রবিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২১, ০৪:২৮ পূর্বাহ্ন

মাইক্রোওয়েভ ফুড কি নিরাপদ?

ফিচার ডেস্ক::

নগর জীবনের রান্নাঘর যেখানে মাইক্রোওয়েভ ওভেন ছাড়া চিন্তাই করা যায় না, সেখানে রেস্তোরাঁ, ক্যাফে ও হোটেলের কথা বলাই বাহুল্য! চটজলদি খাবার গরম করা বা রান্নার জন্য এর জুড়ি মেলা ভার। কিন্তু গত বেশ কয়েক বছর ধরেই তর্ক-বিতর্ক চলছে, মাইক্রোওয়েভ ফুড কি নিরাপদ?

ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশন (ডব্লিউএইচও) বলছে, যদি ঠিকঠাকভাবে মাইক্রোওয়েভের রেডিয়েশান ব্যবহার করা যায় তাহলে চিন্তার কোনো কারণ নেই।

কিন্তু কিছু বিষয় ধোঁয়াশাই থেকে গেছে। কোনো কোনো গবেষণায় এসেছে, মাইক্রোওয়েভ খাবারের পুষ্টিগুণ কমিয়ে দেয় আর প্লাস্টিকের বাটি বা প্যাকেটে গরম করা খাবার খেলে হরমোনের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হয়। এ নিয়ে পুষ্টিবিদদের মধ্যেও রয়েছে পক্ষ-বিপক্ষ মত।

পুষ্টিগুণ হারানো

একটি গবেষণা বলছে, মাইক্রোওয়েভে শাকসবজি কিছু পুষ্টিগুণ হারায়। উদাহরণস্বরূপ, মাইক্রোওয়েভে ব্রকোলির ৯৭ শতাংশ ফ্ল্যাভোনয়েডস হারিয়ে যায়। ফ্ল্যাভোনয়েডস উদ্ভিদের এমন একটি যৌগ যা অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি (প্রদাহরোধী) যোগান দেয়। সেদ্ধ করলেও এতোটা ফ্ল্যাভোনয়েডস হারায় না যতোটা রেডিয়েশানে বিনষ্ট হয়।

২০১৯ সালের অন্য একটি গবেষণা ব্রকোলির এই পুষ্টিগুণ হারানো নিয়ে বলছে, এটি রান্নার সময় ও তাপমাত্রার ওপরও নির্ভর করে। ব্রকোলি পানিতে ছিল কিনা এটাও দেখার বিষয়। তবে অল্পসময়ে মাইক্রোওয়েভে পুষ্টিগুণ হারায় না।

বরং তুলনামূলক বিচারে মাইক্রোওয়েভেই ফ্ল্যাভোনয়েডস বেশি সংরক্ষিত থাকে বলে দাবি গবেষণাটির। এটি হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।

যুক্তরাষ্ট্রের বেল্টসভিল হিউম্যান নিউট্রিশন রিসার্চ সেন্টারের প্রধান বিজ্ঞানী জিয়ানলি য়ু বলছেন, এককভাবে আসলে ব্যাখ্যা করা যায় না, কেন মাইক্রোওয়েভে ফ্ল্যাভোনয়েডসের পরিমাণ কমে না বরং বেড়ে যেতে পারে। হতে পারে, মাইক্রোওয়েভে উদ্ভিদের কোষগুলো নরম হওয়ার ফলে এটা বেড়ে যায়।

কিন্তু জিয়ানলি কোনো সোজাসাপ্টা উত্তর দেননি যে, রান্নার অন্যান্য পদ্ধতির চেয়ে পুষ্টিগুণ সংরক্ষণ বা বৃ্দ্িধর জন্য মাইক্রোওয়েভ তুলনামূলক ভালো কিনা।

এটা আসলে এভাবে বলা যায় না! কারণ প্রত্যেকটি খাবারের গঠনবিন্যাস ও পুষ্টিগুণ আলাদা, বলেন তিনি।

জিয়ানলি আর যোগ করেন, যদিও মাইক্রোওয়েভ এখন বহুল প্রচলিত রান্না পদ্ধতি – নিদেনপক্ষে অনেক উদ্ভিজ্জ খাবারের ক্ষেত্রে। তবে আমি বলছি না, সব খাবারের ক্ষেত্রেই তা প্রযোজ্য।

অন্য একটি গবেষণায়, বিভিন্ন শাকসবজি মাইক্রোওয়েভ ও স্টিম করে ফেনোলিকস’র (বিভিন্ন স্বাস্থ্যসুবিধা সমৃদ্ধ যৌগ) পরিমাণ যাচাই করে দেখা হয়েছে। স্কোয়াশ, পিস ও লিক দুটিতেই ফেনোলিকের পরিমাণ কমেছে। তবে স্পিনাচ, ব্রকোলি ও গ্রিন বিনের ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। গবেষকরা দুটি রান্না পদ্ধতিতেই অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট পরীক্ষা করে দেখেছেন। দুই বিচারেই শাকসবজি সেদ্ধর চেয়ে মাইক্রোওয়েভে অপেক্ষাকৃত ভালো বলে তাদের মত।

মাইক্রোওয়েভে প্লাস্টিক

আমরা প্রায়ই মাইক্রোওয়েভে প্লাস্টিকের বাটি বা কনটেইনারে খাবার রেখে গরম করি। অথবা রেস্তোরাঁ থেকে মোড়ানো পলিথিনসহ ঢুকিয়ে দেই। এতে রেডিয়েশানে প্লাস্টিক থেকে খাবারের সঙ্গে থ্যালেট (থ্যালিক এসিডের একটি লবণ) মিশে যায়।

এ নিয়ে ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটি’র খাদ্য প্রকৌশলের অধ্যাপক জুমিং ট্যাং বলছেন, সব প্লাস্টিক মাইক্রোওয়েভে ব্যবহারের কথা মাথায় রেখে বানানো হয় না। সাধারণত প্লাস্টিককে নমনীয় ও নরম করতে পলিমার ব্যবহার করা হয় যা ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে গেলেই গলে যায়।

২০১১ সালের একটি গবেষণায়, বাজার থেকে চারশোরও বেশি প্লাস্টিক কন্টেইনার কেনা হয় যেগুলো খাবারের জন্য বানানো। পর্ক্ষীা করে দেখা গেছে, অধিকাংশ কন্টেইনার থেকেই ক্ষতিকর রাসায়নিক বের হয় যা হরমোনের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে।

এর মধ্যে থ্যালেটস বহুল ব্যবহৃত একটি রাসায়নিক যেটি প্লাস্টিককে নমনীয় করে এবং টেকঅ্যাওয়ে কন্টেইনার, প্লাস্টিক মোড়ক ও পানির বোতল তৈরিতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়। এটি আমাদের মেটাবলিক সিস্টেমকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। শিশুদের ক্ষেত্রে থ্যালেটস ব্লাড প্রেশার ও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বাড়ায়, যা দীর্ঘময়াদে ডায়াবেটিস ও হাইপারটেনশানের কারণ।

নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিন’র এনভায়রনমেন্টাল মেডিসিন অ্যান্ড পপুলেশন হেলথ বিভাগের অধ্যাপক লিওনার্দো রাসান্দে বলেন, থ্যালেটস থাইরয়েড হরমোনের বিকাশে বাধাদানকারীদের মধ্যে অন্যতম। গর্ভকালে এই হরমোনগুলো শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য খুবই দরকারী।

থ্যালেটস সব জায়গাতেই! এমনকি বাচ্চাদের খেলনা ও লোশনেও। দিনের পর দিন প্রস্তুতকারীরা কী ক্ষতি করে চলেছে তা আমাদের ভাবনারও বাইরে, যোগ করেন লিওনার্দো।

অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটি’র বায়োডিজাইন সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল হেলথ ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের পরিচালক রলফ হ্যালডেন বলছেন, যখন পানি বা খাবারের ঝোলসহ মাইক্রোওয়েভে দেওয়া হয় তখন জলীয় বাষ্প প্লাস্টিকের ঢাকানার গায়ে জমা হয় এবং এর সঙ্গে থ্যালেটসসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক মিলে খাবারে মিশে যায়।

এই ঝুঁকি কমানোর সবচেয়ে সেরা উপায় হলো মাইক্রোওয়েভ-নিরাপদ জিনিস (যেমন: সেরামিক) ব্যবহার করা। অথবা প্লাস্টিক কন্টেইনার ব্যবহার করলে যেনো তা মাইক্রোওয়েভে ব্যবহারের জন্য বিশেষভাবে বানানো হয়। এক্ষেত্রে কন্টেইনারের ‘ইউনিভার্সাল রিসাইকেলিং সিম্বল’ দেখে নিতে হবে। কন্টেইনারের উল্টোদিকে যেগুলো ‘৩’ নম্বরের সঙ্গে ‘ঠ’ অথবা ‘চঠঈ’ লেখা থাকবে বুঝতে সেগুলোতে থ্যালেটস রয়েছে।

উত্তাপ ঝুঁকি

প্লাস্টিক এড়িয়ে গেলেই কিন্তু ঝুঁকি একেবারে শেষ নয়! খাবার গরমের ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় উত্তাপ এবং রান্নার ক্ষেত্রে উচ্চ তাপমাত্রার ব্যবহারও বিপদ ডেকে আনবে।

ইউনিভার্সিটি অব জর্জিয়া’র ফুড সেফটি বিভাগের অধ্যাপক ফ্রান্সিসকো ডিয়েজ-গনজালেজ বলছেন, প্রথমত, মাইক্রোওয়েভে রান্না না করে কেবল খাবার গরম করার জন্য ব্যবহার করা উচিত।

ব্যাপারটা এমন নয়, কেবল খাবার গরম করলে ঝুঁকি একেবারেই থাকে না! এতেও অল্প-বিস্তর থাকবে। তবে খাবার অবশ্যই ৮২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে গরম করা উচিত কারণ এতে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াগুলো মরে যায়।

অন্যদিকে, উচ্চতাপমাত্রায় রান্নার ক্ষেত্রে হিব্রু ইউনিভার্সিটি’র নিউট্রিশনাল সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক বেটি শোয়ার্তজ লক্ষ্য করেন, তার ছাত্র-ছাত্রীরা খোসাসহ আলু মাইক্রোওয়েভে রান্না করলে ভেতরে টুকরো কাঁচ মিলছে।

ল্যাবে পরীক্ষা করলে দেখা যায়, সেগুলো অ্যাক্রেলামাইড (পানিতে দ্রবণীয় রঙহীন পলিমার) জাতীয় রাসায়নিক। বেটি তার ছাত্র-ছাত্রীদের পানিতে সেদ্ধ করতে নির্দেশ দেন। দেখা যায়, পানিতে সেদ্ধ করলে অ্যাক্রেলামাইড তৈরি হচ্ছে না, যেটি মাইক্রোওয়েভের উচ্চ তাপমাত্রায় হয়েছিল।

অ্যাক্রেলামাইড কোষের ডিএনএ’র স্বাভাবিক কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করে ক্যানসারের দিকে নিয়ে যায়। যদিও এটি পশুর শরীরে বেশি কার্যকরী এবং মানুষের শরীরে খুব কম পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি।

বিকিরণ নিরাপত্তা

মাইক্রোওয়েভের বিকিরণ তথা রেডিয়েশান সম্পূর্ণভাবে নিরাপদ বলে মত গবেষকদের। সাধারণ বাল্ব ও রেডিওতে যেরকম নিম্ন তরঙ্গের ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশান ব্যবহার করা হয়, মাইক্রোওয়েভেও তাই। ওভেনে ঢোকানো খাবার এই মাইক্রোওয়েভগুলোই শুষে নেয়। এতে লঘু ক্ষতি একেবারেই যে নেই তা নয়।

তবে খাদ্য প্রকৌশলের অধ্যাপক ট্যাং ভরসা দিচ্ছেন, আপনি যদি সূর্যের আলোয় জন্মানো ও বেড়ে ওঠা শাকসবজি খেতে পারেন তাহলে আপনার মাইক্রোওয়েভের খাবার নিয়ে দুশ্চিন্তা করা উচিত নয়।

মাইক্রোওয়েভ আয়োনাইজিং রেডিয়েশান ব্যবহার করে না। এর মানে, পরমাণু থেকে ইলেক্ট্রন আলাদা হতে এরা যথেষ্ট শক্তি বহন করে না। কাজেই মাইক্রোওয়েভ রেডিয়েশান নিয়ে দুশ্চিন্তা না করলেও চলবে বলে মনে করে তিনি।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2020  E-Kantha24
Technical Helped by Titans It Solution