বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক::

গ্রহের নাম হিসেবে ‘টিওআই ১৩৩৮ বি’ একটু খটমট। অবশ্য নামে কী বা আসে যায়। গ্রহটা যে মজার, সেটাই বড় কথা। সবচেয়ে মজার এর সূর্যাস্ত। কোনো দিন সেই গ্রহে পৌঁছালে কোনো এক পড়ন্ত বিকেলে দু-দুটি লাল সূর্যের থালা দেখা যাবে। অদ্ভুত গ্রহটি আবিষ্কার করেছে উলফ সুকিয়ার। ১৭ বছরের এক মার্কিন তরুণ। এখনো স্কুল ছাড়েনি। অথচ এরই মধ্যে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মধ্যে হইচই ফেলে দিয়েছে তার আবিষ্কার।

হাইস্কুলের গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে মার্কিন মহাকাশ গবেষণাকেন্দ্র নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারে দুই মাসের জন্য শিক্ষানবিশ (ইন্টার্ন) হিসেবে কাজ শুরু করে সুকিয়ার। তার কাজ ছিল টেলিস্কোপের ছবি বিশ্লেষণ করা। তিন দিনের মাথায় ছবিতে অস্বাভাবিক কিছু দেখতে পায় সে। এরপর উপদেষ্টাকে জানায় সুকিয়ার। কাজে লেগে যান নাসার বিজ্ঞানীরা। পরে দেখা গেল, ছবির সে অস্বাভাবিক ছায়াই ১ হাজার ৩০০ আলোকবর্ষ দূরের গ্রহ টিওআই ১৩৩৮ বি। আকারে যেটি পৃথিবীর ৬ দশমিক ৯ গুণ।

গত বছরের জুনের ঘটনা এসব। নিশ্চিত হতে এত দিন অপেক্ষা করেছে নাসা। সম্প্রতি নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে। তারকা খুঁজতে গিয়ে সুকিয়ার রীতিমতো তারকা বনে গেছে। এখন বেচারাকে একের পর এক সাক্ষাৎকার দিতে হচ্ছে সংবাদমাধ্যমে। বিবিসি রেডিও ওয়ানের নিউজবিটকে তার আবিষ্কার সম্পর্কে বলেছে সম্প্রতি।

আলোর পথে বাধা

সৌরজগতের বাইরের গ্রহগুলো খুঁজে বের করতে মহাকাশে ট্র্যানজিটিং এক্সোপ্ল্যানেট সার্ভে স্যাটেলাইট, সংক্ষেপে টেস নামের টেলিস্কোপ স্যাটেলাইট পাঠিয়েছিল নাসা। সেই টেলিস্কোপের ছবি দেখে সুকিয়ার এমন গ্রহ খোঁজা শুরু করে, যেটি একই সঙ্গে দুটি নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করছে। কাজটি করতে নক্ষত্র দুটি থেকে আসা আলোর তারতম্য বিশ্লেষণ করে সে।

লাইট বাল্বের সামনে কিছু ধরলে যেমন আলোর পথে বাধা তৈরি হয়, ছায়া পড়ে। প্রদক্ষিণরত নক্ষত্রের সামনে কোনো গ্রহ এলেও তার ছায়া পড়ে। ১ হাজার ৩০০ আলোকবর্ষ দূরের ছায়া বেশ ক্ষীণ। তবু নিয়মিত বিরতিতে ছায়া দেখা যাওয়ায় উপদেষ্টাকে জানায় সুকিয়ার। এরপর তথ্য যাচাই–বাছাই করে নিশ্চিত হয়েছেন নাসার বিজ্ঞানীরা।

টিওআই ১৩৩৮ বি নামটা নিয়ে তেমন আক্ষেপ নেই সুকিয়ারের। বলেছে, ‘নামকরণের সুযোগ পাইনি আমি। আমার ভাই মনে করে, “উলফটোপিয়া” ডাকা যেতে পারে, তবে আমি মনে করি, নাম হিসেবে টিওআই ১৩৩৮ বি যথেষ্ট।’

একের ভেতর দুই

আমাদের পৃথিবীসহ বেশির ভাগ গ্রহ যেমন একটি সূর্যকে ঘিরে আবর্তিত হয়, টিওআই ১৩৩৮ বির আবর্তন দুটি নক্ষত্র ঘিরে। সেই নক্ষত্র দুটির একটি আবার অপরটিকে প্রতি ১৫ দিনে প্রদক্ষিণ করছে। এ ধরনের গ্রহকে ‘সার্কামবাইনারি’ বলা হয়। ‘স্টার ওয়ারস’ ভক্তদের কি কিছু মনে পড়ছে? চলচ্চিত্রের লিউক স্কাইওয়াকারের বাস ছিল টাটুইন গ্রহে। সে গ্রহটিও সার্কামবাইনারি। মানে দুবার সূর্যোদয়, দুবার সূর্যাস্ত। টাটুইনের সঙ্গে পার্থক্য হলো সুকিয়ারের গ্রহটি বাসযোগ্য নয়। অত্যন্ত উত্তপ্ত হতে পারে সেটি। তা ছাড়া পৃথিবীর মতো শক্ত ভূমি থাকাও অস্বাভাবিক। গ্রহটি অবশ্য বড়, আকারে পৃথিবীর ৬ দশমিক ৯ গুণ।

গ্রহের কথা লিখতে গিয়ে সুকিয়ার সম্পর্কে জানানো হলো না। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের স্কার্সডেল হাইস্কুলে পড়ছে সে। এরপর কলেজে পদার্থবিদ্যা বা জ্যোতির্পদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়ার ইচ্ছা তার। কলেজ মানে স্নাতক শ্রেণির পড়াশোনা। প্রথম তিন পছন্দ প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি, স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি আর ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি)। তারপর? এখনই ভাবতে চায় না সুকিয়ার। তার ভাষায়, ‘মহাকাশ গবেষণা নিয়ে কাজের সুযোগ ভালো অপশন হতে পারে। তবে দেখা যাক আমার জীবন কখন কোথায় কী মোড় নেয়!’