সোমবার, ০১ Jun ২০২০, ০৯:৩১ অপরাহ্ন

লালমনিরহাটের সীমান্তবর্তি গ্রামগুলোর অধিকাংশ মানুষ বোঝে না করোনাভাইরাস কি?

লালমনিরহাট প্রতিনিধি::

লালমনিরহাট সীমান্তবর্তি এ জেলার প্রায় ২২ কিলোমিটার কাটাতারের বেড়াহীন ভারতীয় সীমান্ত। লালমনিরহাটের সীমান্তবর্তি গ্রামগুলোর অধিকাংশ মানুষ অবৈধ পথে চোরাচালান বা শ্রমিকের কাজে ভারতে যাতায়াত করে থাকেন। এদের অনেকের ভারত-বাংলাদেশ দুই দেশের নাগরিকত্ব রয়েছে বলেও স্থানীয়রা জানান। করোনা পরিস্থিতিতেও অনেকে ভারতে যাতায়াত আগের মতই স্বাভাবিক রেখেছেন। যার গতিবিধি নিয়ন্ত্রনে সরকারীভাবে কোন পদক্ষেপ গ্রহন করা হয়নি বলে করোনা ঝুঁকিতে আতঙ্কিত স্থানীয়রা।

বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়ে এক আতঙ্কের নাম প্রাণঘাতি করোনাভাইরাস। ইতোমধ্যে বাংলাদেশেও এই করোনা ভাইরাসের সংক্রামন দেখা দিয়েছে। একমাত্র সচেতনতাই মুক্তির পথ হলেও সীমান্তবর্তি জেলা লালমনিরহাটের অধিকাংশ মানুষ এখনো অসচেতন ভাবেই চলাফেরা করছেন। ফলে ব্যাপক ক্ষতির শঙ্কার সম্মুখিন দেশের সুধিজনের।

তিস্তার আর ধরলার নদীর জেলা লালমনিরহাটের অধিকাংশ মানুষ কৃষির উপর নির্ভরশীল। তিস্তা ও ধরলা নদীর বুকে জেগে উঠা প্রায় অর্ধশত চরাঞ্চলে হাজার হাজার পরিবারের বসবাস। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে নিত্য লড়াই করে চলা চরাঞ্চলের মানুষ ব্যস্ত রয়েছে নিজেদের জীবিকার কাজে। সচেতন তো দুরের কথা আসন্ন করোনা ভাইরাস সম্পর্কে কোন ধারনাই তাদের নেই। তাদের সচেতন করতে স্বাস্থ্য বিভাগের তেমন কোন কার্যক্রম চোখে পড়ছে না লালমনিরহাট জেলা জুড়ে। অজ্ঞ-অশিক্ষিত মানুষগুলো এখনো জানে না করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় কি করা উচিৎ। কিভাবে চলাফেরা করতে হবে এটা অজানার কারনেই ওই সব চরাঞ্চলের লোকজন পুর্বের অভ্যাসেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন যে যার মত।

চরাঞ্চলের ছিন্নমুল মানুষদের দ্রুত করোনা মোকাবেলায় সচেতন করা না হলে দ্রুত মহামারী আকার ধারন করবে স্বাস্থ্য অসচেতন ও পুষ্টিহীন এ জনপদে। চরাঞ্চলে স্বাভাবিক স্বাস্থ্যসেবা পৌছনো কষ্টকর। সেখানে করোনার মত মরণঘাতি ভাইরাস মোকাবেলায় সেবা প্রদান অসম্ভব হয়ে পড়বে। ফলে আক্রান্ত শুরু হলে মুহুর্তে মহামারী আকার ধারন করার আশঙ্কা করছেন সচেতন নাগরিকরা। তাদের দাবি, শহরের বাসিন্দাদের মত দ্রুত চরাঞ্চলের মানুষকে করোনা মোকাবেলায় স্বাস্থ্য সচেতন করতে হবে। একই সাথে আক্রান্ত হওয়ার আগেই তাদের খাদ্য নিশ্চিত করে চলাফেরা বন্ধ করে দিতে হবে। এর ব্যর্তয় ঘটলে বিরাট ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

বিদেশ ফেরতরা হোম কোয়ারেন্টাইন না মেনে অবাদে ঘুরে বেড়িয়েছেন বিভিন্ন গ্রামে। সীমান্তে কঠোর নজরদারী এবং গ্রামীন ও চরাঞ্চলের খেটে খাওয়া অজ্ঞ অশিক্ষিত জনগোষ্ঠিকে মাইকিং করে দ্রুত সচেতন করে স্বাস্থ বার্তা মেনে চলতে বাধ্য করার পাশাপাশি গ্রামীন হাটবাজারে গনজমায়েত বন্ধ করতে সরকারের দৃষ্ঠি আকর্ষন করেন জেলার সচেতন মহল।

ভারতীয় কাটাতারের বেড়া বিহিন সীমান্ত ঘোঁষা দুর্গাপুরের নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক ও ছাত্র জানান, এ এলাকার শত শত মানুষ গরুসহ বিভিন্ন চোরাচালানের সাথে জড়িত। তারা প্রায় সময় অবৈধ পথে ভারতে যাতায়ত করছে। অনেকে শ্রমিকের কাজেও ভারতে যাচ্ছেন। এক দুই সপ্তাহ কাজ করে ফিরছেন। তাদের কোন হিসাব রাখা হচ্ছে না। ফলে জেলার সীমান্ত গ্রামগুলো সব থেকে বেশী করোনা ভাইরাস ঝুঁকিতে রয়েছে।

তিস্তা চরাঞ্চল গোবর্দ্ধন গ্রামের স্কুল শিক্ষক কাজী শফিকুল ইসলাম বলেন, চরাঞ্চলের মানুষ করোনা ভাইরাস তো বুঝেই না, স্বাস্থ্য সচেতনও নয়। খেটে খাওয়া মানুষজন জীবিকার তাগিদে কাজে ছুটছেন এবং চলাফেরায়ও নেই সীমাবদ্ধতা। করোনা সচেতনতার কথা বলতে গেলে এসব মানুষের ধারনা, ভয়ে ঘরে বসে থাকলে না খেয়ে মরতে হবে। আর করোনা ভাইরাস এলেও মরতে হবে। আল্লাহ যা করার করবে। এই বৃহত্তর চরবাসীকে সচেতন করতে না পারলে করোনা ভাইরাসে বড় খেসারত দিতে হতে পারে বলেও আশঙ্কা করেন তিনি।

লালমনিরহাট সিভিল সার্জন ডা. নিমর্লেন্দু রায় বলেন, জনসচেতনতার জন্য মাঠপর্যয়ে স্বাস্থ্যবার্তার লিফলেট বিতরন করা হচ্ছে। মাইকিং করলে আতঙ্কিত হতে পারে তাই করা হচ্ছে না। ৭৪জনকে হোম কোয়ারাইন্টাইনে ও ভারত ফেরত একজনকে পাটগ্রাম হাসপাতালে প্রতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। করোনার আইসলোশন বাড়াতে লালমনিরহাট রেলওয়ে হাসপাতাল ও লালমনিরহাট সরকারী কলেজের নবনির্মিত মহিলা হোস্টেল চাওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য চিকিৎসা সরঞ্জাম সংকট রয়েছে। যা চেয়ে মন্ত্রনালয়ে পত্র পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।

বডার গার্ড বাংলাদেশ(বিজিবি) লালমনিরহাট ১৫ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে.কর্ণেল তৌহিদুল আলম বলেন, লালমনিরহাট জেলা প্রশাসকের দেয়া পরামর্শে সীমান্তে নজরদারী বাড়াতে ক্যাম্পগুলোতে জরুরী নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। সেই সাথে জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে সীমান্তবাসীকে সীমান্ত অতিক্রম না করাতে নির্দেশনা দেয়া হবে।

লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবু জাফর বলেন, সীমান্তে নজরদারী বাড়াতে বডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) কে কেন্দ্রীয় নির্দেশনার পাশাপাশি জেলা প্রশাসনের সভায়ও বলা হয়েছে। করোনা মোকাবেলায় জেলাবাসীর সচেতনতা বাড়াতে লিফলেট বিতরনের পাশাপাশি মাইকিং করা হবে। আতঙ্কিত না হয়ে সকলকে স্বাস্থ্যবার্তা মেনে চলার আহবান জানান তিনি।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2020  E-Kantha24
Design & Developed By Aynan