ই-কণ্ঠ ডেস্ক রিপোর্ট:: কড়া নজরদারি ও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার পরও প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকানো যাচ্ছে না। বরং প্রযুক্তির অপব্যবহার করে প্রতিনিয়ত আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের সদস্যরা। তাদের দৌরাত্ম্যে কার্যত দিশেহারা হয়ে পড়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এমনকি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নিয়েও মেলেনি সুফল। চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের প্রতিটি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। এমন প্রেক্ষাপটে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের (এইচএসসি ও সমমান) পরীক্ষা নিয়েও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, পরীক্ষার বিষয় সংখ্যা বেশি হওয়ায় এইচএসসির প্রশ্নপত্র ফাঁসের আশঙ্কাও বেশি। এইচএসসির প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে নতুন কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে- তা নিয়ে বিস্তর ভাবনাচিন্তার পরও এখন পর্যন্ত আশান্বিত হওয়ার মতো পথ খুঁজে পায়নি শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, ২ এপ্রিল থেকে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হবে। গত ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে এই স্তরের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ছাপা শুরু হয়েছে বিজি প্রেসে। আগামী ৩ মার্চ থেকে জেলা প্রশাসকের পাঠানো ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে বিভিন্ন জেলায় প্রশ্নপত্র পাঠানো শুরু হবে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অদ্বৈত কুমার রায় জানান, দেশের বাইরেও সাতটি কেন্দ্রে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ওই কেন্দ্রগুলোতে প্রশ্নপত্র পাঠাতে ১৫-২০ দিন পর্যন্ত সময় লাগে। তাই অন্যান্য পরীক্ষার তুলনায় উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের প্রশ্নপত্র অনেক আগেই ছাপা শুরু হয়। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা পরিচালনার দায়িত্বে এই কর্মকর্তা আরও জানান, ছাপা শেষে পরীক্ষার অন্তত এক মাস আগেই এইচএসসির প্রশ্নপত্র জেলা প্রশাসকদের ট্রেজারিতে পাঠানো হবে। পরীক্ষা শুরুর আগ পর্যন্ত প্রশ্নপত্র গোপনীয়তার সঙ্গে সংরক্ষণ করা হবে।

কিন্তু এই গোপনীয়তার মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁস কী ঠেকানো যাবে? এমন প্রশ্নের জবাবে আশার বাণী শোনাতে পারছেন না সংশ্নিষ্ট কেউ। শিক্ষা সচিব সোহরাব হোসাইনের বক্তব্যেও যেন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে তাদের অসহায়ত্বের চিত্র। গত বৃহস্পতিবার তিনি বলেছেন, বর্তমান পদ্ধতিতে পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস রোধ করা কিছুতেই সম্ভব নয়। তার মতে, প্রশ্নপত্র আগেও ফাঁস হতো, এখনও হচ্ছে। তবে বর্তমানে তা বিস্তৃত হচ্ছে ইন্টারনেটকে মাধ্যম করে। নৈতিক অবক্ষয়কেও এর জন্য দায়ী করেন তিনি। এরপরও প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আপ্রাণ চেষ্টা করছে এবং সবার মতামত নিয়ে নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবনের চেষ্টা চলছে বলেও সান্ত্বতনা শুনিয়েছেন শিক্ষা সচিব। যদিও প্রশ্নপত্র ফাঁসের বর্তমান পরিস্থিতিতে পরীক্ষার অনেক আগে এইচএসসি ও সমমানের প্রশ্নপত্র ছাপার সমালোচনাও করেছেন অনেকে। পরীক্ষার এত আগে প্রশ্ন ছাপলে ফাঁসের আশঙ্কা আরও বাড়বে বলে মনে করছেন তারা। এ ব্যাপারে অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদ ও বিশিষ্টজনরা নানামুখী পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। দিয়েছেন বিভিন্ন দিকনির্দেশনাও। তবে প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকানোর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে জড়িতদের বিচার নিশ্চিত করার ব্যাপারেই জোর দিয়েছেন তারা। তাদের ভাষ্য, এই অপকর্মে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরীক্ষার বিষয় কমিয়ে আনা ও নৈতিকতা চর্চা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই দুর্যোগ মোকাবেলা করা সম্ভব।

চলতি বছর প্রশ্ন ফাঁস এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, শিক্ষাবিদরা এখন পরীক্ষা কমিয়ে দেওয়ার পক্ষে অভিমত দিচ্ছেন। আর হাইকোর্ট চলমান এসএসসিসহ বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দিয়েছে। বুয়েটের অধ্যাপক মোহাম্মদ কায়কোবাদের নেতৃত্বে প্রশাসনিক কমিটি এবং ঢাকা জেলা ও দায়রা জজের নেতৃত্বে বিচারিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই দুই কমিটির সদস্য সংখ্যা পাঁচজন করে। হাইকোর্টের এ তদন্ত কমিটি গঠনের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ ব্যর্থতার দায় এড়াতে পারে না বলে মত দিয়েছেন শিক্ষাবিদরা। তাদের মতে, অস্বীকার করার সংস্কৃতির কারণেই প্রশ্ন ফাঁসের মাত্রা ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।

শর্ষেতেই ভূত? : প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকানোর জন্য গঠিত কমিটিও অসহায়ত্বের ভাষায় কথা বলছে। কমিটির সদস্যরা আলাপকালে বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে, এটি সত্য। তবে পরীক্ষা বাতিল করার কোনো যৌক্তিকতা দেখছেন না তারা। আর প্রশ্ন ফাঁস ঠেকাতে সরকারি অন্যান্য সংস্থার আরও জোরালো ভূমিকা চান তারা। বিশেষ করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও দায় নিয়ে কাজ করতে হবে। তবে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বলছে, শর্ষেতেই ভূত আছে। প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে খোদ শিক্ষা বোর্ডেরই একটি সিন্ডিকেট যুক্ত। তারা বছরের পর বছর বোর্ডে ঘাপটি মেরে থেকে প্রশ্ন ফাঁসে সহায়তা করে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থের মালিক বনে গেছেন। বিশেষ করে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের গুটিকয়েক কর্মকর্তা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ভালো ফল করিয়ে দেওয়ার সহায়তা করতে গিয়ে এ ধরনের অনৈতিক কাজে জড়িয়ে গেছেন। পুলিশের হাতে আটক হওয়া ব্যক্তিদের তথ্যের ভিত্তিতে এই হোতাদের ধরার কাজও চলছে বলে জানা গেছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের মূল হোতাদের শনাক্ত করতে রাঘববোয়ালদের নাম পাচ্ছেন গোয়েন্দারা। ইতিমধ্যে এই চক্রের মূল হোতাদের সম্পর্কে বেশ তথ্য মিললেও কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, প্রশ্ন ফাঁস এখন মহামারী আকার ধারণ করেছে। পুরো শিক্ষাব্যবস্থার জন্য এটা হুমকি হয়ে গেছে। এ জন্য পরীক্ষানির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থাকে দায়ী করছেন তিনি। তারা মতে, পরীক্ষা কমিয়ে আনলেই প্রশ্ন ফাঁস রোধ সম্ভব। তিনি বলেন, দেশে গোয়েন্দারা জঙ্গিসহ রাজনৈতিক ইস্যুতে দক্ষতা দেখালেও এখানে কেন পারছেন না- এটিও দেখার দরকার।

পরীক্ষা বাতিল হচ্ছে না : প্রশ্নপত্র ফাঁস হলেও এসএসসিতে এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত পরীক্ষাগুলো বাতিল হচ্ছে না বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। পরীক্ষা বাতিলের পক্ষে নন পরীক্ষা মূল্যায়ন কমিটির বেশিরভাগ সদস্য। ফাঁস রোধে প্রশ্ন প্রণয়ন পদ্ধতির আধুনিকায়ন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরালো করার পক্ষে এ কমিটি। পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার সময় প্রশ্ন ফের ফাঁস হবে না, এ নিশ্চয়তা বর্তমান পরিস্থিতিতে দেওয়া সম্ভব নয় বলে মনে করে এ কমিটি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আলমগীর এ কমিটির প্রধান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মূল্যায়ন কমিটির এক সদস্য এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এসএসসির ৯টি বিষয়ে অনুষ্ঠিত ৯টি পরীক্ষারই প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার অভিযোগ কমিটির কাছে আছে। এত বিষয়ের পরীক্ষা আবার নতুন করে নেওয়া কঠিন। তাছাড়া ফাঁস হওয়া প্রশ্ন পেয়েছে মোট পরীক্ষার্থীর মধ্যে সামান্য একটা অংশ। তাদের জন্য পরীক্ষা বাতিল করলে মেধাবী শিক্ষার্থীরা এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তারা প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। পরীক্ষা বাতিল হলে অভিভাবকরাও মেনে নেবেন না।’