ই-কণ্ঠ ডেস্ক রিপোর্ট:: দেশের ইতিহাসে ৩৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র দু’জন নারী উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় নারীদের সংখ্যা কম নয়, যোগ্যতা বা মেধায়ও তারা পিছিয়ে নেই। বিভাগীয় সভাপতি ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে তারা সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। তারপরও বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষপদে তাদের সংখ্যা এত কম কেন? প্রশ্ন উঠেছে, নারী কি উপাচার্য পদের জন্য আগ্রহী নয়, নাকি তারা সুযোগ পান না।

এ বিষয়ে শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উপাচার্য চেয়ারটি যোগ্যতার চেয়েও অনেকখানি রাজনৈতিক। নারীরা যোগ্য হলেও রাজনীতি ও ঝক্কি ঝামেলাকে পারতপক্ষে এড়িয়ে চলতে পছন্দ করেন। আবার যোগ্য ও আগ্রহী হলেও কখনও কখনও নারীদের বঞ্চিত হওয়ার ঘটনাও ঘটে।

২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) সিনেটে প্যানেল নির্বাচনের মাধ্যমে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম। তিনিই দেশের প্রথম নারী উপাচার্য। একই বছরের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) দ্বিতীয় নারী উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান অধ্যাপক খালেদা একরাম। ২০১৬ সালে তিনি মারা যাওয়ার পর বিশ্ববিদ্যায়টিতে কিছুদিন ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পান অধ্যাপক জেবুন নাসরীন আহমেদ।

বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) উপ-উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অধ্যাপক নাসরীন আহমাদ। এছাড়া, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েও (চবি) একজন নারী উপ-উপাচার্য পদে রয়েছেন। কিন্তু পুরুষের তুলনায় উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য পদে নারীর সংখ্যা এত কম কেন?

১৯৭৩ এর অধ্যাদেশ অনুযায়ী সিনেট নির্বাচনের মাধ্যমে ঢাবি, রাবি, জাবি ও চবিতে তিনজনের উপাচার্য প্যানেল নির্বাচন করা হয়। এই তিনজনের মধ্য থেকে আচার্য ও রাষ্ট্রপতি উপাচার্য নিয়োগ দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৩ সালের ২৫ আগস্টের প্যানেল নির্বাচনে ঢাবির বর্তমান উপ-উপাচার্য অধ্যাপক নাসরিন আহমাদ সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। ২০১৪ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি প্যানেল নির্বাচনে সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে জাবির উপাচার্য হয়েছিলেন অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েও একজন নারী উপাচার্য প্রার্থী হিসেবে প্যানেলে প্রতিযোগিতা করেছিলেন। তবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে পাঁচ বার উপাচার্য নির্বাচনের প্যানেল হলেও কোনও নারী প্রার্থী ছিলেন না বলে বিশ্ববিদ্যালয় সুত্রে জানা গেছে।

এই চারটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া বাকি ৩৪টিতে উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির কাছে তিন জনের নামের তালিকা পাঠায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু ওই তালিকাতেও নারী শিক্ষকরা তেমন একটা স্থান পান না বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

উপাচার্যের নামের তালিকা কিভাবে করা হয় জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার অতিরিক্ত সচিব আব্দুলাহ আল হাসান চৌধুরী বলেন, ‘৩৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি আলোচনা করে শিক্ষানুরাগী, শিক্ষাবিদ, যোগ্য ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের উপাচার্য হিসেবে নেওয়ার জন্য প্রস্তাবনা দেয়। যারা সম্মতি দেন তাদের নামের মধ্য থেকে তিনজনের শর্টলিস্ট করে তা রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হয়। রাষ্ট্রপতি যাকে উপযুক্ত মনে করেন তাকেই নিয়োগ দেন।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষপদে নারীর উপস্থিতি কম উল্লেখ করে ঢাবির উপ-উপাচার্য অধ্যাপক নাসরিন আহমাদ বলেন, ‘প্রথমত, পুরো বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষক থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা কম। এখানেই অনেকটা পিছিয়ে পড়েন নারী শিক্ষকরা। এছাড়া, এসব পদে যেতে রাজনৈতিক এক্টিভিটিসহ অন্যান্য দক্ষতা ও পারদর্শিতাও থাকতে হয়। যা অনেক ক্ষেত্রেই নারীদের বেলায় কিছুটা কম দেখা যায়। ফলে নারীর আগ্রহের জায়গাটাও কিছুটা কম থাকে।’ তবে ভবিষ্যতে এ দৃশ্য পাল্টাবে- এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে অধ্যাপক নাসরীন আহমাদ বলেন, ‘কয়েক বছর আগেও তো উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য পদে নারীরা ছিলেন না, এখন তো আছেন। এভাবেই এগিয়ে যাবেন নারীরা।’

তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান বললেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, ‘নারীর আগ্রহের তো কোথাও কমতি দেখি না। তাছাড়া, সরকারেরও তো নারীর প্রতি আলাদা ফোকাস রয়েছে।’

গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী এ বিষয়ে বলেন, ‘সিনেট অধিবেশনে উপাচার্য প্যানেল যারা নির্বাচন করেন, বিষয়টি অনেকটা তাদের মনমানসিকতার ওপর নির্ভর করে। যোগ্যতা অথবা দক্ষতার কারণে নারী পিছিয়ে যায় বলে আমি মনে করি না।’ তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য নিয়োগ পেতে হলে যোগ্যতা ও দক্ষতার পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে রাজনৈতিক পরিচয়। কিন্তু নারীরা পারতপক্ষে রাজানীতিকে এড়িয়ে চলেন। আর এ কারণেই তারা উপাচার্য হিসেবে খুব একটা সুপারিশপ্রাপ্ত হন না।’

তিনি আরও বলেন, ‘এছাড়া আরও একটি সমস্যা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদটি খুবই শক্ত ও ভাইটাল একটা পদ। এই পদের ব্যক্তিকে অনেক কিছু সামাল দিতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থী, অনেক বিভাগ, অসংখ্য শিক্ষক ছাড়াও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, শিক্ষকদের দলাদলিসহ নানা রকম ঝক্কিঝামেলা তো লেগেই থাকে। এত কিছু মেইনটেইন করা একটু কঠিন বলেই মনে করেন নারীরা। ফলে নারী নিজেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের শীর্ষপদটি এড়িয়ে চলতে চান। তারা নিজেরা চাইলেও বাছাইপর্ব থেকেও বাদ দিয়ে দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে।’

এ বিষয়ে রাকসুর সাবেক কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মাহবুবা কানিজ কেয়া বলেন, ‘সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীদের অংশগ্রহণ সমাজ এখনও একসেপ্ট করতে চাইছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও তা-ই ঘটছে। এর পেছনের কারণ হচ্ছে, আমাদের মনোভাব, পলিসি মেকিং এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় আমরা নারীকে একটু আলাদাভাবে দেখি। তবে আস্তে আস্তে আমাদের মনোভাবে পরিবর্তন আসবে। ভবিষ্যতে এ পদগুলোতে নারীরা আসবে।’

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল মান্নান বলেন, ‘নারী হোক আর পুরুষ হোক বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করতে উপাচার্য হতে হলে যোগ্যতার সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনিক দক্ষতা থাকা বাঞ্ছনীয়। সেটা নারীর থাকলে অবশ্যই নারী উপাচার্য হবেন। নারী বা পুরুষ বলে আলাদা করে ভাবার কোনও কারণ তো দেখি না। কারণ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে তো নারী উপাচার্য দায়িত্ব পালন করছেন।’