শনিবার, ২২ Jul ২০১৭ | ৭ শ্রাবণ ১৪২৪ English Version

অর্থ ও বাণিজ্য

থামছে না অবৈধ ব্যাংকিং, ঠেকাতে তৎপরতা বাড়িয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

Published: 2017-07-10, 12:08:02 PM Updated: 2017-07-10, 12:08:02 PM

ই-কণ্ঠ ডেস্ক রিপোর্ট:: নানা উদ্যোগের পরও থামছে না অবৈধ ব্যাংকিং। উচ্চ মুনাফার টোপ দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আমানত নিচ্ছে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান সমবায় সমিতির আড়ালে অবৈধ ব্যাংকিং করছে। প্রতারিত হওয়ার নানা দৃষ্টান্ত থাকলেও এক শ্রেণির মানুষ এ ফাঁদে পা দিচ্ছেন। ব্যাংকে আমানতের সুদহার সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসায় এ প্রবণতা বাড়তে পারে- এমন আশঙ্কায় অবৈধ ব্যাংকিং ঠেকাতে তৎপরতা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বেআইনিভাবে গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের কারণে সম্প্রতি দুটি প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ব্যাংক হিসাব তলব করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট। ঢাকা আরবান কো-অপারেটিভ ব্যাংক ও ফারইস্ট ইসলামী মাল্টি কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তার অ্যাকাউন্টের তথ্য চাওয়া হয়েছে। এর আগে ঢাকা মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ ব্যাংক ও আজিজ কো-অপারেটিভ ব্যাংকসহ বিভিন্ন সমবায় সমিতির বিরুদ্ধে সতর্কতামূলক গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, গত কয়েক বছরে ব্যাংকে আমানতের সুদহার ধারাবাহিকভাবে কমছে। ব্যাংকে টাকা রেখে এখন গড়ে ৫ শতাংশের কম সুদ পাওয়া যাচ্ছে। সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানোর ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এ রকম পরিস্থিতিতে ভালো মুনাফার আশায় ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে টাকা চলে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অবৈধ ব্যাংকিং প্রতিরোধে তৎপরতা বাড়িয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা বলেন, আইন অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান ব্যাংক ব্যবসা করতে পারে না। কোনো প্রতিষ্ঠানের নামের সঙ্গে 'ব্যাংক' শব্দটি ব্যবহার করাও বেআইনি। যদিও সমবায় সমিতি হিসেবে নিবন্ধিত ঢাকা মার্কেন্টাইল, আজিজ কো-অপারেটিভসহ অনেক প্রতিষ্ঠান এমনটি করছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরাসরি কোনো ব্যবস্থাও নিতে পারছে না। আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সমন্বয় সভা থেকে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সমবায় অধিদপ্তরকে বলা হয়েছে। তারা বেশ কিছু ব্যবস্থা নিয়েছে।

ঢাকা আরবান কো-অপারেটিভ ব্যাংক: নামের সঙ্গে 'ব্যাংক' শব্দ যুক্ত করে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে দ্য ঢাকা আরবান কো-অপারেটিভ ব্যাংক। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মো. রফিকুল আলম, এমডি মো. লুৎফর রহমান, জামালপুর শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক মো. ওবায়দুল্লাহ ইবনে হকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য তলব করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট। ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয় ও জামালপুর শাখার নামে কোনো অ্যাকাউন্ট থাকলে সে তথ্যও দিতে বলা হয়েছে। নতুন সমবায় আইন হওয়ার পর গ্রাহকদের না জানিয়ে ২০১৩ সালে হঠাৎ করে অনেক শাখা বন্ধ করে দেয় এ প্রতিষ্ঠান। এরপর ২০১৫ সালের নভেম্বরে গ্রাহকদের ১ কোটি ৩২ লাখ টাকা আত্মসাতের দায়ে ৪০টি মামলা করে দুদক। যাদের অ্যাকাউন্ট তলব করা হয়েছে তাদের প্রত্যেকে এসব মামলার আসামি।

ফারইস্ট ইসলামী মাল্টি কো-অপারেটিভ সোসাইটি: অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান শামীম কবিরসহ বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে ২০১৫ সালে মামলা করে দুদক। এরপর তার স্ত্রী হাছিনা সুলতানাকে কো-অপারেটিভের সভাপতি করে এর কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। সম্প্রতি হাসিনা সুলতানাসহ এই প্রতিষ্ঠানের ১৩ জনের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য তলব করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট। অন্যদের মধ্যে আছেন হাছিনা সুলতানার ভাই ও সমিতির সহসভাপতি মো. আবু ইউসুফ, শামীমের বোন ও সমিতির সদস্য সাদিয়া শারমিন, সহসভাপতি দুলাল আহমেদ, সম্পাদক মো. এমদাদুল হক, সদস্য ইমরানুল ইসলাম, শাহীনা আক্তার, শরীফ মজুমদার, সেলিনা বেগম, পারভেজ আহাম্মদ, এবিএম হুমায়ুন ও শিরিনা আক্তার। কুমিল্লা অঞ্চলের ২৪ হাজার ৮০০ আমানতকারীর কাছ থেকে ১৩৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। সমকালের কুমিল্লা প্রতিনিধির মাধ্যমে অভিযুক্তদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে পলাতক থাকায় তাদের পাওয়া যায়নি।

আজিজ কো-অপারেটিভ: ব্যাংকগুলোর আমানতের গড় সুদহার ৫ শতাংশের নিচে নামলেও আজিজ কো-অপারেটিভ আমানতে সুদ দিচ্ছে ১৮ শতাংশ। আকর্ষণীয় মুনাফার লোভ দেখিয়ে সারাদেশের ৯৭টি শাখার মাধ্যমে হাজার হাজার গ্রাহকের কাছ থেকে আমানত নিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। আজিজ কো-অপারেটিভ কমার্স অ্যান্ড ফাইন্যান্স ক্রেডিট সোসাইটি লিমিটেড বা এসিসি ব্যাংক নামের এ প্রতিষ্ঠান আমানতের পাশাপাশি ঋণও দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সঞ্চয়ের সুরক্ষা না থাকায় প্রতিষ্ঠানটির অবৈধ ব্যাংকিং কার্যক্রমের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক জনসাধারণকে সতর্ক করে গত মার্চে একটি গণবিজ্ঞপ্তি দেয়।

আজিজ কো-অপারেটিভের চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম বলেন, কো-অপারেটিভগুলো পরিচালিত হয় সমবায় আইন অনুযায়ী। ফলে ব্যাংক কোম্পানি আইনে কি আছে সেটা তাদের দেখার বিষয় নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের বিরুদ্ধে গণবিজ্ঞপ্তি দেওয়ার পর আদালতে একটি রিট করা হয়। তারপর বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের বিরুদ্ধে আর কোনো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেনি। এ ছাড়া শাখার বিষয়ে আদালতের একটি নির্দেশনার মাধ্যমে সমবায় আইনের কার্যকরিতা স্থগিত রয়েছে।

ঢাকা মার্কেন্টাইল: ঢাকা মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ ব্যাংক নামের অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ ওঠার পর বিশদ পরিদর্শন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে প্রতিষ্ঠানটির নানা অনিয়মের তথ্য উঠে আসায় তা বন্ধের সুপারিশ করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়, উচ্চ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে দুই লাখের বেশি আমানতকারীর কাছ থেকে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার আমানত নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এসব আমানতের অধিকাংশই নেওয়া হয়েছে সদস্যদের বাইরে বিভিন্ন গ্রাহক থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারিশে ঢাকা মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ বন্ধের উদ্যোগ নেয় সমবায় অধিদপ্তর। তবে উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে এখনও কার্যকলাপ চালাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। ঢাকা মার্কেন্টাইল উচ্চ মুনাফার লোভ দেখিয়ে বিপুল পরিমাণের আমানত সংগ্রহ করে তার একটি অংশ পাচার করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডিকে দিয়েছে।

সরাসরি ব্যবস্থা নিতে পারছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক: বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, সমবায় অধিদপ্তর থেকে লাইসেন্স নিয়ে কাজ করায় এসব সমবায় সমিতির বিরুদ্ধে সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। আবার সমবায় অধিদপ্তরও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না। এ কারণে মানি লন্ডারিংয়ের বিষয়টি খতিয়ে দেখার লক্ষ্যে এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অ্যাকাউন্টে কী পরিমাণ অর্থ গেছে, সে অর্থ কোথায় কীভাবে ব্যয় হয়েছে, মানি লন্ডারিং হয়েছে কি-না তা দেখা হচ্ছে। ইতিমধ্যে দুটি প্রতিষ্ঠানের সুনির্দিষ্ট কিছু তথ্য একটি গোয়েন্দা সংস্থাকে দেওয়া হয়েছে। সেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া যায় এখন তারাই সেটা ঠিক করবে।

ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ছাড়া কারও নামের সঙ্গে ব্যাংক শব্দ ব্যবহার করা যাবে না। সমবায় সমিতি (সংশোধিত) আইনেও এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের নামের সঙ্গে ব্যাংক বা সমজাতীয় কোনো শব্দ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সমবায় সমিতির নামে কোনো শাখা থাকাও বেআইনি। আর এ ধরনের প্রতিষ্ঠান শুধু সমিতির সদস্য ছাড়া অন্য কারও মাঝে ঋণ বিতরণ করতে পারবে না। তবে অনেক প্রতিষ্ঠান এসব আইন অমান্য করে গ্রাহক ছাড়াও অন্যদের কাছ থেকে আমানত নিচ্ছে ও ঋণ বিতরণ করছে। আবার নামের সঙ্গে ব্যাংক যুক্ত করে কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তি জারি করলেও সমবায় অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন হওয়ায় সরাসরি কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না।

এ বিষয়ে সমবায় অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টি নিয়ে তারাও অস্বস্তিতে আছেন। তবে অনেক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান উচ্চ আদালতে রিট করে সমবায় অধিদপ্তরের সিদ্ধান্তের কার্যকরিতা স্থগিত করছে। অনেক ক্ষেত্রে লোকবল সংকটের কারণে তারা ব্যবস্থা নিতে পারছে না।

 

 

সর্বাধিক পঠিত

সৈয়দপুরে আব্দুল আজিজের মাশরুম কারখানাটি প্রায় বন্ধের পথে

বাণিজ্যমেলায় ঘুষ বাণিজ্য, বহিরাগতদের উৎপাত

গার্মেন্টস সেক্টরে ২০১৫ সালে রেকর্ড পরিমাণে রফতানি আয়

টানা অবরোধ আর হরতালে ধস নেমেছে চা শিল্পে

বিনিয়োগের সবচেয়ে আদর্শ স্থান বাংলাদেশ

রেলের উন্নয়নে ৪০ কোটি ডলার দেবে এডিবি

‘দেয়ার ইজ নো কালো টাকা ইন দিস বাজেট’

নতুন বাজার সৃষ্টি করতে ব্যবসায়ীদের আহবান -প্রধানমন্ত্রী

সংকটের মুখে কেরানীগঞ্জের তৈরী পোষাক শিল্প

দ্বিতীয়বারের মতো ২ হাজার ৬০০ কোটি মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে রিজার্ভ

করের আওতায় আনা হচ্ছে শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সংস্কার হচ্ছে আইনও

ভেঙ্গে পড়েছে যশোরের অর্থনীতিক চাকা

সম্পাদক : মো. আলম হোসেন
প্রকাশনায় : এ. লতিফ চ্যারিটেবল ফাউন্ডেশন
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
সরদার নিকেতন
হাসনাবাদ, দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জ, ঢাকা-১৩১১।

ফোন: ০২-৭৪৫১৯৬১
মুঠোফোন: ০১৭৭১৯৬২৩৯৬, ০১৭১৭০৩৪০৯৯
ইমেইল: ekantho24@gmail.com