিচিত্র এ রূপের বর্ণনা দিয়েছেন এ দেশের সব কবি-সাহিত্যিক। স্মরণাতীত কাল থেকে বাঙালির জীবনে বাৎসরিক সুদিন পয়লা অগ্রহায়নে নতুন ধান কাটা আর সেই ধানের প্রথম অন্ন খাওয়াকে কেন্দ্র করে পালিত হয় নবান্ন উৎসব।

বছর ঘুরে আবার এসেছে অগ্রহায়ণ। কৃষকের মাঠে এখন সোনারঙা ধানের ছড়াছড়ি। সারা দেশেই আমন ধান কাটার উৎসব শুরু হয়ে গেছে। কৃষক রাশি রাশি ভারা ভারা সোনার ধান কেটে নিয়ে আসে ঘরে। বাড়ির আঙিনা নতুন ধানের মৌ মৌ গন্ধে ভরে ওঠে। ধান ভাঙার গান ভেসে বেড়ায় বাতাসে, ঢেঁকির তালে মুখর হয় বাড়ির আঙিনা। তবে যান্ত্রিকতার ছোঁয়ায় এখন আর ঢেঁকির তালে মুখরিত হয় না। তার পরও নতুন চালের ভাত নানা ব্যঞ্জনে মুখে দেওয়া হয় আনন্দঘন পরিবেশে। তৈরি হবে নতুন চালের পিঠা, ক্ষীর-পায়েস। কৃষক-কৃষাণীরা নবান্নের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেবেন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে।

‘একটি শান্তিময় দেশ গড়ার’ প্রত্যয়ে ‘এসো মিলি সবে নবান্নের উৎসবে’ এই শ্লোগান সামনে রেখে উপজেলা প্রশাসন আয়োজন করেছে নবান্ন উৎসবের। ১৪২৪ বঙ্গাব্দ ১লা অগ্রায়ন সকাল থেকে বিরতিহীনভাবে উপজেলা চত্বরে দিনব্যাপী উৎসবে থাকছে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, সংগীত, নৃত্য, আবৃত্তি, বাউলগান, আদিবাসীদের পরিবেশনা ও নবান্নকথন, ঐতিহ্যবাহী নানা রকম পিঠা প্রদর্শনী, লাঠি ও সাপখেলা। সকাল ১০টায় উপজেলা থেকে নবান্ন শোভাযাত্রা বের হয়ে প্রধান রাস্তার পথ ঘুরে আবার উপজেলাতেই শেষ হবে। উৎসবের দ্বিতীয় পর্বে ঢাকঢোল, বাউলগান, লাঠিখেলা, নৃত্য ও সংগীতের মনোমুগ্ধকর পরিবেশনার মধ্য দিয়ে শেষ হবে উপজেলার আয়োজনে নবান্ন উৎসব। হেমন্তের মিষ্টি রোদ যখন চারদিক নিজের আলোর রোশনাই ছড়িয়ে দিবে, ঠিক সেই সময় উপজেলার বিশাল বটগাছের নিচ থেকে, ভেসে আসবে বাঁশির সুমধুর সুর। সুরের মূর্ছনা শেষ হতে না হতেই মঞ্চ মাতাবে ধ্রুব শিশু-কিশোর সংগঠন। খুদে কণ্ঠে এক সুরে গেয়ে ওঠবে, ‘এ কি অপরূপ রূপে মা তোমার হেরিনু পল্লীজননী’। গানের পরিবেশনা শেষ হতেই আসবে কবিতার পালা। কবিতা শেষে নূপুরের ঝংকার মাতিয়ে তুলবেন নৃত্যশ্রীর শিল্পীরা। নাচ শেষে আবারো গানের পালা- ‘নাও ছাইড়া দে রে মাঝি/ পাল উড়াইয়া দে।’ এ গান শেষে পরিবেশিত হবে নজরুলের নানা গান। প্রায় ২৫টি সংগঠনের শতাধিক শিল্পীদের পরিবেশনায় অগ্রহায়ণের নবান্ন উৎসবে মেতে ওঠবে বাঘাবাসী। দিনভর উৎসব পরিনত হবে শ্রেণী-পেশার সব মানুষের মিলনমেলায়।

এদিকে, উৎসব উপলক্ষে উপজেলার সংলগ্ন এলাকাকে সাজানো হয়েছে গ্রামীণ আদলে। সেখানে রয়েছে বাঙালিয়ানারও ছাপ। ছেলেদের পরনে পায়জামা-পাঞ্জাবি আর মেয়েদের পরনে এক প্যাঁচে পরা একরঙা বা চেকের তাঁতের শাড়ি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তরুণ প্রজন্মের ওপর পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রবল প্রভাব।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাহীন রেজা জানান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আলহাজ্ব শাহরিয়ার আলম এমপি প্রধান অতিথি,রাজশাহী জেলা প্রশাসক মোঃ হেলাল মাহমুদ শরীফ বিশেষ অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকার সন্মতি জ্ঞাপন করেছেন। এছাড়াও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি,আ’লীগ দলীয় নের্তৃবৃন্দও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন।

নির্বাহি অফিসার বলেন, শিল্পায়ন ও নগরায়ণের কশাঘাতে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামবাংলার আনন্দময় সরল জীবন। ‘গ্রামে যে নবান্ন উৎসব করা হয়, সেটাই প্রধান ও আসল নবান্ন উৎসব। যেখানে আমরা নতুন ধানকে স্পর্শ করতে পারি। খেতে পারি নানা রকম মুখরোচক পিঠা। সে হিসেবে শহুরে জীবনে যে নবান্ন উৎসব করা হয়, সেটা তো প্রতীকী। আমরা যাতে আমাদের উৎসকে ভুলে না যাই সে জন্যই এ আয়োজন।’ এ অসাধারণ দিনকে আরও অসাধারণ করতে সবারই অঙ্গীকার হউক।